দশকের পর দশক ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় মেনে নিয়েও ইরান যে পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের অস্তিত্বের অংশ মনে করত, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার চেয়েও বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’। হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের নতুন সামরিক সংঘাতে জড়াতে প্রস্তুত। ইরানের নীতি-নির্ধারকদের কাছে এই জলপথ এখন ওয়াশিংটনকে পরাস্ত করার সবচেয়ে বড় ‘স্বর্ণাস্ত্র’।
এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অনড় অবস্থানের কারণেই চলতি সপ্তাহে তেহরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পার হতে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরান হামলা চালায়, যার জেরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে তীব্র লড়াই শুরু হয়। এই নতুন সংঘাত গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিকে সম্পূর্ণ ভেস্তে দেওয়ার উপক্রম করেছে।
গত জুন মাসে যুদ্ধ অবসানে যে অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার একটি অস্পষ্ট বাক্যের সুযোগ নিয়েই এখন দুই দেশ মুখোমুখি অবস্থানে। চুক্তিতে বলা হয়েছিল—“ইরান তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যবহার করে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের শুল্ক বা ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে।”
ইরানের শীর্ষ আলোচকেরা এই বাক্যটিকে ব্যাখ্যা করছেন এভাবে যে—যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে এই জলপথ ব্যবস্থাপনার পূর্ণ কর্তৃত্ব ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে, ইরান কেবল প্রথম দুই মাস কোনো ফি আদায় করবে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান কেবল জাহাজ চলাচলের সুবিধা দেবে, কিন্তু শক্তির জোরে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে না।
ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে এই নীতি নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কোনো যৌক্তিক রাষ্ট্রই হাতছাড়া করবে না। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, “হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিন; সামনে এগোনোর এটাই একমাত্র পথ।”
ইরানের এই অনড় অবস্থানের পেছনে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি চরম অবিশ্বাস। ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্পের একতরফা বের হয়ে যাওয়া, গত বছর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পরও চলতি বছরের শুরুতে আকস্মিক যুদ্ধ শুরু করা এবং কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বসিয়ে রেখে হামলা চালানোর অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তেহরান শিক্ষা নিয়েছে। ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যদি এখন হরমুজে পিছু হটি, তবে ট্রাম্প আমাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করার দাবি তুলবেন। পিছু হটার অর্থ আত্মসমর্পণ, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
অতীতে ইরানি কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করাকে ‘এক গ্লাস পানি খাওয়ার মতোই সহজ’ বলে বর্ণনা করলেও, ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা এটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়ে ‘শেষ অস্ত্র’ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইসহ শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে, তখন ইরানি প্রশাসন মনে করে যে তাদের হারানোর আর কিছুই নেই। তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের জাহাজ ছাড়া বিশ্বের সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজের জন্য এই রুট বন্ধ করে দেয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় তৈরি করে।
এই ব্লকেডের (অবরোধ) অর্থনৈতিক ধকল সহ্য করতে না পেরেই ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছিল। স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ইউনিভার্সিটির আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারি বলেন, “উভয় পক্ষই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ছিল, আবার উভয় পক্ষই মনে করছে তারা যুদ্ধে জিতেছে। তাই প্রত্যেকেই ভাবছে আর একটু চাপ দিলেই নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।”
বর্তমানে ইরান পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে মোটেও ভাবছে না। তারা মনে করছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে মেনে নিয়েছে। তাই ২৫ বছর ধরে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ যে পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল, তা এখন ব্যাকবার্নারে বা পেছনের সারিতে চলে গেছে। ইরানের স্পষ্ট বার্তা—যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ পারমাণবিক বিষয়ে কোনো নতুন আলোচনা শুরুই হবে না।

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬
দশকের পর দশক ধরে চলা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয় মেনে নিয়েও ইরান যে পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিজেদের অস্তিত্বের অংশ মনে করত, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার চেয়েও বড় অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে কৌশলগত ‘হরমুজ প্রণালি’। হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো ধরনের নতুন সামরিক সংঘাতে জড়াতে প্রস্তুত। ইরানের নীতি-নির্ধারকদের কাছে এই জলপথ এখন ওয়াশিংটনকে পরাস্ত করার সবচেয়ে বড় ‘স্বর্ণাস্ত্র’।
এই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অনড় অবস্থানের কারণেই চলতি সপ্তাহে তেহরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পার হতে যাওয়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর ইরান হামলা চালায়, যার জেরে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে তীব্র লড়াই শুরু হয়। এই নতুন সংঘাত গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তিকে সম্পূর্ণ ভেস্তে দেওয়ার উপক্রম করেছে।
গত জুন মাসে যুদ্ধ অবসানে যে অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার একটি অস্পষ্ট বাক্যের সুযোগ নিয়েই এখন দুই দেশ মুখোমুখি অবস্থানে। চুক্তিতে বলা হয়েছিল—“ইরান তার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা ব্যবহার করে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের শুল্ক বা ফি ছাড়াই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে।”
ইরানের শীর্ষ আলোচকেরা এই বাক্যটিকে ব্যাখ্যা করছেন এভাবে যে—যুক্তরাষ্ট্র পরোক্ষভাবে এই জলপথ ব্যবস্থাপনার পূর্ণ কর্তৃত্ব ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের হাতেই ছেড়ে দিয়েছে, ইরান কেবল প্রথম দুই মাস কোনো ফি আদায় করবে না। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান কেবল জাহাজ চলাচলের সুবিধা দেবে, কিন্তু শক্তির জোরে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে না।
ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে এই নীতি নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কোনো যৌক্তিক রাষ্ট্রই হাতছাড়া করবে না। ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির সদস্য ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, “হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নতুন শাসনব্যবস্থাকে স্বীকৃতি দিন; সামনে এগোনোর এটাই একমাত্র পথ।”
ইরানের এই অনড় অবস্থানের পেছনে রয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি চরম অবিশ্বাস। ২০১৮ সালে পরমাণু চুক্তি থেকে ট্রাম্পের একতরফা বের হয়ে যাওয়া, গত বছর যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পরও চলতি বছরের শুরুতে আকস্মিক যুদ্ধ শুরু করা এবং কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বসিয়ে রেখে হামলা চালানোর অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তেহরান শিক্ষা নিয়েছে। ইরানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যদি এখন হরমুজে পিছু হটি, তবে ট্রাম্প আমাদের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করার দাবি তুলবেন। পিছু হটার অর্থ আত্মসমর্পণ, যা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”
অতীতে ইরানি কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করাকে ‘এক গ্লাস পানি খাওয়ার মতোই সহজ’ বলে বর্ণনা করলেও, ব্যক্তিগতভাবে তাঁরা এটিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে হয়ে যাওয়ার ভয়ে ‘শেষ অস্ত্র’ হিসেবে দেখতেন। কিন্তু গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়ে দেশটির তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইসহ শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করে, তখন ইরানি প্রশাসন মনে করে যে তাদের হারানোর আর কিছুই নেই। তারা তাৎক্ষণিকভাবে নিজেদের জাহাজ ছাড়া বিশ্বের সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহকারী জাহাজের জন্য এই রুট বন্ধ করে দেয়, যা বৈশ্বিক জ্বালানি ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় তৈরি করে।
এই ব্লকেডের (অবরোধ) অর্থনৈতিক ধকল সহ্য করতে না পেরেই ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়েছিল। স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রুজ ইউনিভার্সিটির আধুনিক ইতিহাসের অধ্যাপক আলী আনসারি বলেন, “উভয় পক্ষই তীব্র অর্থনৈতিক সংকটে ছিল, আবার উভয় পক্ষই মনে করছে তারা যুদ্ধে জিতেছে। তাই প্রত্যেকেই ভাবছে আর একটু চাপ দিলেই নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব।”
বর্তমানে ইরান পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে মোটেও ভাবছে না। তারা মনে করছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ওয়াশিংটন ইতিমধ্যে মেনে নিয়েছে। তাই ২৫ বছর ধরে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ যে পারমাণবিক কর্মসূচি ছিল, তা এখন ব্যাকবার্নারে বা পেছনের সারিতে চলে গেছে। ইরানের স্পষ্ট বার্তা—যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ না হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের পূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও কর্তৃত্ব মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ পারমাণবিক বিষয়ে কোনো নতুন আলোচনা শুরুই হবে না।

আপনার মতামত লিখুন