দিকপাল

শিল্প খাতে সংকট, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পণ্য


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ | ০৪:৩০ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

শিল্প খাতে সংকট, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পণ্য

দেশের শিল্পখাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদহার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার তীব্র মন্দার কবলে পড়ে উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অভাবে বৈশ্বিক বাজারেও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দ্রুত হারিয়ে ফেলছে বাংলাদেশের পণ্য। নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সচল কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। উদ্যোক্তারা এখন আর মুনাফার আশা করছেন না, বরং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এক কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই শিল্প স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সংকোচনের নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর খাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

বর্তমান এই সংকটগুলোর শিকড় অনেক গভীর, যার নেপথ্যে বিগত সরকারের সময়কালে নেওয়া ভুল নীতি ও অব্যবস্থাপনার বড় দায় রয়েছে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের তীব্র সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আশঙ্কাজনক হ্রাস শিল্পখাতকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব ও খেলাপি ঋণের দৌরাত্ম্য নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব শিল্প উৎপাদনের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হেনেছে। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপের অভাবে কারখানাগুলোর চাকা ঘোরানোই এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিটিএমএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের সরবরাহ যেখানে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় থাকার কথা, সেখানে বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। গ্যাস সংকটের কারণে জেনারেটর চালিয়ে বিকল্প উপায়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত, যা বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দামের সঙ্গে ভারসাম্য রাখতে উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শিল্প উৎপাদন সূচক বিশ্লেষণ করলে চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়। টেক্সটাইল, জুট, ওষুধ, সিমেন্টসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে উৎপাদনের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইস্পাত বা রড শিল্পে তো পরিস্থিতি চরম অস্তিত্ব সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পর টনপ্রতি রড উৎপাদনে যে বাড়তি খরচ যুক্ত হয়েছে, তা ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানাকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে। একই অবস্থা নির্মাণ সামগ্রীর বাজারেও, যেখানে চাহিদা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। পোশাক শিল্পের অবস্থাও নাজুক, যা দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ জোগান দেয়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে অথবা ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের কাছে হাতছাড়া হয়ে গেছে।

চামড়াশিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতটিও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার শিকার। পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে না পারা এবং সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের অকার্যকারিতা এই শিল্পটিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কোণঠাসা করে রেখেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক রপ্তানি আয়ও গত বছরের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে কমছে। ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো যখন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুবিধা ও সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে বিশ্ববাজারের বড় অংশ দখল করছে, তখন বাংলাদেশ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়ছে। অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতের অবদান গত এক দশকে ১১ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসা শিল্পায়নের পথে বড় অন্তরায়।

শিল্প মালিক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, এই সংকট নিরসনে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। এর মধ্যে শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতে সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং ডলার বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং কর ব্যবস্থা সহজীকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। সামষ্টিক অর্থনীতির এই চাপের মুখে শিল্পখাতের স্থবিরতা রোধ করা না গেলে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ২২ জুন ২০২৬


শিল্প খাতে সংকট, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশের পণ্য

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুন ২০২৬

featured Image

দেশের শিল্পখাত বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদহার এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার তীব্র মন্দার কবলে পড়ে উৎপাদন ব্যবস্থা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের অভাবে বৈশ্বিক বাজারেও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা দ্রুত হারিয়ে ফেলছে বাংলাদেশের পণ্য। নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা যেমন বাড়ছে, তেমনি সচল কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। উদ্যোক্তারা এখন আর মুনাফার আশা করছেন না, বরং অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এক কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এই শিল্প স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থান সংকোচনের নেতিবাচক প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে গভীর খাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদরা।

বর্তমান এই সংকটগুলোর শিকড় অনেক গভীর, যার নেপথ্যে বিগত সরকারের সময়কালে নেওয়া ভুল নীতি ও অব্যবস্থাপনার বড় দায় রয়েছে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলারের তীব্র সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের আশঙ্কাজনক হ্রাস শিল্পখাতকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অভাব ও খেলাপি ঋণের দৌরাত্ম্য নতুন বিনিয়োগে উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতা তৈরি করেছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব শিল্প উৎপাদনের ওপর চূড়ান্ত আঘাত হেনেছে। সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের মতো শিল্পাঞ্চলগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপের অভাবে কারখানাগুলোর চাকা ঘোরানোই এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিটিএমএ-এর তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসের সরবরাহ যেখানে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় থাকার কথা, সেখানে বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। গ্যাস সংকটের কারণে জেনারেটর চালিয়ে বিকল্প উপায়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত, যা বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দামের সঙ্গে ভারসাম্য রাখতে উদ্যোক্তাদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শিল্প উৎপাদন সূচক বিশ্লেষণ করলে চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়। টেক্সটাইল, জুট, ওষুধ, সিমেন্টসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাতে উৎপাদনের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। ইস্পাত বা রড শিল্পে তো পরিস্থিতি চরম অস্তিত্ব সংকটের পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পর টনপ্রতি রড উৎপাদনে যে বাড়তি খরচ যুক্ত হয়েছে, তা ছোট ও মাঝারি অনেক কারখানাকে স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিতে বাধ্য করেছে। একই অবস্থা নির্মাণ সামগ্রীর বাজারেও, যেখানে চাহিদা ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। পোশাক শিল্পের অবস্থাও নাজুক, যা দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ জোগান দেয়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ায় অনেক রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে অথবা ভারত ও ভিয়েতনামের মতো প্রতিযোগীদের কাছে হাতছাড়া হয়ে গেছে।

চামড়াশিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতটিও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার শিকার। পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণ করতে না পারা এবং সাভারের ট্যানারি শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগারের অকার্যকারিতা এই শিল্পটিকে আন্তর্জাতিক বাজারে কোণঠাসা করে রেখেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক রপ্তানি আয়ও গত বছরের তুলনায় ধারাবাহিকভাবে কমছে। ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো যখন নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সুবিধা ও সরকারি প্রণোদনার মাধ্যমে বিশ্ববাজারের বড় অংশ দখল করছে, তখন বাংলাদেশ অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে পিছিয়ে পড়ছে। অর্থনীতিতে উৎপাদন খাতের অবদান গত এক দশকে ১১ শতাংশ থেকে কমে ৯ শতাংশের নিচে নেমে আসা শিল্পায়নের পথে বড় অন্তরায়।

শিল্প মালিক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, এই সংকট নিরসনে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। এর মধ্যে শিল্প কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাতে সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং ডলার বাজারের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে জরুরি। পাশাপাশি লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং কর ব্যবস্থা সহজীকরণের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। সামষ্টিক অর্থনীতির এই চাপের মুখে শিল্পখাতের স্থবিরতা রোধ করা না গেলে কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, যা দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল