দিকপাল

বিপদে ধৈর্য ও আন্তরিক সহযোগিতা সব প্রতিকূলতা জয় করতে পারে, আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই জীবনের আসল সৌন্দর্য।

লিলি পু দ্য গ্রেট


আলী আসকর
আলী আসকর গল্পকার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬ | ০১:১৯ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

লিলি পু দ্য গ্রেট

আজ দুপুরটা যেন বিরাট আকাশের মতো মনে হলো ইতুমনির কাছে। সূর্যটা এইমাত্র হেল হেল গেছে পশ্চিম দিকে। ঝলমলে আকাশ। কোথাও বিন্দুমাত্র মেঘ নেই। মনে মনে এমনই একটি দিনের আশায় ছিল ইতুমনি। ও বাইরে এসে চোখ তোলে তাকায়। এখনো আসেনি ইরতিকা। ইরতিকার আজ কী হয়েছে? এত দেরি! অথচ সব কাজই তো বাকি। তিন কামরার একটা ঘর বানানো, একটা সুন্দর রাস্তা বানানো, রাস্তার দু-পাশে ফুলের গাছ লাগানো, কত্তকিছু তাকে করতে হবে। এসব করতে তার কত্তকিছুই তো লাগবে। অথচ ইরতিকার এখনো দেখা নেই। জরুরি কাজে কি কেউ এত দেরি করে!

ওই যে আসছে ইরতিকা। ওই যে...ওই যে...। বুকটা আকাশে ওঠে ইতুমনির। খুশিতে তার পা দুটো মাটি থেকে আলাদা হয়ে যায়। তার মনে হয় সে এখন রঙিন প্রজাপতি হয়ে গেছে। ঝলমলে রূপ নগরের প্রজাপতি।

ইরতিকা একেবারেই কাছে চলে আসে। এসে ইতুমনির মুখোমুখি হয়।

বলে, সরি। একদম সরি। একশত বার সরি।

ইতুমি হাসতে হাসতে বলে, এত বার সরি বলছো কেন? ছোটদের এত বার সরি বলতে নেই। চলো যাই।

ইতুমনির হাতে একটি বিরাট ড্রয়িং বই। এই বইয়ে শহীদ মিনারের ছবি, লাল সবুজের পতাকার ছবি, মাছের ছবি, ফুলের ছবি, নদীর ছবি, গাছগাছালির ছবি, আরও কত্তকিছু ছবিতে ঠাসা!

ওরা দুজনই দ্রুতপায়ে পৌঁছে গেল একটি খোলামেলা বাগানবাড়িতে। বাগানবাড়ির পাশেই দৈনের বিল। সারাসময় হুহু বাতাস ওড়ে এই বিলে। সকাল হলেই কেউ কেউ জাল নিয়ে মাছ ধরে। সাদা বক ওৎ পেতে থাকে বড় মাছটির আশায়। বসন্তবউরি ডানা মেলে এপাশে ওপাশে উড়ে বেড়ায়। কোনো কোনো জায়গায় সাদা শাপলা ফুটে একাকার হয়ে আছে। আবার কোনো কোনো জায়গায় লাল শাপলা। অপরূপ সৌন্দর্যের কারণেও হয়তো শাপলা হয়ে গেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল।

ইতুমি বালির খোঁজে লেগে গেল। বড় বড় তিনটে কচুপাতাও পেয়ে গেল সে। পাশের একটি বাড়ির কাজ হচ্ছে। বিরাট বালির স্তূপ পড়ে আছে ওখানে। লিলি পুদের নতুন বাড়ি হচ্ছে এখানে। লিলি পুরা বড় পয়সাওয়ালা মানুষ। এতবড় পয়সাওয়ালা মানুষ এই তল্লাটে আর একটিও নেই।

ওরা দুজনে দ্রুত জায়গাটা পরিষ্কার করল। ইতুমনি ড্রয়িংখাতাটা মাটিতে মেলে রাখল। ড্রয়িংখাতায় আঁকা বাড়িটা অসম্ভব সুন্দর। এরকম একটি বাড়িই তৈরি করবে ইতুমনিরা।

বালি দিয়ে বাড়ি বানানোর কাজ শুরু করল ইতুমনি। এটা-ওটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করতে থাকল ইরতিকা। কয়েক মিনিটেই দেয়ালের কাজটা শেষ করে ফেলল ওরা। দেয়ালের ভেতরে তিনটে কামরা বসাতে হবে। আর্টের ক্ষুদে মাস্টার ইতুমনি জানে কামরা করার কায়দা কানুন।

পা টিপে টিপে নিঃশব্দে এসে লিলি পু ওদের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। চোখ কপালে তুলে লিলি পু ওদের কর্মযজ্ঞ দেখতে থাকল। ওরা কাজে এতই মনোযোগী ছিল যে লিলি পু-র উপস্থিতি একটুও টের পেল না।

তোমরা বসে বসে কী করছো?

লিলি পু-র এ কথায় আশপাশের নীরবতা মুহূর্তে খান খান হয়ে গেল। ওরা দুজনে লিলি পু-র মুখের দিকে হা করে তাকাল। লিলি পু হাসছে। লিলি পু হাসলে গোটা প্রকৃতিই একসাথে হেসে ওঠে।

কী করছো তোমরা? লিলি পু আবারও জিজ্ঞেস করল।

দেখছো না কী করছি? ঘর বানাচ্ছি। বাড়ি বানাচ্ছি।

এসব কেন বানাচ্ছো? তোমাদের তো বড় বড় ঘর-বাড়ি আছে।

আমাদের জন্য বানাচ্ছি তোমাকে কে বলল? কাল আমাদের পুতুল সোনার বিয়ে। ওদের জন্য ঘর লাগবে না? বাড়ি লাগবে না?

হা হা করে হাসতে থাকল লিলি পু। এমন হাসির কোনো মানেই বুঝল না ওরা। লিলি পু হাসি থামিয়ে বলল, তাহলে কখন হচ্ছে এ বিয়ে?

কাল সকালে। তোমার দাওয়াত। উপহার নিয়ে আসবে তো?

আনবো। কিন্তু কী আনবো?

মিষ্টি আনলেও হবে। বরপক্ষ সাত-আট জন আসবে। সবাই যেন দুইটা করে পায়। মনে থাকবে তো?

হ্যাঁ হ্যাঁ, সোনামণিরা, মনে থাকবে, একশত বার মনে থাকবে, হাজার বার মনে থাকবে।

রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গেলেও কিছুতেই দু-চোখে ঘুম নামে না ইতুমনির। ঘুম নাকি অপেক্ষার পালা কমিয়ে দেয়। ঘুমের আয়ু নাকি অনেক কম। কেন যে ওর চোখে আজ ঘুম নামে না!

বাইরে বিজলির আলো দেখে চমকে ওঠে ইতুমনি। জানালার ফাঁক দিয়ে দূরের গুঁড়ুম গুঁড়ুম শব্দ বারবার তার কানে আসে। তার বুকের ভিতরটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে ওঠে। সত্যিই কি কোথাও বাজ পড়ে? মুষলধারে বৃষ্টি নামে? আকাশে ঝড় ওঠে?

যদি এদিকেও ঝড় আসে? বৃষ্টি নামে? সামনে আর ভাবতে পারে না ইতুমনি। ওর শূন্য বুকে হাহাকার নামে। কষ্ট বাড়তে থাকে।

প্রচণ্ড ঝড়ে ইতুমনিদের জানালা থেকে কড়াৎ কড়াৎ সজোরে শব্দ হয়। ফট ফট ফটাস করে কোথায় একটা গাছ ভেঙে পড়ে। মুহূর্তে বিজলিবাতি জ্বালিয়ে আশপাশে বাজ পড়ে। বৃষ্টির ছাট এসে ওদের দরজাটা বারবার নাড়িয়ে দেয়। ইতুমনি বুকে কম্বল জড়িয়ে রাখে। ইতুমনির মনটা বাগানবাড়িতে পড়ে থাকে।

সকালবেলায় কে যেন দরজায় কড়া নাড়ে। বিছানায় বসে চোখ কচলড়ায় ইরতিকা। ঘুমের ঘোর এখনো মাথায় কাজ করে। দরজা খোলে ওর চোখ কপালে ওঠে। ইরতিকা এতিমের মতো বিষণ্ণ চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে। বিষয় তা বুঝতে দেরি হয় না ইতুমনির।

ঘরে এসো। ইতুমনি বলে।

চলো বাগানবাড়ি থেকে ঘুরে আসি।

বাগানবাড়িতে গিয়ে লাভ নেই বন্ধু। রাতের তাণ্ডবে সব শেষ হয়ে গেছে। ওখানে গেলে আরও কষ্ট বাড়বে। বরং চা খেয়ে যাও। আম্মু এক্ষুনি উঠে পড়বে।

তাহলে আমি একাই যাই। ইরতিকা অভিমান করে বলে।

ইতুমি আর কথা বাড়ায় না। ওরা দুজনই বাগানবাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।

বাগানবাড়িতে পা দিয়েই ওদের দুজনের চক্ষু চড়কগাছ। তাদের কাছে সবকিছু স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়। আশপাশের গাছগাছালি ভেঙেচুরে এলোমেলো হয়ে গেলেও তাদের বানানো বাড়িটা বরাবরের মতোই আগের মতো আছে। কোথাও একটুও কিছু হয়নি। রাতের ঝড়ের মতোই ওদের বুকে আনন্দের ঝড় বইতে থাকে।

একটু দূরে লিলি পু-কে আসতে দেখা যায়। ওর পেছনে নাদুসনুদুস সোহেল কাকা। সোহেল কাকা লিলি পুদের বাড়িটা দেখভাল করে। লিলি পু কাছে এসে রহস্যের হাসি হাসতে থাকে।

ইতুমি অবাক চোখে বলল, তুমি হাসছো কেন লিলি পু?

লিলি পু ইতুমনির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো?

হ্যাঁ লিলি পু, সবই ঠিক আছে। একদম সবকিছু। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব লিলি পু?

ঝড়-বৃষ্টির আলামত পাওয়ার সাথে সাথে আমি সোহেল কাকার কাছে ছুটে যাই। সবকিছু ওনাকে খুলে বলি। তিনি একমিনিটও দেরি না করে বিরাট ত্রিপল দিয়ে তোমাদের বাড়িটা ঢেকে দেন। চারপাশে শক্ত খুঁটি গেড়ে দেন। তারপর তো সবকিছু দেখতেই পাচ্ছো।

সোহেল কাকার ওপর ওদের কৃতজ্ঞতার জোয়ার বয়ে গেল। এ মুহূর্তে ওদের কাছে মিষ্টি থাকলে সোহেল কাকাকে চার-চারটে মিষ্টি খাইয়ে দিত।

ইরতিকা বলল, তুমি গ্রেট লিলি পু। তোমার জন্য দোয়া করি যেন কোনোদিনও তোমার বিয়েটা না হয়।

এটা দোয়া না বদদোয়া?

বদদোয়া হবে কেন লিলি পু? তুমি কত্ত ভালো। তোমাকে ছাড়া তো আমাদের জীবনই চলবে না। তুমি আছো বলেই তো আমরা আছি। ঠিক বলছি না ইতুমনি?

একদম ঠিক বলেছো। তুমি তো সবসময় ঠিক বলো।

ইরতিকা বলল, তুমিও ঠিক বলেছো।

ওদের কথা শুনে সোহেল কাকা ও লিলি পু হা হা করে হাসতে থাকল।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬


লিলি পু দ্য গ্রেট

প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

আজ দুপুরটা যেন বিরাট আকাশের মতো মনে হলো ইতুমনির কাছে। সূর্যটা এইমাত্র হেল হেল গেছে পশ্চিম দিকে। ঝলমলে আকাশ। কোথাও বিন্দুমাত্র মেঘ নেই। মনে মনে এমনই একটি দিনের আশায় ছিল ইতুমনি। ও বাইরে এসে চোখ তোলে তাকায়। এখনো আসেনি ইরতিকা। ইরতিকার আজ কী হয়েছে? এত দেরি! অথচ সব কাজই তো বাকি। তিন কামরার একটা ঘর বানানো, একটা সুন্দর রাস্তা বানানো, রাস্তার দু-পাশে ফুলের গাছ লাগানো, কত্তকিছু তাকে করতে হবে। এসব করতে তার কত্তকিছুই তো লাগবে। অথচ ইরতিকার এখনো দেখা নেই। জরুরি কাজে কি কেউ এত দেরি করে!

ওই যে আসছে ইরতিকা। ওই যে...ওই যে...। বুকটা আকাশে ওঠে ইতুমনির। খুশিতে তার পা দুটো মাটি থেকে আলাদা হয়ে যায়। তার মনে হয় সে এখন রঙিন প্রজাপতি হয়ে গেছে। ঝলমলে রূপ নগরের প্রজাপতি।

ইরতিকা একেবারেই কাছে চলে আসে। এসে ইতুমনির মুখোমুখি হয়।

বলে, সরি। একদম সরি। একশত বার সরি।

ইতুমি হাসতে হাসতে বলে, এত বার সরি বলছো কেন? ছোটদের এত বার সরি বলতে নেই। চলো যাই।

ইতুমনির হাতে একটি বিরাট ড্রয়িং বই। এই বইয়ে শহীদ মিনারের ছবি, লাল সবুজের পতাকার ছবি, মাছের ছবি, ফুলের ছবি, নদীর ছবি, গাছগাছালির ছবি, আরও কত্তকিছু ছবিতে ঠাসা!

ওরা দুজনই দ্রুতপায়ে পৌঁছে গেল একটি খোলামেলা বাগানবাড়িতে। বাগানবাড়ির পাশেই দৈনের বিল। সারাসময় হুহু বাতাস ওড়ে এই বিলে। সকাল হলেই কেউ কেউ জাল নিয়ে মাছ ধরে। সাদা বক ওৎ পেতে থাকে বড় মাছটির আশায়। বসন্তবউরি ডানা মেলে এপাশে ওপাশে উড়ে বেড়ায়। কোনো কোনো জায়গায় সাদা শাপলা ফুটে একাকার হয়ে আছে। আবার কোনো কোনো জায়গায় লাল শাপলা। অপরূপ সৌন্দর্যের কারণেও হয়তো শাপলা হয়ে গেছে বাংলাদেশের জাতীয় ফুল।

ইতুমি বালির খোঁজে লেগে গেল। বড় বড় তিনটে কচুপাতাও পেয়ে গেল সে। পাশের একটি বাড়ির কাজ হচ্ছে। বিরাট বালির স্তূপ পড়ে আছে ওখানে। লিলি পুদের নতুন বাড়ি হচ্ছে এখানে। লিলি পুরা বড় পয়সাওয়ালা মানুষ। এতবড় পয়সাওয়ালা মানুষ এই তল্লাটে আর একটিও নেই।

ওরা দুজনে দ্রুত জায়গাটা পরিষ্কার করল। ইতুমনি ড্রয়িংখাতাটা মাটিতে মেলে রাখল। ড্রয়িংখাতায় আঁকা বাড়িটা অসম্ভব সুন্দর। এরকম একটি বাড়িই তৈরি করবে ইতুমনিরা।

বালি দিয়ে বাড়ি বানানোর কাজ শুরু করল ইতুমনি। এটা-ওটা এগিয়ে দিয়ে সাহায্য করতে থাকল ইরতিকা। কয়েক মিনিটেই দেয়ালের কাজটা শেষ করে ফেলল ওরা। দেয়ালের ভেতরে তিনটে কামরা বসাতে হবে। আর্টের ক্ষুদে মাস্টার ইতুমনি জানে কামরা করার কায়দা কানুন।

পা টিপে টিপে নিঃশব্দে এসে লিলি পু ওদের পেছনে এসে দাঁড়িয়ে গেল। চোখ কপালে তুলে লিলি পু ওদের কর্মযজ্ঞ দেখতে থাকল। ওরা কাজে এতই মনোযোগী ছিল যে লিলি পু-র উপস্থিতি একটুও টের পেল না।

তোমরা বসে বসে কী করছো?

লিলি পু-র এ কথায় আশপাশের নীরবতা মুহূর্তে খান খান হয়ে গেল। ওরা দুজনে লিলি পু-র মুখের দিকে হা করে তাকাল। লিলি পু হাসছে। লিলি পু হাসলে গোটা প্রকৃতিই একসাথে হেসে ওঠে।

কী করছো তোমরা? লিলি পু আবারও জিজ্ঞেস করল।

দেখছো না কী করছি? ঘর বানাচ্ছি। বাড়ি বানাচ্ছি।

এসব কেন বানাচ্ছো? তোমাদের তো বড় বড় ঘর-বাড়ি আছে।

আমাদের জন্য বানাচ্ছি তোমাকে কে বলল? কাল আমাদের পুতুল সোনার বিয়ে। ওদের জন্য ঘর লাগবে না? বাড়ি লাগবে না?

হা হা করে হাসতে থাকল লিলি পু। এমন হাসির কোনো মানেই বুঝল না ওরা। লিলি পু হাসি থামিয়ে বলল, তাহলে কখন হচ্ছে এ বিয়ে?

কাল সকালে। তোমার দাওয়াত। উপহার নিয়ে আসবে তো?

আনবো। কিন্তু কী আনবো?

মিষ্টি আনলেও হবে। বরপক্ষ সাত-আট জন আসবে। সবাই যেন দুইটা করে পায়। মনে থাকবে তো?

হ্যাঁ হ্যাঁ, সোনামণিরা, মনে থাকবে, একশত বার মনে থাকবে, হাজার বার মনে থাকবে।

রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমাতে গেলেও কিছুতেই দু-চোখে ঘুম নামে না ইতুমনির। ঘুম নাকি অপেক্ষার পালা কমিয়ে দেয়। ঘুমের আয়ু নাকি অনেক কম। কেন যে ওর চোখে আজ ঘুম নামে না!

বাইরে বিজলির আলো দেখে চমকে ওঠে ইতুমনি। জানালার ফাঁক দিয়ে দূরের গুঁড়ুম গুঁড়ুম শব্দ বারবার তার কানে আসে। তার বুকের ভিতরটা অজানা আশঙ্কায় ধক করে ওঠে। সত্যিই কি কোথাও বাজ পড়ে? মুষলধারে বৃষ্টি নামে? আকাশে ঝড় ওঠে?

যদি এদিকেও ঝড় আসে? বৃষ্টি নামে? সামনে আর ভাবতে পারে না ইতুমনি। ওর শূন্য বুকে হাহাকার নামে। কষ্ট বাড়তে থাকে।

প্রচণ্ড ঝড়ে ইতুমনিদের জানালা থেকে কড়াৎ কড়াৎ সজোরে শব্দ হয়। ফট ফট ফটাস করে কোথায় একটা গাছ ভেঙে পড়ে। মুহূর্তে বিজলিবাতি জ্বালিয়ে আশপাশে বাজ পড়ে। বৃষ্টির ছাট এসে ওদের দরজাটা বারবার নাড়িয়ে দেয়। ইতুমনি বুকে কম্বল জড়িয়ে রাখে। ইতুমনির মনটা বাগানবাড়িতে পড়ে থাকে।

সকালবেলায় কে যেন দরজায় কড়া নাড়ে। বিছানায় বসে চোখ কচলড়ায় ইরতিকা। ঘুমের ঘোর এখনো মাথায় কাজ করে। দরজা খোলে ওর চোখ কপালে ওঠে। ইরতিকা এতিমের মতো বিষণ্ণ চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে। বিষয় তা বুঝতে দেরি হয় না ইতুমনির।

ঘরে এসো। ইতুমনি বলে।

চলো বাগানবাড়ি থেকে ঘুরে আসি।

বাগানবাড়িতে গিয়ে লাভ নেই বন্ধু। রাতের তাণ্ডবে সব শেষ হয়ে গেছে। ওখানে গেলে আরও কষ্ট বাড়বে। বরং চা খেয়ে যাও। আম্মু এক্ষুনি উঠে পড়বে।

তাহলে আমি একাই যাই। ইরতিকা অভিমান করে বলে।

ইতুমি আর কথা বাড়ায় না। ওরা দুজনই বাগানবাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে।

বাগানবাড়িতে পা দিয়েই ওদের দুজনের চক্ষু চড়কগাছ। তাদের কাছে সবকিছু স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয়। আশপাশের গাছগাছালি ভেঙেচুরে এলোমেলো হয়ে গেলেও তাদের বানানো বাড়িটা বরাবরের মতোই আগের মতো আছে। কোথাও একটুও কিছু হয়নি। রাতের ঝড়ের মতোই ওদের বুকে আনন্দের ঝড় বইতে থাকে।

একটু দূরে লিলি পু-কে আসতে দেখা যায়। ওর পেছনে নাদুসনুদুস সোহেল কাকা। সোহেল কাকা লিলি পুদের বাড়িটা দেখভাল করে। লিলি পু কাছে এসে রহস্যের হাসি হাসতে থাকে।

ইতুমি অবাক চোখে বলল, তুমি হাসছো কেন লিলি পু?

লিলি পু ইতুমনির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বলল, সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো?

হ্যাঁ লিলি পু, সবই ঠিক আছে। একদম সবকিছু। কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব লিলি পু?

ঝড়-বৃষ্টির আলামত পাওয়ার সাথে সাথে আমি সোহেল কাকার কাছে ছুটে যাই। সবকিছু ওনাকে খুলে বলি। তিনি একমিনিটও দেরি না করে বিরাট ত্রিপল দিয়ে তোমাদের বাড়িটা ঢেকে দেন। চারপাশে শক্ত খুঁটি গেড়ে দেন। তারপর তো সবকিছু দেখতেই পাচ্ছো।

সোহেল কাকার ওপর ওদের কৃতজ্ঞতার জোয়ার বয়ে গেল। এ মুহূর্তে ওদের কাছে মিষ্টি থাকলে সোহেল কাকাকে চার-চারটে মিষ্টি খাইয়ে দিত।

ইরতিকা বলল, তুমি গ্রেট লিলি পু। তোমার জন্য দোয়া করি যেন কোনোদিনও তোমার বিয়েটা না হয়।

এটা দোয়া না বদদোয়া?

বদদোয়া হবে কেন লিলি পু? তুমি কত্ত ভালো। তোমাকে ছাড়া তো আমাদের জীবনই চলবে না। তুমি আছো বলেই তো আমরা আছি। ঠিক বলছি না ইতুমনি?

একদম ঠিক বলেছো। তুমি তো সবসময় ঠিক বলো।

ইরতিকা বলল, তুমিও ঠিক বলেছো।

ওদের কথা শুনে সোহেল কাকা ও লিলি পু হা হা করে হাসতে থাকল।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল