দিকপাল

চীনের ১২ কোম্পানির ৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব কি বদলে দেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬ | ০৪:১৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

চীনের ১২ কোম্পানির ৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব কি বদলে দেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের ধারাবাহিকতায় দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত খাতে চীনের ১২টি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) একটি অবিশ্বাস্য বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এই বড় খবরটি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ভারী শিল্প খাতে এমন কিছু মেগা প্রজেক্টের প্রস্তাব এনেছেন, যা দেশের সামগ্রিক জিডিপির চেহারাই বদলে দিতে পারে।

প্রস্তাবিত এই মহাপরিকল্পনার ভেতর উঁকি দিলে দেখা যায় এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ব্যয়বহুল হলো ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পিপিপি প্রকল্প’, যেখানে দেশের লাইফলাইন খ্যাত এই রুটটিকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে এককভাবেই প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পায়রা শিল্পাঞ্চলে ‘ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রকল্প’ বাবদ ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার এবং ঢাকা ও অন্য বড় শহরগুলোর আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের (Waste-to-Energy) জন্য আরও প্রায় ৮৯০ মিলিয়ন ডলারের মেগা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মোংলা বন্দর ও তার চারপাশের অর্থনৈতিক অঞ্চলকে বৈশ্বিক লজিস্টিকস হাবে রূপান্তর করতে প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ছক এঁকেছে চীনা জায়ান্টরা।

শিল্প ও প্রথাগত খাতের বাইরে গিয়ে এবার চীনের নজর পড়েছে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও শিক্ষা অবকাঠামোতেও। বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার, দেশের তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও গ্যাস খাতের উন্নয়নে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুৎ চুরি ও সিস্টেম লস রোধে আধুনিক ‘স্মার্ট মিটার’ উৎপাদনে আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া রপ্তানি বাণিজ্যকে শক্তিশালী করতে লজিস্টিকস ও কোল্ড চেইন খাতে ১৮০ মিলিয়ন ডলার এবং টেক্সটাইল, লিথিয়াম ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ, রেল কোচ উৎপাদন ও ঔষধি উদ্ভিদ শিল্পের মতো পৃথক পাঁচটি বিশেষ খাতে ১৯০ মিলিয়ন ডলার করে মোট ৯৫০ মিলিয়ন ডলারের বড় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং।

বিডার নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত এই বিশাল বৈদেশিক মূলধন যদি সত্যিই মাঠে গড়ায়, তবে তা বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভারী শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তির স্থানান্তরে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, এই বিপুল অঙ্কের টাকা এখনো কেবলই প্রাথমিক ‘বিনিয়োগ প্রস্তাব’ বা কাগুজে পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক তহবিল দেশের অর্থনীতিতে সফলভাবে যুক্ত করতে হলে দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, দ্বিপাক্ষিক চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন এবং প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬


চীনের ১২ কোম্পানির ৯ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব কি বদলে দেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি

প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬

featured Image

প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক চীন সফরের ধারাবাহিকতায় দেশের অর্থনৈতিক অঙ্গনে এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর মোড় এসেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত খাতে চীনের ১২টি শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের (প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি) একটি অবিশ্বাস্য বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এই বড় খবরটি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও ভারী শিল্প খাতে এমন কিছু মেগা প্রজেক্টের প্রস্তাব এনেছেন, যা দেশের সামগ্রিক জিডিপির চেহারাই বদলে দিতে পারে।

প্রস্তাবিত এই মহাপরিকল্পনার ভেতর উঁকি দিলে দেখা যায় এক নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ ও ব্যয়বহুল হলো ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক পিপিপি প্রকল্প’, যেখানে দেশের লাইফলাইন খ্যাত এই রুটটিকে সম্পূর্ণ বদলে দিতে এককভাবেই প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া পরিবেশ ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পায়রা শিল্পাঞ্চলে ‘ই-বর্জ্য রিসাইক্লিং প্রকল্প’ বাবদ ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার এবং ঢাকা ও অন্য বড় শহরগুলোর আবর্জনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের (Waste-to-Energy) জন্য আরও প্রায় ৮৯০ মিলিয়ন ডলারের মেগা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। মোংলা বন্দর ও তার চারপাশের অর্থনৈতিক অঞ্চলকে বৈশ্বিক লজিস্টিকস হাবে রূপান্তর করতে প্রায় ৬৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ছক এঁকেছে চীনা জায়ান্টরা।

শিল্প ও প্রথাগত খাতের বাইরে গিয়ে এবার চীনের নজর পড়েছে বাংলাদেশের প্রযুক্তি ও শিক্ষা অবকাঠামোতেও। বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়নে প্রায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার, দেশের তীব্র জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও গ্যাস খাতের উন্নয়নে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুৎ চুরি ও সিস্টেম লস রোধে আধুনিক ‘স্মার্ট মিটার’ উৎপাদনে আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। এছাড়া রপ্তানি বাণিজ্যকে শক্তিশালী করতে লজিস্টিকস ও কোল্ড চেইন খাতে ১৮০ মিলিয়ন ডলার এবং টেক্সটাইল, লিথিয়াম ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ, রেল কোচ উৎপাদন ও ঔষধি উদ্ভিদ শিল্পের মতো পৃথক পাঁচটি বিশেষ খাতে ১৯০ মিলিয়ন ডলার করে মোট ৯৫০ মিলিয়ন ডলারের বড় বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে বেইজিং।

বিডার নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রস্তাবিত এই বিশাল বৈদেশিক মূলধন যদি সত্যিই মাঠে গড়ায়, তবে তা বাংলাদেশের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ভারী শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তির স্থানান্তরে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। তবে এটি মনে রাখা জরুরি যে, এই বিপুল অঙ্কের টাকা এখনো কেবলই প্রাথমিক ‘বিনিয়োগ প্রস্তাব’ বা কাগুজে পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রস্তাবগুলোকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক তহবিল দেশের অর্থনীতিতে সফলভাবে যুক্ত করতে হলে দ্রুত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, দ্বিপাক্ষিক চূড়ান্ত চুক্তি সম্পাদন এবং প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তব অগ্রগতি নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল