গাজার ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর চালানো ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড এবং একে ঘিরে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রকাশিত এই নতুন নথিতে উঠে এসেছে যে, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইল সুপরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে আসছে, যা মূলত একটি সুদূরপ্রসারী গণহত্যার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের ভয়াবহতায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। কমিশনের এই পর্যবেক্ষণ যুদ্ধের নৃশংসতাকে এক নতুন মাত্রায় উন্মোচিত করেছে, যেখানে শিশুদের মৃত্যু নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিত।
জাতিসংঘের এই কমিশন তাদের গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় ভারী ও মারাত্মক বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার এবং ত্রাণ ও খাদ্য সরবরাহের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপের মাধ্যমে ইসরাইল গাজার শিশুদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরবর্তী সময়েও শিশুদের ওপর এই পরিকল্পিত হামলা অব্যাহত ছিল। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর পুরো অংশকেই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে যে যৌথ শাস্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেছে, তারই শিকার হয়েছে এসব নিরপরাধ শিশু। কমিশনের প্রধান শ্রীনিবাসন মুরলিধর স্পষ্টভাবে বলেছেন, শিশুদের ওপর এই ধরনের লক্ষ্যবস্তু আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনি জাতির টিকে থাকার সক্ষমতা এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
শুধুমাত্র গাজাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এই ভয়াবহ চিত্র পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম পর্যন্ত বিস্তৃত। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শিশুদের গণ-গ্রেপ্তারের ঘটনা চরম আকার ধারণ করেছে। আটকের সময় শিশুদের ওপর চালানো শারীরিক নির্যাতন, মারধর, পর্যাপ্ত খাবার থেকে বঞ্চিত রাখা এবং অমানবিক আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্পষ্টত মানবতাবিরোধী অপরাধ। বিশেষ করে আটকদের সাথে যেভাবে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে, তা ফিলিস্তিনি শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে। যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, ওষুধের অভাব এবং হাসপাতালগুলোতে হামলার ফলে নবজাতকদের মৃত্যুহার বৃদ্ধি এবং গর্ভপাতের ঘটনাগুলো বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিভিন্ন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, ইসরাইলি শীর্ষ নেতৃত্ব ফিলিস্তিনিদের বিলুপ্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে উসকানি দিচ্ছে। যদিও ইসরাইলি মিশন জাতিসংঘের এই তদন্ত প্রতিবেদনকে বরাবরের মতোই প্রত্যাখ্যান করে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে আখ্যায়িত করেছে, তবুও বিশ্বজুড়ে নিরপেক্ষ গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এই প্রতিবেদনটি ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান ভয়াবহতার এক অকাট্য দলিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক আইনে 'গণহত্যা'র যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলি কর্মকাণ্ড সেই সংজ্ঞার সাথে সরাসরি মিলে যায়। ফিলিস্তিনি শিশুদের এই চরম ভোগান্তি এবং তাদের অস্তিত্বের সংকট বিশ্ববিবেকের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক সমর্থন আর রাজনৈতিক অবস্থানের আড়ালে আড়াল করা যাচ্ছে না মানবিক বিপর্যয়ের এই বীভৎসতাকে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ জুন ২০২৬
গাজার ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর চালানো ইসরাইলি বাহিনীর বর্বরোচিত কর্মকাণ্ড এবং একে ঘিরে জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তদন্ত প্রতিবেদনটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রকাশিত এই নতুন নথিতে উঠে এসেছে যে, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইল সুপরিকল্পিতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করে আসছে, যা মূলত একটি সুদূরপ্রসারী গণহত্যার অংশ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের ভয়াবহতায় যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। কমিশনের এই পর্যবেক্ষণ যুদ্ধের নৃশংসতাকে এক নতুন মাত্রায় উন্মোচিত করেছে, যেখানে শিশুদের মৃত্যু নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং ইচ্ছাকৃত এবং পরিকল্পিত।
জাতিসংঘের এই কমিশন তাদের গবেষণায় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় ভারী ও মারাত্মক বিস্ফোরক অস্ত্রের ব্যবহার এবং ত্রাণ ও খাদ্য সরবরাহের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপের মাধ্যমে ইসরাইল গাজার শিশুদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার চেষ্টা করছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরবর্তী সময়েও শিশুদের ওপর এই পরিকল্পিত হামলা অব্যাহত ছিল। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর পুরো অংশকেই সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে যে যৌথ শাস্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেছে, তারই শিকার হয়েছে এসব নিরপরাধ শিশু। কমিশনের প্রধান শ্রীনিবাসন মুরলিধর স্পষ্টভাবে বলেছেন, শিশুদের ওপর এই ধরনের লক্ষ্যবস্তু আক্রমণের মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনি জাতির টিকে থাকার সক্ষমতা এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।
শুধুমাত্র গাজাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এই ভয়াবহ চিত্র পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম পর্যন্ত বিস্তৃত। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সেখানে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে শিশুদের গণ-গ্রেপ্তারের ঘটনা চরম আকার ধারণ করেছে। আটকের সময় শিশুদের ওপর চালানো শারীরিক নির্যাতন, মারধর, পর্যাপ্ত খাবার থেকে বঞ্চিত রাখা এবং অমানবিক আচরণের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী স্পষ্টত মানবতাবিরোধী অপরাধ। বিশেষ করে আটকদের সাথে যেভাবে নিষ্ঠুর আচরণ করা হয়েছে, তা ফিলিস্তিনি শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশে অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে। যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষ, ওষুধের অভাব এবং হাসপাতালগুলোতে হামলার ফলে নবজাতকদের মৃত্যুহার বৃদ্ধি এবং গর্ভপাতের ঘটনাগুলো বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিভিন্ন পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, ইসরাইলি শীর্ষ নেতৃত্ব ফিলিস্তিনিদের বিলুপ্ত করার জন্য পরিকল্পিতভাবে উসকানি দিচ্ছে। যদিও ইসরাইলি মিশন জাতিসংঘের এই তদন্ত প্রতিবেদনকে বরাবরের মতোই প্রত্যাখ্যান করে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে আখ্যায়িত করেছে, তবুও বিশ্বজুড়ে নিরপেক্ষ গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা মনে করছেন, এই প্রতিবেদনটি ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান ভয়াবহতার এক অকাট্য দলিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক আইনে 'গণহত্যা'র যে সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরাইলি কর্মকাণ্ড সেই সংজ্ঞার সাথে সরাসরি মিলে যায়। ফিলিস্তিনি শিশুদের এই চরম ভোগান্তি এবং তাদের অস্তিত্বের সংকট বিশ্ববিবেকের ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, যেখানে কূটনৈতিক সমর্থন আর রাজনৈতিক অবস্থানের আড়ালে আড়াল করা যাচ্ছে না মানবিক বিপর্যয়ের এই বীভৎসতাকে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আপনার মতামত লিখুন