দিকপাল

স্বাধীনতাবিরোধী ইস্যুতে বিএনপিকেই জবাব দিতে হবে: গোলাম পরওয়ার


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬ | ০৩:৩৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বাধীনতাবিরোধী ইস্যুতে বিএনপিকেই জবাব দিতে হবে: গোলাম পরওয়ার

একাত্তরে স্বাধীনতা বিরোধিতার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার যে আহ্বান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, তার তীব্র সমালোচনা করে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি দাবি করেছেন, স্বাধীনতার পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে থাকা অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন ব্যক্তিকে মন্ত্রী, এমপি, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী করেছিল; তাই এ বিষয়ে জবাব বিএনপিকেই দিতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। গত রোববার জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানোর পর এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে এলো।

মির্জা ফখরুলকে উদ্দেশ্য করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলুন। কারণ আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইব কেন? আপনার বাবার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আছে। সুতরাং কথা সতর্কভাবে বলা উচিত”। তিনি ৫০-৬০ বছরের পুরোনো একাত্তরের মীমাংসিত বিষয়কে বারবার সামনে এনে জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করার সমালোচনা করেন এবং বলেন যে, তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য তখনকার নেতৃবৃন্দ যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তার ব্যাখ্যা তারা আগেই দিয়ে গেছেন।

বিএনপির সাথে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল প্রশ্ন তোলেন, “এখন যে প্রশ্ন বিএনপি তুলছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সময় তাদের সেই অবস্থান কোথায় ছিল?” তিনি উল্লেখ করেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয়, ১৮-দলীয় ও ২০-দলীয় জোটে প্রায় ২০-২২ বছর তারা একসঙ্গে রাজনীতি করেছেন, এমনকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় বিএনপি নেতারা অধ্যাপক গোলাম আযমের বাসায় সমর্থন চাইতে গিয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনে জামায়াতের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, ক্ষমতায় গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের হত্যার মাধ্যমে ছাত্রদল সেই সমর্থনের প্রতিদান দিয়েছিল। যখনই জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার যুক্তি থাকে না, তখনই জনগণকে বিভ্রান্ত করতে এই পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি গণমাধ্যমের ভূমিকারও তীব্র সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, দু-একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের সংবাদপত্র সরাসরি বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা ও মুখপত্রের ভূমিকা পালন করছে এবং এই পত্রিকাগুলো বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তাদের নির্লজ্জ দালালি করেছিল, যা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ রূপ পরিবর্তন করেছে। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও বক্তব্য রাখেন এবং বলেন যে, অতীতে বিভাজনের রাজনীতির কারণে সুন্দর বাংলাদেশ গড়া যায়নি এবং বর্তমান সরকারও নেপথ্যে থেকে সেই বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, তখন বিএনপি ও জামায়াতের মতো দীর্ঘদিনের দুই মিত্রের মধ্যে একাত্তরের ইস্যু নিয়ে এই প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত দুই দশক ধরে এই দুই দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করলেও, ক্ষমতার নতুন বিন্যাসে নিজেদের একক আধিপত্য বা কৌশলগত অবস্থান শক্ত করতেই এই আদর্শিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ককে পুনরায় সামনে আনা হচ্ছে। এই ধরনের কাদা ছোড়াছুড়ি ও বিভাজনের রাজনীতি আখেরে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট এবং অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬


স্বাধীনতাবিরোধী ইস্যুতে বিএনপিকেই জবাব দিতে হবে: গোলাম পরওয়ার

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুলাই ২০২৬

featured Image

একাত্তরে স্বাধীনতা বিরোধিতার জন্য জামায়াতে ইসলামীকে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার যে আহ্বান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, তার তীব্র সমালোচনা করে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি দাবি করেছেন, স্বাধীনতার পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে থাকা অন্তত ১৪ থেকে ১৫ জন ব্যক্তিকে মন্ত্রী, এমপি, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী করেছিল; তাই এ বিষয়ে জবাব বিএনপিকেই দিতে হবে।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবের আবদুস সালাম মিলনায়তনে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই প্রতিক্রিয়া জানান। গত রোববার জাতীয় সংসদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জামায়াতকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানানোর পর এই পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে এলো।

মির্জা ফখরুলকে উদ্দেশ্য করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আয়নায় নিজের চেহারা দেখুন। ক্ষমা আপনার বাবাকে কবর থেকে চাইতে বলুন। কারণ আমরা অপরাধ করি নাই, ক্ষমা চাইব কেন? আপনার বাবার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আছে। সুতরাং কথা সতর্কভাবে বলা উচিত”। তিনি ৫০-৬০ বছরের পুরোনো একাত্তরের মীমাংসিত বিষয়কে বারবার সামনে এনে জাতির মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করার সমালোচনা করেন এবং বলেন যে, তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতীয় আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য তখনকার নেতৃবৃন্দ যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তার ব্যাখ্যা তারা আগেই দিয়ে গেছেন।

বিএনপির সাথে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল প্রশ্ন তোলেন, “এখন যে প্রশ্ন বিএনপি তুলছে, জামায়াতের সঙ্গে জোট করার সময় তাদের সেই অবস্থান কোথায় ছিল?” তিনি উল্লেখ করেন, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে চারদলীয়, ১৮-দলীয় ও ২০-দলীয় জোটে প্রায় ২০-২২ বছর তারা একসঙ্গে রাজনীতি করেছেন, এমনকি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সময় বিএনপি নেতারা অধ্যাপক গোলাম আযমের বাসায় সমর্থন চাইতে গিয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৯১ সালে বিএনপিকে সরকার গঠনে জামায়াতের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, ক্ষমতায় গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের হত্যার মাধ্যমে ছাত্রদল সেই সমর্থনের প্রতিদান দিয়েছিল। যখনই জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার যুক্তি থাকে না, তখনই জনগণকে বিভ্রান্ত করতে এই পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটা হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

সংবাদ সম্মেলনে কয়েকটি গণমাধ্যমের ভূমিকারও তীব্র সমালোচনা করেন গোলাম পরওয়ার। তিনি অভিযোগ করেন, দু-একটি ব্যবসায়ী গ্রুপের সংবাদপত্র সরাসরি বিএনপির রাজনৈতিক এজেন্ডা ও মুখপত্রের ভূমিকা পালন করছে এবং এই পত্রিকাগুলো বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে তাদের নির্লজ্জ দালালি করেছিল, যা ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ রূপ পরিবর্তন করেছে। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদও বক্তব্য রাখেন এবং বলেন যে, অতীতে বিভাজনের রাজনীতির কারণে সুন্দর বাংলাদেশ গড়া যায়নি এবং বর্তমান সরকারও নেপথ্যে থেকে সেই বিভাজনের রাজনীতি শুরু করেছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হচ্ছে, তখন বিএনপি ও জামায়াতের মতো দীর্ঘদিনের দুই মিত্রের মধ্যে একাত্তরের ইস্যু নিয়ে এই প্রকাশ্য বাকযুদ্ধ দেশের রাজনৈতিক সমীকরণে একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিগত দুই দশক ধরে এই দুই দল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলন করলেও, ক্ষমতার নতুন বিন্যাসে নিজেদের একক আধিপত্য বা কৌশলগত অবস্থান শক্ত করতেই এই আদর্শিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ককে পুনরায় সামনে আনা হচ্ছে। এই ধরনের কাদা ছোড়াছুড়ি ও বিভাজনের রাজনীতি আখেরে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট এবং অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্র সংস্কারের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল