ইইউকে বাদ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া ঠিক নয়: রেহমান সোবহান
বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক বাণিজ্যনীতিতে একটি গভীর এবং বড় ধরনের ‘কাঠামোগত বিভ্রান্তি’ বা গলদ রয়েছে বলে অত্যন্ত জোরালো মন্তব্য করেছেন দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁর মতে, আমরা দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ও কাল্পনিক ধারণার মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে আছি যে, যুক্তরাষ্ট্ৰই বুঝি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও প্রধান রপ্তানি বাজার। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারটি আসলে মাত্র আট থেকে দশ বিলিয়ন ডলারের একটি সীমিত গণ্ডির মধ্যে আটকে রয়েছে। এর বিপরীতে, বাংলাদেশের প্রকৃত এবং সবচেয়ে বৃহত্তম বাজার হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও সেখান থেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটা না করে, সব সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের ঝুলিতে সোপর্দ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের সাথে একপেশে বাণিজ্য চুক্তি করা এবং মার্কিন বিমান প্রস্তুতকারক সংস্থাকে একচেটিয়া বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো মোটেও সঠিক বা দূরদর্শী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না।[TECHTARANGA-POST:802]সমাজ গবেষণা কেন্দ্রের উদ্যোগে গত বৃহস্পতিবার রাতে ‘বিএনপি সরকারের একশত দিন—একটি প্রাথমিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক একটি বিশেষ ওয়েবিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়েই প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদ দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারকদের এই চরম দূরদর্শিতার অভাবকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে বড় অংকের বিনিময়ে চৌদ্দটি উড়োজাহাজ কেনার একটি চূড়ান্ত চুক্তি সই করেছে রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এই বিপুল পরিমাণ আকাশযান কিনতে দেশের কোষাগার থেকে খরচ করতে হবে প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৪৫ হাজার কোটি টাকার সমতুল্য। গত ১ মে ঢাকার মাটিতে এই মেগা চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে সই করা হয়। এর ঠিক কিছুদিন আগে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যে একটি বহুল আলোচিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে সেই চুক্তিটি চূড়ান্ত করার পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে তীব্র অভিযোগ উঠছিল যে, এটি অত্যন্ত একপেশে একটি চুক্তি এবং এতে বাংলাদেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থকে অন্যায্য প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। রেহমান সোবহানের সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই সমালোচনাকেই আরও একবার উসকে দিল।বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে এই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ও মূল চালিকাশক্তি এখন এশিয়া মহাদেশের দিকে ধাবিত হচ্ছে, বিশেষ করে পূর্ব, দক্ষিণ-পূর্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এখন অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটছে। আর এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের মূল কেন্দ্রবিন্দুও এই এশীয় অঞ্চলভিত্তিক হওয়া উচিত ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এবং গরিব মানুষের সুরক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, বড় আকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো সফল করতে হলে সেগুলোকে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা জরুরি। বর্তমানে প্রচলিত ফ্যামিলি কার্ডসহ অন্যান্য বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিগুলোকে একীভূত করে একটি সর্বজনীন ও বিস্তৃত সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি।[TECHTARANGA-POST:796]দেশের চলমান রাজস্ব সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রেহমান সোবহান বলেন, বর্তমানে জিডিপির তুলনায় মাত্র আট শতাংশ কর আদায়ের যে নগণ্য হার রয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক বাজেটের জন্য একটি বিরাট ও বিপজ্জনক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সমাজের উচ্চ আয়ের স্তর বা ধনকুবেরদের কাছ থেকে রাষ্ট্র যখন যথাযথভাবে কর আদায় করতে পারে না, তখনই সমাজে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্যের সৃষ্টি হয় এবং এটিই দেশের প্রধান বৈষম্যের উৎস। একই সাথে ব্যাংক খাতের ঋণখেলাপি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি শুধু আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকেই পঙ্গু ও দুর্বল করে ফেলেনি, বরং এটি দেশে ধনী-দরিদ্রের আয়বৈষম্য জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত আমানতকারীদের কষ্টার্জিত অর্থ মুষ্টিমেয় কিছু সংকীর্ণ এবং প্রভাবশালী অভিজাত শ্রেণির হাতে চলে যাচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর চরিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি মন্তব্য করেন, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে শুরুতে মধ্যপন্থি সামাজিক গণতান্ত্রিক অবস্থানে থাকার কথা বললেও, পরবর্তী সময়ে তারা সম্পূর্ণভাবে একটি বিশেষ সুবিধাভোগী ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ বা চাটুকার পুঁজিবাদের চক্রে জড়িয়ে পড়েছিল। ঠিক একইভাবে, বর্তমান ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা বিএনপির নেতৃত্বের সামাজিক পটভূমিও কিন্তু কর আদায় বৃদ্ধি এবং বড় বড় ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ইস্যুতে তাদের ভবিষ্যৎ অবস্থান ও নীতিনির্ধারণকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করবে। দেশের প্রথিতযশা অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম এম আকাশের অত্যন্ত দক্ষ সঞ্চালনায় এই গুরুত্বপূর্ণ ওয়েবিনারে আরও মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এবং সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান। এই সেমিনারে মূল গবেষণা প্রবন্ধটি পাঠ করেন এশীয় প্রবৃদ্ধি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং জাতিসংঘের উন্নয়ন গবেষণার সাবেক প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। সব মিলিয়ে, এই আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, দেশের অর্থনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন না আনলে আগামী দিনে বাংলাদেশকে আরও বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হবে।