দিকপাল

অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানির মিশ্র চিত্র চীনে উল্লম্ফন ভারতে ধাক্কা


আহমেদ রিয়াদ
আহমেদ রিয়াদ নিউজ এডিটর
প্রকাশ : বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬ | ১০:৩১ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানির মিশ্র চিত্র চীনে উল্লম্ফন ভারতে ধাক্কা

প্রচলিত পশ্চিমা বাজারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কাটিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের যে উদ্যোগ বাংলাদেশ নিয়েছে, তা বর্তমানে এক মিশ্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা বাড়লেও ভারত, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া এবং রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত বাজারগুলোতে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়কালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলের সুফল সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।


চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক। পোশাকের পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত দ্রব্য ও জুতা রপ্তানির ওপর ভিত্তি করে দেশটিতে গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। একইভাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আমাদের পণ্য বহুমুখীকরণের সক্ষমতাকেই তুলে ধরে। তবে এই সাফল্যের উল্টো চিত্রও বিদ্যমান। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অপ্রচলিত রপ্তানি গন্তব্য ভারতের বাজারে রপ্তানি কমেছে প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। একইভাবে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের মতো দেশগুলোতেও রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রাশিয়ার বাজারেও রপ্তানি বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে পড়েছে।


পোশাক খাতের তথ্যেও এই ঝিমুনি স্পষ্ট। বিজিএমইএ ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, অপ্রচলিত বাজারগুলোতে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ছয় শতাংশ কমেছে। এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও পোশাক রপ্তানিতে প্রায় পাঁচ শতাংশ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা এবং এসব বাজারে নতুন পণ্যের অভাব রপ্তানি বহুমুখীকরণের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে ভারত, তুরস্ক বা অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বাংলাদেশ এখনও মূলত ঐতিহ্যবাহী শ্রমনির্ভর পোশাক ও পাটজাত পণ্যের ওপরই ভরসা করে আছে, যা বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পর্যাপ্ত নয়।


স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া এখন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নয়, বরং সময়ের দাবি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে নতুন বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং শক্তিশালী বাণিজ্য নীতি। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার প্রবেশের ক্ষেত্রে যেসব শুল্ক ও অশুল্ক বাধা রয়েছে, তা দূর করতে সরকারি পর্যায়ে আরও সক্রিয় আলোচনা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।


ভারতের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে বাংলাদেশকে কেবল পণ্যের বৈচিত্র্য আনলেই চলবে না, বরং উৎপাদন সক্ষমতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নও নিশ্চিত করতে হবে। এলডিসি পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক চুক্তির কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার এবং বাজারের বহুমুখীকরণের গতি বাড়াতে হবে। সব মিলিয়ে, রপ্তানি খাতের এই মিশ্র ফলাফল আমাদের বার্তা দিচ্ছে যে, প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন গন্তব্য খুঁজে বের করা কঠিন হলেও তা বর্তমান সময়ের অপরিহার্য চাহিদা। সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতি এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে এই বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

 

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬


অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানির মিশ্র চিত্র চীনে উল্লম্ফন ভারতে ধাক্কা

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬

featured Image

প্রচলিত পশ্চিমা বাজারের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কাটিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের যে উদ্যোগ বাংলাদেশ নিয়েছে, তা বর্তমানে এক মিশ্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা বাড়লেও ভারত, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া এবং রাশিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ অপ্রচলিত বাজারগুলোতে প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে মাস পর্যন্ত সময়কালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানি কৌশলের সুফল সব জায়গায় সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না।


চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক। পোশাকের পাশাপাশি পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত দ্রব্য ও জুতা রপ্তানির ওপর ভিত্তি করে দেশটিতে গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৬ শতাংশ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। একইভাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশগুলোতে বাংলাদেশি পণ্যের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আমাদের পণ্য বহুমুখীকরণের সক্ষমতাকেই তুলে ধরে। তবে এই সাফল্যের উল্টো চিত্রও বিদ্যমান। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অপ্রচলিত রপ্তানি গন্তব্য ভারতের বাজারে রপ্তানি কমেছে প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ। একইভাবে অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্কের মতো দেশগুলোতেও রপ্তানি আয়ের নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রাশিয়ার বাজারেও রপ্তানি বাণিজ্য সংকুচিত হয়ে পড়েছে।


পোশাক খাতের তথ্যেও এই ঝিমুনি স্পষ্ট। বিজিএমইএ ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, অপ্রচলিত বাজারগুলোতে পোশাক রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ছয় শতাংশ কমেছে। এর বাইরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারেও পোশাক রপ্তানিতে প্রায় পাঁচ শতাংশ ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তৈরি পোশাক খাতের ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা এবং এসব বাজারে নতুন পণ্যের অভাব রপ্তানি বহুমুখীকরণের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে ভারত, তুরস্ক বা অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বাংলাদেশ এখনও মূলত ঐতিহ্যবাহী শ্রমনির্ভর পোশাক ও পাটজাত পণ্যের ওপরই ভরসা করে আছে, যা বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পর্যাপ্ত নয়।


স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া এখন আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নয়, বরং সময়ের দাবি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রপ্তানি খাতকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে নতুন বাজারে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং শক্তিশালী বাণিজ্য নীতি। জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার প্রবেশের ক্ষেত্রে যেসব শুল্ক ও অশুল্ক বাধা রয়েছে, তা দূর করতে সরকারি পর্যায়ে আরও সক্রিয় আলোচনা ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।


ভারতের মতো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিতে হলে বাংলাদেশকে কেবল পণ্যের বৈচিত্র্য আনলেই চলবে না, বরং উৎপাদন সক্ষমতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকায়নও নিশ্চিত করতে হবে। এলডিসি পরবর্তী সময়ে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক চুক্তির কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ডলারের বিনিময় হার এবং বাজারের বহুমুখীকরণের গতি বাড়াতে হবে। সব মিলিয়ে, রপ্তানি খাতের এই মিশ্র ফলাফল আমাদের বার্তা দিচ্ছে যে, প্রচলিত বাজারের বাইরে নতুন গন্তব্য খুঁজে বের করা কঠিন হলেও তা বর্তমান সময়ের অপরিহার্য চাহিদা। সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী বাণিজ্য কূটনীতি এবং পণ্যের গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে এই বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল