ইরানের সাবেক প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যার প্রতিশোধ নিতে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কন্যা ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে হত্যার এক ভয়ানক ও সুদূরপ্রসারী গোপন ষড়যন্ত্রের তথ্য ফাঁস হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ৩২ বছর বয়সী ইরাকি নাগরিক মোহাম্মদ বাকের সাদ দাউদ আল-সাদি এই গুপ্তহত্যার নীল নকশা তৈরি করেছিল। সে ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নিজের বাহিনীর কাছে কঠিন অঙ্গীকার করেছিল। শুধু তাই নয়, তদন্তকারী ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো দাবি করেছে যে, ফ্লোরিডায় অবস্থিত ইভাঙ্কা ট্রাম্পের বিলাসবহুল সুরক্ষিত বাড়ির একটি নিখুঁত মানচিত্র বা নকশাও সে নিজের জিম্মায় সংগ্রহ করেছিল। মূলত ছয় বছর আগে ইরাকের বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মৃত্যুর নির্মম প্রতিশোধ নিতেই আল-সাদি ট্রাম্পের পরিবারকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইরাকি দূতাবাসের সাবেক উপ-সামরিক কর্মকর্তা ইনতিফাদ কানবার এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, জেনারেল কাসেম নিহত হওয়ার পর তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়া আল-সাদি তার বিশ্বস্ত লোকজনদের বলে বেড়াত যে, ট্রাম্প যেভাবে হামলা চালিয়ে আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই ট্রাম্পের বাড়ি জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে আমাদের ইভাঙ্কাকে খুন করতে হবে। কানবার আরও উল্লেখ করেন যে, আল-সাদির কাছে ফ্লোরিডার সেই বিশেষ সুরক্ষিত এলাকার একটি নকশা থাকার বিষয়টি তারা বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ব্যক্তি নিজের উগ্র অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। সে নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে ফ্লোরিডার ওই অতি সুরক্ষিত আবাসিক এলাকার একটি কৃত্রিম উপগ্রহের চিত্র পোস্ট করেছিল, যেখানে ইভাঙ্কা ও তার স্বামী জ্যারেড কুশনারের চব্বিশ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এক বিশাল রাজপ্রাসাদ রয়েছে। সেই ছবির সাথে সে আরবি ভাষায় একটি প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে লিখেছিল যে, আমি আমেরিকানদের বলছি এই ছবিটার দিকে তাকাতে। জেনে রাখো, তোমাদের এই রাজপ্রাসাদ বা মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা কেউই তোমাদের শেষ রক্ষা করতে পারবে না। আমরা এখন সার্বক্ষণিক নজরদারি আর গভীর বিশ্লেষণের শেষ পর্যায়ে আছি। আমি তোমাদের আগেই সতর্ক করেছি যে, আমাদের চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়াটা এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার।
মার্কিন বিচার বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আল-সাদি ইরাক ও ইরানের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিপজ্জনক গোপন নেটওয়ার্কের উচ্চপর্যায়ের নেতা হিসেবে কাজ করত। গত পনেরোই মে তুরস্ক থেকে আন্তর্জাতিক যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আটকের পর তাকে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে মোট আঠারোটি বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা এবং হামলার ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য বড় অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে গত মার্চ মাসে আমস্টারডামের ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক মেলন-এ শক্তিশালী বোমা হামলা, এপ্রিলে লন্ডনের রাস্তায় দুই ইহুদি নাগরিককে অতর্কিত ছুরিকাঘাত এবং মার্চ মাসে টরন্টোতে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট ভবনের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি চালানোর ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের মতে, আল-সাদি আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ কিছু বড় হামলার মূল পরিকল্পনা ও সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছে। সে বেলজিয়ামের একটি ইহুদি উপাসনালয়ে বোমা হামলা, রটারড্যামে একটি উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে আমেরিকার মাটিতে হওয়া বেশ কিছু ব্যর্থ হামলার পেছনে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছে। উল্লেখ্য, চুয়াল্লিশ বছর বয়সী ইভাঙ্কা ট্রাম্প রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনারকে বিয়ের আগে ২০০৯ সালে সনাতন ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হন। এই ভয়ঙ্কর গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজী হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আল-সাদি একইসাথে কাতায়েব হিজবুল্লাহ এবং ইরানের আইআরজিসি-র হয়ে আড়ালে কাজ করত। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা নিউ লাইন্স ইনস্টিটিউট-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক এলিজাবেথ সুরকোভ জানান, প্রকাশ্যে পাওয়া নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, মোহাম্মদ বাকের নিহত জেনারেল কাসেম সোলেইমানির অত্যন্ত কাছের মানুষ এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। এই সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর যেকোনো সাধারণ কর্মীর জন্য সোলেইমানির ঘনিষ্ঠ হওয়াটা অনেক বড় একটি মর্যাদার বিষয়। সোলেইমানির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি জেনারেল ইসমাইল কানির সাথেও সে অত্যন্ত মজবুত ও ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। কাকতালীয়ভাবে, গবেষক সুরকোভ নিজে ২০২৩ সালে বাগদাদে অপহৃত হয়ে এই কাতায়েব হিজবুল্লাহর হাতে দীর্ঘ নয়শত তিন দিন বন্দি ছিলেন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান। তবে আল-সাদি তাকে জিম্মি করা লোকদের মধ্যে সরাসরি উপস্থিত ছিল কি না, তা সুরকোভ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, কারণ বন্দি অবস্থায় জিম্মিকারীরা সবসময় কালো মুখোশ পরে থাকত। সুরকোভ আরও জানান, আল-সাদি জেনারেল ইসমাইল কানির সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে এই ধরনের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইরান থেকে প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তা পেয়ে যেত।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা কানবারের মতে, আল-সাদি কাসেম সোলেইমানিকে নিজের পিতার মতো শ্রদ্ধা করত। আল-সাদির নিজের বাবা, যিনি নিজেও ইরানের একজন নামকরা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন, ২০০৬ সালে এক আকস্মিক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর সে সোলেইমানিকে নিজের জীবনের অভিভাবক হিসেবে বেছে নেয়। আল-সাদির জীবনের বড় একটা অংশ বাগদাদে তার ইরাকি মায়ের কাছে কাটলেও পরে সে বিশেষ সামরিক ও গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ নিতে তেহরানে পাড়ি জমায়। পরবর্তীতে আল-সাদি ধর্মীয় ভ্রমণের একটি ট্রাভেল এজেন্সি বা ভ্রমণ সংস্থা খোলে, যার আড়ালে মূলত বিশ্বের নানা দেশে একটি নিজস্ব গুপ্তচর নেটওয়ার্ক গড়ার কাজ চালাত সে। গত সপ্তাহে তুরস্কে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় আল-সাদির কাছ থেকে ইরাকের একটি বিশেষ সরকারি বা সার্ভিস পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। এই বিশেষ পাসপোর্ট মূলত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী এবং আমলাদের দেওয়া হয়, যা ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সম্মতি ছাড়া পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই ভিআইপি পাসপোর্টের সুবিধা ব্যবহার করে সে বিশ্বজুড়ে খুব সহজেই ভ্রমণ করতে পারত, ইরাকি বিমানবন্দরে সাধারণ তল্লাশি এড়াতে পারত এবং ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ পেত। এই পাসপোর্টের ক্ষমতার কারণেই সে খুব সহজেই এমন সব দেশের ভিসা পেয়ে যেত যেখানে সে বড় ধরনের হামলার নিখুঁত ছক কষেছিল। ধরা পড়ার সময় আল-সাদি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল বলে জানা গেছে।
আইআরজিসি'র এই সন্দেহভাজন দুর্ধর্ষ সদস্য হিসেবে আল-সাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রচার করতে একটু বেশিই ভালোবাসত। তার এক্স অ্যাকাউন্টে দেখা যায়, সে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার এবং কুয়ালালামপুরের পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে ছবি তুলেছে। এছাড়া, তার স্ন্যাপচ্যাট অ্যাকাউন্টে এমন কিছু গোপন ছবি ও সামরিক নথি পাওয়া গেছে যেখানে সে স্বয়ং কাসেম সোলেইমানির সাথে কোনো একটি গোপন সামরিক ঘাঁটিতে বসে যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে গভীর আলোচনা করছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, সোলেইমানি নিহত হওয়ার সাত মাস পর, ২০২০ সালের আগস্টে আল-সাদি এক্স-এ একটি ছবি পোস্ট করে যার ক্যাপশনে সে লিখেছিল, আমেরিকান শত্রুরা পুরোপুরি পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত আমি ডিজিটাল দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছি এবং আমার সব ফোন বন্ধ করে দিচ্ছি, জয় অথবা শাহাদাত। তবে ২০২৫ সালে সে তার এক্স অ্যাকাউন্টে আরেকটি শেষ পোস্ট দিয়ে সোলেইমানি এবং মার্কিন হামলায় নিহত অন্য ইরানি সামরিক নেতাকে শহীদ বলে আখ্যায়িত করে। আল-সাদি তার লক্ষ্যবস্তুদের স্ন্যাপচ্যাট মেসেজের মাধ্যমে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের ছবি পাঠিয়ে প্রতিনিয়ত হুমকি দিত। লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথেও তার সরাসরি সংযোগের প্রমাণ মিলেছে। বর্তমানে সে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারের একটি সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও অন্ধকার সেলে বন্দি রয়েছে, যেখানে আমেরিকার হাই-প্রোফাইল কয়েদিদের কড়া পাহারায় রাখা হয়।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট

রোববার, ২৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬
ইরানের সাবেক প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলেইমানিকে ড্রোন হামলায় হত্যার প্রতিশোধ নিতে খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কন্যা ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে হত্যার এক ভয়ানক ও সুদূরপ্রসারী গোপন ষড়যন্ত্রের তথ্য ফাঁস হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্টের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া ৩২ বছর বয়সী ইরাকি নাগরিক মোহাম্মদ বাকের সাদ দাউদ আল-সাদি এই গুপ্তহত্যার নীল নকশা তৈরি করেছিল। সে ইভাঙ্কা ট্রাম্পকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে নিজের বাহিনীর কাছে কঠিন অঙ্গীকার করেছিল। শুধু তাই নয়, তদন্তকারী ও গোয়েন্দা সূত্রগুলো দাবি করেছে যে, ফ্লোরিডায় অবস্থিত ইভাঙ্কা ট্রাম্পের বিলাসবহুল সুরক্ষিত বাড়ির একটি নিখুঁত মানচিত্র বা নকশাও সে নিজের জিম্মায় সংগ্রহ করেছিল। মূলত ছয় বছর আগে ইরাকের বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি-র শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মৃত্যুর নির্মম প্রতিশোধ নিতেই আল-সাদি ট্রাম্পের পরিবারকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল।
ওয়াশিংটনে অবস্থিত ইরাকি দূতাবাসের সাবেক উপ-সামরিক কর্মকর্তা ইনতিফাদ কানবার এই বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, জেনারেল কাসেম নিহত হওয়ার পর তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়া আল-সাদি তার বিশ্বস্ত লোকজনদের বলে বেড়াত যে, ট্রাম্প যেভাবে হামলা চালিয়ে আমাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছেন, ঠিক সেভাবেই ট্রাম্পের বাড়ি জ্বালিয়ে ছাই করে দিতে আমাদের ইভাঙ্কাকে খুন করতে হবে। কানবার আরও উল্লেখ করেন যে, আল-সাদির কাছে ফ্লোরিডার সেই বিশেষ সুরক্ষিত এলাকার একটি নকশা থাকার বিষয়টি তারা বিভিন্ন সূত্র থেকে নিশ্চিত হয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ব্যক্তি নিজের উগ্র অবস্থান নিয়ে অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। সে নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে ফ্লোরিডার ওই অতি সুরক্ষিত আবাসিক এলাকার একটি কৃত্রিম উপগ্রহের চিত্র পোস্ট করেছিল, যেখানে ইভাঙ্কা ও তার স্বামী জ্যারেড কুশনারের চব্বিশ মিলিয়ন ডলার মূল্যের এক বিশাল রাজপ্রাসাদ রয়েছে। সেই ছবির সাথে সে আরবি ভাষায় একটি প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে লিখেছিল যে, আমি আমেরিকানদের বলছি এই ছবিটার দিকে তাকাতে। জেনে রাখো, তোমাদের এই রাজপ্রাসাদ বা মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা কেউই তোমাদের শেষ রক্ষা করতে পারবে না। আমরা এখন সার্বক্ষণিক নজরদারি আর গভীর বিশ্লেষণের শেষ পর্যায়ে আছি। আমি তোমাদের আগেই সতর্ক করেছি যে, আমাদের চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেওয়াটা এখন শুধুই সময়ের ব্যাপার।
মার্কিন বিচার বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আল-সাদি ইরাক ও ইরানের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিপজ্জনক গোপন নেটওয়ার্কের উচ্চপর্যায়ের নেতা হিসেবে কাজ করত। গত পনেরোই মে তুরস্ক থেকে আন্তর্জাতিক যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আটকের পর তাকে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসা হয়েছে। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ইউরোপ ও আমেরিকা জুড়ে মোট আঠারোটি বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা এবং হামলার ভয়ঙ্কর পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য বড় অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে গত মার্চ মাসে আমস্টারডামের ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক মেলন-এ শক্তিশালী বোমা হামলা, এপ্রিলে লন্ডনের রাস্তায় দুই ইহুদি নাগরিককে অতর্কিত ছুরিকাঘাত এবং মার্চ মাসে টরন্টোতে অবস্থিত মার্কিন কনস্যুলেট ভবনের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি চালানোর ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের মতে, আল-সাদি আন্তর্জাতিক স্তরে বেশ কিছু বড় হামলার মূল পরিকল্পনা ও সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করেছে। সে বেলজিয়ামের একটি ইহুদি উপাসনালয়ে বোমা হামলা, রটারড্যামে একটি উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান যুদ্ধের প্রতিশোধ হিসেবে আমেরিকার মাটিতে হওয়া বেশ কিছু ব্যর্থ হামলার পেছনে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছে। উল্লেখ্য, চুয়াল্লিশ বছর বয়সী ইভাঙ্কা ট্রাম্প রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী জ্যারেড কুশনারকে বিয়ের আগে ২০০৯ সালে সনাতন ইহুদি ধর্মে দীক্ষিত হন। এই ভয়ঙ্কর গুপ্তহত্যার ষড়যন্ত্রের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন হোয়াইট হাউসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজী হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আল-সাদি একইসাথে কাতায়েব হিজবুল্লাহ এবং ইরানের আইআরজিসি-র হয়ে আড়ালে কাজ করত। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা নিউ লাইন্স ইনস্টিটিউট-এর জ্যেষ্ঠ গবেষক এলিজাবেথ সুরকোভ জানান, প্রকাশ্যে পাওয়া নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, মোহাম্মদ বাকের নিহত জেনারেল কাসেম সোলেইমানির অত্যন্ত কাছের মানুষ এবং ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। এই সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর যেকোনো সাধারণ কর্মীর জন্য সোলেইমানির ঘনিষ্ঠ হওয়াটা অনেক বড় একটি মর্যাদার বিষয়। সোলেইমানির মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি জেনারেল ইসমাইল কানির সাথেও সে অত্যন্ত মজবুত ও ভালো সম্পর্ক বজায় রেখেছিল। কাকতালীয়ভাবে, গবেষক সুরকোভ নিজে ২০২৩ সালে বাগদাদে অপহৃত হয়ে এই কাতায়েব হিজবুল্লাহর হাতে দীর্ঘ নয়শত তিন দিন বন্দি ছিলেন এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মুক্তি পান। তবে আল-সাদি তাকে জিম্মি করা লোকদের মধ্যে সরাসরি উপস্থিত ছিল কি না, তা সুরকোভ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি, কারণ বন্দি অবস্থায় জিম্মিকারীরা সবসময় কালো মুখোশ পরে থাকত। সুরকোভ আরও জানান, আল-সাদি জেনারেল ইসমাইল কানির সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুবাদে এই ধরনের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ইরান থেকে প্রয়োজনীয় বিপুল অর্থ, অস্ত্র ও লজিস্টিক সহায়তা পেয়ে যেত।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা কানবারের মতে, আল-সাদি কাসেম সোলেইমানিকে নিজের পিতার মতো শ্রদ্ধা করত। আল-সাদির নিজের বাবা, যিনি নিজেও ইরানের একজন নামকরা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ছিলেন, ২০০৬ সালে এক আকস্মিক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর সে সোলেইমানিকে নিজের জীবনের অভিভাবক হিসেবে বেছে নেয়। আল-সাদির জীবনের বড় একটা অংশ বাগদাদে তার ইরাকি মায়ের কাছে কাটলেও পরে সে বিশেষ সামরিক ও গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ নিতে তেহরানে পাড়ি জমায়। পরবর্তীতে আল-সাদি ধর্মীয় ভ্রমণের একটি ট্রাভেল এজেন্সি বা ভ্রমণ সংস্থা খোলে, যার আড়ালে মূলত বিশ্বের নানা দেশে একটি নিজস্ব গুপ্তচর নেটওয়ার্ক গড়ার কাজ চালাত সে। গত সপ্তাহে তুরস্কে গ্রেপ্তার হওয়ার সময় আল-সাদির কাছ থেকে ইরাকের একটি বিশেষ সরকারি বা সার্ভিস পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। এই বিশেষ পাসপোর্ট মূলত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী এবং আমলাদের দেওয়া হয়, যা ইরাকের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সম্মতি ছাড়া পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই ভিআইপি পাসপোর্টের সুবিধা ব্যবহার করে সে বিশ্বজুড়ে খুব সহজেই ভ্রমণ করতে পারত, ইরাকি বিমানবন্দরে সাধারণ তল্লাশি এড়াতে পারত এবং ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের সুযোগ পেত। এই পাসপোর্টের ক্ষমতার কারণেই সে খুব সহজেই এমন সব দেশের ভিসা পেয়ে যেত যেখানে সে বড় ধরনের হামলার নিখুঁত ছক কষেছিল। ধরা পড়ার সময় আল-সাদি রাশিয়ার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল বলে জানা গেছে।
আইআরজিসি'র এই সন্দেহভাজন দুর্ধর্ষ সদস্য হিসেবে আল-সাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের প্রচার করতে একটু বেশিই ভালোবাসত। তার এক্স অ্যাকাউন্টে দেখা যায়, সে প্যারিসের আইফেল টাওয়ার এবং কুয়ালালামপুরের পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে ছবি তুলেছে। এছাড়া, তার স্ন্যাপচ্যাট অ্যাকাউন্টে এমন কিছু গোপন ছবি ও সামরিক নথি পাওয়া গেছে যেখানে সে স্বয়ং কাসেম সোলেইমানির সাথে কোনো একটি গোপন সামরিক ঘাঁটিতে বসে যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র এবং অন্যান্য সরঞ্জাম নিয়ে গভীর আলোচনা করছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, সোলেইমানি নিহত হওয়ার সাত মাস পর, ২০২০ সালের আগস্টে আল-সাদি এক্স-এ একটি ছবি পোস্ট করে যার ক্যাপশনে সে লিখেছিল, আমেরিকান শত্রুরা পুরোপুরি পরাজিত না হওয়া পর্যন্ত আমি ডিজিটাল দুনিয়া ছেড়ে যাচ্ছি এবং আমার সব ফোন বন্ধ করে দিচ্ছি, জয় অথবা শাহাদাত। তবে ২০২৫ সালে সে তার এক্স অ্যাকাউন্টে আরেকটি শেষ পোস্ট দিয়ে সোলেইমানি এবং মার্কিন হামলায় নিহত অন্য ইরানি সামরিক নেতাকে শহীদ বলে আখ্যায়িত করে। আল-সাদি তার লক্ষ্যবস্তুদের স্ন্যাপচ্যাট মেসেজের মাধ্যমে সাইলেন্সার লাগানো পিস্তলের ছবি পাঠিয়ে প্রতিনিয়ত হুমকি দিত। লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সাথেও তার সরাসরি সংযোগের প্রমাণ মিলেছে। বর্তমানে সে ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারের একটি সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও অন্ধকার সেলে বন্দি রয়েছে, যেখানে আমেরিকার হাই-প্রোফাইল কয়েদিদের কড়া পাহারায় রাখা হয়।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক পোস্ট

আপনার মতামত লিখুন