বিদেশে উচ্চ বেতনের আকর্ষণীয় চাকরি, উন্নত জীবনযাপন আর স্থায়ীভাবে বসবাসের সোনালী স্বপ্নের আড়ালে প্রতিনিয়ত দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত তরুণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের ভিসাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের এক ভয়ঙ্কর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই আন্তর্জাতিক চক্রগুলোর সাতটি প্রধান রুটের তথ্য উঠে এসেছে। সিআইডির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইদানীং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া ও লাওস মানব পাচারের নতুন এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চক্রগুলো প্রথমে অত্যন্ত চতুরতার সাথে পর্যটন ভিসায় ভুক্তভোগীদের থাইল্যান্ডে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে সড়কপথে কম্বোডিয়া বা লাওসে পাচার করে। সেখানে কম্পিউটার অপারেটর বা কাস্টমার সার্ভিসের লোভনীয় কাজের কথা বলা হলেও, বাস্তবে তরুণদের আটকে রাখা হচ্ছে সুরক্ষিত সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে। সেখানে বন্দুকের মুখে তাদের দিয়ে জোরপূর্বক আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা, অবৈধ জুয়া এবং আর্থিক জালিয়াতির মতো অপরাধমূলক কাজ করানো হচ্ছে। কোনো তরুণ যদি সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করে, তবে তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, আকাশপথে সংঘবদ্ধভাবে মানব পাচারের জন্য বর্তমানে আন্তর্জাতিক সাতটি গন্তব্য সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে ইতালি, সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং কম্বোডিয়া ও লাওস। দেশের ভেতরে থাকা কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি এবং স্থানীয় দালালদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত। এই চক্রগুলো প্রথমে সাধারণ মানুষকে বড় অঙ্কের বেতনের টোপ দিয়ে ফাঁদে ফেলে এবং পরে তাদের পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতিয়ে নেয়। সরাসরি পাঠালে গন্তব্য দেশের ইমিগ্রেশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারিতে পড়ার ভয় থাকে, তাই পাচারকারীরা বৈধ ভিসার আড়ালে প্রথমে তৃতীয় কোনো নিরাপদ দেশে ট্রানজিট করায় এবং সেখান থেকে অত্যন্ত গোপনে চূড়ান্ত গন্তব্যে নিয়ে যায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডামুখী রুটে এখন সম্পূর্ণ নতুন কৌশল দেখা যাচ্ছে। আমেরিকাগামীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে ব্রাজিল নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক উপায়ে পায়ে হেঁটে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত পার করানোর চেষ্টা চলে। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশের অন-অ্যারাইভাল সুবিধা এবং দুর্বল ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা এই অঞ্চলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে কানাডায় পাঠানোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রথমে নেপালসহ অন্য দেশে নেওয়া হয় এবং সুযোগ বুঝে সেখান থেকে কানাডায় পাড়ি জমানোর ব্যবস্থা করা হয়। উচ্চ আয়ের আশায় এই ফাঁদে পা দিয়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আজ বিদেশে গিয়ে অবৈধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে আরও জানা গেছে, ইউরোপের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ইতালির রুটটি বর্তমানে সবচেয়ে দীর্ঘ ও জটিল। এই রুটে ভুক্তভোগীদের প্রথমে নেপাল, ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে লিবিয়া, তিউনিসিয়া কিংবা মিসরে নিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে নামানোর চেষ্টা করা হয়। এই দীর্ঘ সমুদ্র ও মরুভূমি যাত্রায় তীব্র অনাহার, নৌকাডুবি এবং মুক্তিপণের জন্য নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিবছর অসংখ্য বাংলাদেশী যুবক প্রাণ হারাচ্ছেন। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার রুটে প্রথমে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে অত্যন্ত ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ মাছ ধরার ট্রলারে করে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যেখানে খাবার ও নিরাপত্তার অভাবে বহু মানুষ সাগরেই নিখোঁজ হয়ে যান। অন্যদিকে রাশিয়ার রুটে সম্প্রতি এক নতুন ও উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব হয়ে রাশিয়ায় নেওয়ার পর অনেক তরুণকে নানা কৌশলে যুদ্ধক্ষেত্রে পর্যন্ত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আকাশপথের পাশাপাশি অনিরাপদ সমুদ্রপথে মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। জলপথে মূলত দুটি বড় রুট ব্যবহার করা হচ্ছে—প্রথমটি মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং দ্বিতীয়টি মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া। সপ্তাহজুড়ে মাঝসাগরে আটকে রেখে ভুক্তভোগীদের পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ফলে অনেকেই জীবিত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। স্বজনদের হারিয়ে দেশের বহু পরিবার আজ শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে।
সিআইডির মানব পাচার ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে মানব পাচারের মামলা ও অপরাধী গ্রেফতারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। গত কয়েক বছরে এই বিশেষায়িত ইউনিটটি মোট ৩৪৪ জন আন্তর্জাতিক পাচারকারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে যেখানে মামলার সংখ্যা ছিল ৮৬টি এবং ২০২৪ সালে ১০০টি, সেখানে ২০২৫ সালে এসে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা সর্বোচ্চ ১২২টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীদের এই অপ্রীতিরোধ্য হয়ে ওঠার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের ধীরগতি অনেকাংশেই দায়ী। বিদ্যমান মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে সংঘবদ্ধ পাচারের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন সাত বছরের জেলসহ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এমনকি আইনে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার কঠোর নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সময়মতো তথ্যপ্রমাণ ও আন্তর্জাতিক সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে না পারায় বছরের পর বছর মামলাগুলো ঝুলে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের সাথে বিপুল অর্থের বিনিময়ে আপসরফা করে ফেলে, যার ফলে আজ পর্যন্ত বড় কোনো ট্রাভেল বা রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের সাজা হওয়ার নজির দেখা যায়নি। শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় এই অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল মাত্র সরকারি সংস্থাগুলোর একে অপরের ওপর দায় চাপানোর সংস্কৃতির কারণে এই অপরাধ দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সমন্বয়ের অভাব ও গাফিলতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। মানব পাচারকারীরা সব সময় সমাজের অসচেতন ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, মানব পাচার এখন একটি বড় ধরনের আন্তঃদেশীয় ও প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধে পরিণত হয়েছে। একক কোনো দেশের পক্ষে এটি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্ত। পাচারকারীরা এখন অত্যন্ত দক্ষভাবে ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির অফার ছড়াচ্ছে। তাই এই চক্রকে ভাঙতে হলে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারিভাবে প্রযুক্তিগত নজরদারি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। যেকোনো অস্বাভাবিক ট্রাভেল রুট বা সন্দেহজনক অফার দেখলেই দ্রুত প্রশাসনকে অবহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তদন্তকারীরা।

রোববার, ২৪ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬
বিদেশে উচ্চ বেতনের আকর্ষণীয় চাকরি, উন্নত জীবনযাপন আর স্থায়ীভাবে বসবাসের সোনালী স্বপ্নের আড়ালে প্রতিনিয়ত দেশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে শত শত তরুণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা, পর্যটন ও কর্মসংস্থানের ভিসাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে মানব পাচারের এক ভয়ঙ্কর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই আন্তর্জাতিক চক্রগুলোর সাতটি প্রধান রুটের তথ্য উঠে এসেছে। সিআইডির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইদানীং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া ও লাওস মানব পাচারের নতুন এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। চক্রগুলো প্রথমে অত্যন্ত চতুরতার সাথে পর্যটন ভিসায় ভুক্তভোগীদের থাইল্যান্ডে নিয়ে যায় এবং সেখান থেকে সড়কপথে কম্বোডিয়া বা লাওসে পাচার করে। সেখানে কম্পিউটার অপারেটর বা কাস্টমার সার্ভিসের লোভনীয় কাজের কথা বলা হলেও, বাস্তবে তরুণদের আটকে রাখা হচ্ছে সুরক্ষিত সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে। সেখানে বন্দুকের মুখে তাদের দিয়ে জোরপূর্বক আন্তর্জাতিক অনলাইন প্রতারণা, অবৈধ জুয়া এবং আর্থিক জালিয়াতির মতো অপরাধমূলক কাজ করানো হচ্ছে। কোনো তরুণ যদি সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করে, তবে তার ওপর নেমে আসে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, আকাশপথে সংঘবদ্ধভাবে মানব পাচারের জন্য বর্তমানে আন্তর্জাতিক সাতটি গন্তব্য সবচেয়ে বেশি সক্রিয় রয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে ইতালি, সার্বিয়া, মেসিডোনিয়া, রাশিয়া, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং কম্বোডিয়া ও লাওস। দেশের ভেতরে থাকা কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি এবং স্থানীয় দালালদের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই পুরো প্রক্রিয়ার সাথে সরাসরি জড়িত। এই চক্রগুলো প্রথমে সাধারণ মানুষকে বড় অঙ্কের বেতনের টোপ দিয়ে ফাঁদে ফেলে এবং পরে তাদের পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র হাতিয়ে নেয়। সরাসরি পাঠালে গন্তব্য দেশের ইমিগ্রেশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারিতে পড়ার ভয় থাকে, তাই পাচারকারীরা বৈধ ভিসার আড়ালে প্রথমে তৃতীয় কোনো নিরাপদ দেশে ট্রানজিট করায় এবং সেখান থেকে অত্যন্ত গোপনে চূড়ান্ত গন্তব্যে নিয়ে যায়। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডামুখী রুটে এখন সম্পূর্ণ নতুন কৌশল দেখা যাচ্ছে। আমেরিকাগামীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে ব্রাজিল নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে মেক্সিকো হয়ে অত্যন্ত বিপজ্জনক উপায়ে পায়ে হেঁটে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত পার করানোর চেষ্টা চলে। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশের অন-অ্যারাইভাল সুবিধা এবং দুর্বল ইমিগ্রেশন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে পাচারকারীরা এই অঞ্চলকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে কানাডায় পাঠানোর ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষার ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রথমে নেপালসহ অন্য দেশে নেওয়া হয় এবং সুযোগ বুঝে সেখান থেকে কানাডায় পাড়ি জমানোর ব্যবস্থা করা হয়। উচ্চ আয়ের আশায় এই ফাঁদে পা দিয়ে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আজ বিদেশে গিয়ে অবৈধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে আরও জানা গেছে, ইউরোপের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ইতালির রুটটি বর্তমানে সবচেয়ে দীর্ঘ ও জটিল। এই রুটে ভুক্তভোগীদের প্রথমে নেপাল, ভারত কিংবা শ্রীলঙ্কা হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে লিবিয়া, তিউনিসিয়া কিংবা মিসরে নিয়ে দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয় এবং পরবর্তীতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে নামানোর চেষ্টা করা হয়। এই দীর্ঘ সমুদ্র ও মরুভূমি যাত্রায় তীব্র অনাহার, নৌকাডুবি এবং মুক্তিপণের জন্য নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিবছর অসংখ্য বাংলাদেশী যুবক প্রাণ হারাচ্ছেন। একইভাবে অস্ট্রেলিয়ার রুটে প্রথমে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে অত্যন্ত ছোট ও ঝুঁকিপূর্ণ মাছ ধরার ট্রলারে করে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যেখানে খাবার ও নিরাপত্তার অভাবে বহু মানুষ সাগরেই নিখোঁজ হয়ে যান। অন্যদিকে রাশিয়ার রুটে সম্প্রতি এক নতুন ও উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরব হয়ে রাশিয়ায় নেওয়ার পর অনেক তরুণকে নানা কৌশলে যুদ্ধক্ষেত্রে পর্যন্ত পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মহলেও চরম উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। আকাশপথের পাশাপাশি অনিরাপদ সমুদ্রপথে মৃত্যুর মিছিল কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছে না। জলপথে মূলত দুটি বড় রুট ব্যবহার করা হচ্ছে—প্রথমটি মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া এবং দ্বিতীয়টি মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া। সপ্তাহজুড়ে মাঝসাগরে আটকে রেখে ভুক্তভোগীদের পণ্য হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ফলে অনেকেই জীবিত অবস্থায় গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন না। স্বজনদের হারিয়ে দেশের বহু পরিবার আজ শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে।
সিআইডির মানব পাচার ইউনিটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে মানব পাচারের মামলা ও অপরাধী গ্রেফতারের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। গত কয়েক বছরে এই বিশেষায়িত ইউনিটটি মোট ৩৪৪ জন আন্তর্জাতিক পাচারকারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে যেখানে মামলার সংখ্যা ছিল ৮৬টি এবং ২০২৪ সালে ১০০টি, সেখানে ২০২৫ সালে এসে তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা সর্বোচ্চ ১২২টিতে দাঁড়িয়েছে। তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীদের এই অপ্রীতিরোধ্য হয়ে ওঠার পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের ধীরগতি অনেকাংশেই দায়ী। বিদ্যমান মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে সংঘবদ্ধ পাচারের অপরাধে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন সাত বছরের জেলসহ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এমনকি আইনে ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে অভিযোগ গঠন এবং ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার কঠোর নির্দেশনাও রয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে সময়মতো তথ্যপ্রমাণ ও আন্তর্জাতিক সাক্ষ্য সংগ্রহ করতে না পারায় বছরের পর বছর মামলাগুলো ঝুলে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের সাথে বিপুল অর্থের বিনিময়ে আপসরফা করে ফেলে, যার ফলে আজ পর্যন্ত বড় কোনো ট্রাভেল বা রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের সাজা হওয়ার নজির দেখা যায়নি। শাস্তির মুখোমুখি না হওয়ায় এই অপরাধীরা জামিনে বেরিয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল মাত্র সরকারি সংস্থাগুলোর একে অপরের ওপর দায় চাপানোর সংস্কৃতির কারণে এই অপরাধ দমন করা সম্ভব হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সমন্বয়ের অভাব ও গাফিলতির সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যাচ্ছে। মানব পাচারকারীরা সব সময় সমাজের অসচেতন ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে টার্গেট করে এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, মানব পাচার এখন একটি বড় ধরনের আন্তঃদেশীয় ও প্রযুক্তিভিত্তিক অপরাধে পরিণত হয়েছে। একক কোনো দেশের পক্ষে এটি পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন দেশের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদন্ত। পাচারকারীরা এখন অত্যন্ত দক্ষভাবে ডিজিটাল মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে ভুয়া চাকরির অফার ছড়াচ্ছে। তাই এই চক্রকে ভাঙতে হলে সাধারণ মানুষের মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারিভাবে প্রযুক্তিগত নজরদারি আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করতে হবে। যেকোনো অস্বাভাবিক ট্রাভেল রুট বা সন্দেহজনক অফার দেখলেই দ্রুত প্রশাসনকে অবহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তদন্তকারীরা।

আপনার মতামত লিখুন