দিকপাল

যুদ্ধবিরতি শেষ ট্রাম্পের ঘোষণার পর ফের যুক্তরাষ্ট্র ইরান সংঘাত


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:৩৪ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

যুদ্ধবিরতি শেষ ট্রাম্পের ঘোষণার পর ফের যুক্তরাষ্ট্র ইরান সংঘাত

পারস্য উপসাগরের কৌশলগত তেল রুট হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেছেন। এর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে এবং টানা দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে।

তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্প ইরানি বাহিনীর এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত না করা এবং আন্তর্জাতিক এই জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কারণে ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে নতুন করে এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) বুধবার ও বৃহস্পতিবার ইরানের ওপর নতুন করে শক্তিশালী বিমান হামলা শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বন্দর নগরী, বিশেষ করে বুশেহর (যেখানে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবস্থিত), বন্দর আব্বাস এবং সিরিক অঞ্চলে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। বুশেহরে অবস্থিত ইরানের এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর অ্যারোস্পেস ফোর্সের একটি স্থাপনায় মার্কিন হামলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা গেছে।

এর পাল্টা জবাবে আইআরজিসি কুয়েত এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একঝাঁক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালায়। বাহরাইন (যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর অবস্থিত) এবং কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটির আশপাশে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সতর্কবার্তা বেজে ওঠে। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, তারা আকাশেই ২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩টি ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দেন, "আমি মনে করি যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি এখন শেষ। আমি আর তাদের (ইরান) সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখতে চাই না, তারা নিকৃষ্ট। ইরানিরা দুষ্ট ও অসুস্থ লোক। এরা ক্যান্সারের মতো এবং আপনারা জানেন আপনাদের কী করতে হবে—শুরুতেই ক্যান্সারকে ছেঁটে ফেলতে হবে।"

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও বলেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালিতে পুনরায় কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানার চেষ্টা করে, তবে আমেরিকার পরবর্তী হামলাগুলো এর চেয়েও "বহুগুণ মারাত্মক ও ভয়াবহ" হবে। প্রয়োজনে মার্কিন সামরিক বাহিনী খুব দ্রুত এই যুদ্ধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বা কাজ শেষ করে দেবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকাশ্য হুমকির মুখেও নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছে ইরান। গত ১৭ জুনের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি (ইসলামাবাদ স্মারক) অনুযায়ী ওমানের সাথে যৌথ পরামর্শে হরমুজ প্রণালির নৌ-ট্রাফিক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অধিকার ইরানের রয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি।

ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক বিবৃতিতে মার্কিন হুঁশিয়ারিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "ধমক এবং চাঁদাবাজির দিন শেষ হয়ে গেছে। এভাবে কোনো সমাধান আসবে না, ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না।" ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি কেবল ‘ইরানি ব্যবস্থাপনার’ অধীনেই পুনরায় উন্মুক্ত হবে, আমেরিকার কোনো হুমকিতে তা কাজ করবে না। ফলে গত জুন মাসে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬


যুদ্ধবিরতি শেষ ট্রাম্পের ঘোষণার পর ফের যুক্তরাষ্ট্র ইরান সংঘাত

প্রকাশের তারিখ : ০৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

পারস্য উপসাগরের কৌশলগত তেল রুট হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘শেষ’ বলে ঘোষণা করেছেন। এর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছে এবং টানা দ্বিতীয় দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা চালিয়েছে।

তুরস্কের আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় ট্রাম্প ইরানি বাহিনীর এই পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি উন্মুক্ত না করা এবং আন্তর্জাতিক এই জলসীমায় বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর কারণে ট্রাম্প অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে নতুন করে এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) বুধবার ও বৃহস্পতিবার ইরানের ওপর নতুন করে শক্তিশালী বিমান হামলা শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইরানের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বন্দর নগরী, বিশেষ করে বুশেহর (যেখানে দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবস্থিত), বন্দর আব্বাস এবং সিরিক অঞ্চলে ব্যাপক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। বুশেহরে অবস্থিত ইরানের এলিট ফোর্স ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর’ (আইআরজিসি)-এর অ্যারোস্পেস ফোর্সের একটি স্থাপনায় মার্কিন হামলায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে বলে জানা গেছে।

এর পাল্টা জবাবে আইআরজিসি কুয়েত এবং বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে একঝাঁক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালায়। বাহরাইন (যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর অবস্থিত) এবং কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটির আশপাশে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্রের সতর্কবার্তা বেজে ওঠে। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, তারা আকাশেই ২টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ১৩টি ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হলেও ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষের আঘাতে বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ন্যাটোর শীর্ষ সম্মেলনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দেন, "আমি মনে করি যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি এখন শেষ। আমি আর তাদের (ইরান) সাথে কোনো ধরনের সম্পর্ক রাখতে চাই না, তারা নিকৃষ্ট। ইরানিরা দুষ্ট ও অসুস্থ লোক। এরা ক্যান্সারের মতো এবং আপনারা জানেন আপনাদের কী করতে হবে—শুরুতেই ক্যান্সারকে ছেঁটে ফেলতে হবে।"

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে আরও বলেন, তেহরান যদি হরমুজ প্রণালিতে পুনরায় কোনো বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানার চেষ্টা করে, তবে আমেরিকার পরবর্তী হামলাগুলো এর চেয়েও "বহুগুণ মারাত্মক ও ভয়াবহ" হবে। প্রয়োজনে মার্কিন সামরিক বাহিনী খুব দ্রুত এই যুদ্ধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি বা কাজ শেষ করে দেবে বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকাশ্য হুমকির মুখেও নিজেদের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়েছে ইরান। গত ১৭ জুনের অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি (ইসলামাবাদ স্মারক) অনুযায়ী ওমানের সাথে যৌথ পরামর্শে হরমুজ প্রণালির নৌ-ট্রাফিক নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অধিকার ইরানের রয়েছে বলে দাবি করেছে আইআরজিসি।

ইরানের শীর্ষ আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক বিবৃতিতে মার্কিন হুঁশিয়ারিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "ধমক এবং চাঁদাবাজির দিন শেষ হয়ে গেছে। এভাবে কোনো সমাধান আসবে না, ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না।" ইরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, হরমুজ প্রণালি কেবল ‘ইরানি ব্যবস্থাপনার’ অধীনেই পুনরায় উন্মুক্ত হবে, আমেরিকার কোনো হুমকিতে তা কাজ করবে না। ফলে গত জুন মাসে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক শান্তি চুক্তিটি এখন সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল