রাতের নির্জন মোড়টায় যখন একটা ঝিঁঝিঁ পোকাও ডাকছিল না, তখন একলা জ্বলে থাকা সোডিয়ামের হলুদ আলোটা যেন বিরক্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল ফুটপাতের ওপর।
চারকোণা বাল্বের কাচের আবরণটা একটু থরথর করে কেঁপে উঠল। নিচে পড়ে থাকা কংক্রিটের ইটগুলোর ফাঁকে জমে ছিল ভেজা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। ল্যাম্পপোস্টের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া সামান্য উত্তাপে ইটগুলো একটার ওপর আরেকটা গা ঘেঁষে শুয়ে ছিল।
"এখনও একটা কুকুরের ছায়াও পড়ে না এখানটায়," ধাতব গমগমে শব্দে বলে উঠল ল্যাম্পপোস্ট।
ইটগুলো একটু নড়েচড়ে বসল। তাদের গা ঘেঁষে থাকা বালি আর গুঁড়ো সিমেন্ট ফিসফিস করে উঠল, "যা বলেছ, ল্যাম্পপোস্ট ভাই! আঁধারটা কেমন জ্যান্ত হয়ে চেপে বসেছে, দেখেছ? ওই পেছনটায় কিছু একটা কালো মতো ভারী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে..."
ল্যাম্পপোস্ট কোনো জবাব দিল না। তার ভেতরের সস্তা তারে বিদ্যুতের একটা খসখসে শব্দ হলো। সে এক ঝটকায় তার পুরো আলোর তীব্রতা টেনে নিল ফুটপাতের দিকে। পেছনের সুবিশাল কালো অবয়বটা, যার অজস্র পাতার আড়ালে নিঃশব্দে জমা ছিল কতগুলো পুরোনো প্রহর, মুহূর্তেই ঘোর আঁধারে ঢেকে গেল। সেদিকে সামান্য একটা আলোর ফোঁটাও পৌঁছাল না।
বটগাছের একটা শুকনো, কড়া পাতা আলতো করে খসে পড়ল শান্ত ইটগুলোর ওপর। বাতাসে পুরোনো মাটির গন্ধ ছাড়া আর কোনো শোরগোল ছিল না।
কয়েকটা সকাল গড়িয়ে যাওয়ার পর মোড়টায় কিছু অচেনা মানুষের পা পড়ল। জংধরা কুড়াল আর করাতের ধারালো ফলা রোদে ঝিকমিক করছিল।
লোহার রডের বাড়ি আর করাতের টানে একটা মোটা ডাল মড়মড় করে কেঁপে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। ডালের ডগায় থাকা পাখির পুরোনো, শূন্য বাসাটা আছড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল শুকনো কাঠ আর কাঁচা কষের এক অদ্ভুত কটু গন্ধ।
ল্যাম্পপোস্টের চকচকে ধাতব গা ঘেঁষে কাটিং মেশিনের শব্দটা বেশ মিহি শোনাল। সে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল নিচের দিকে, যেখানে তার আলোর পথ খুলে দিতে বটগাছের কাটা ডালপালাগুলো স্তূপ হয়ে উঠছিল।
বিকেলের দিকে একঝাঁক চড়াই এসে আকাশে চক্কর কাটল। যে ডালটায় গতকালও তাদের নামার জায়গা ছিল, সেখানটায় এখন কেবল খোলা নীল আকাশ। পাখিগুলো কিছুক্ষণ শূন্যতায় ডানা ঝাপটে দূরের কোনো টিনের চালের দিকে উড়ে গেল।
পৌরসভার লোকগুলো বিদায় নেওয়ার আগে ল্যাম্পপোস্টের জংধরা গোড়ায় এক পোচ চকচকে রুপালি রং মাখিয়ে দিয়ে গেল। কিন্তু ড্রেনের নোংরা জলের ঠিক ওপরে থাকা তার ধাতব ভিত্তির নিচের অংশটা বছরের পর বছর আর্দ্রতায় ক্ষয়ে যাচ্ছিল। রঙের প্রলেপ সেই ক্ষয় ঢেকে দিলেও ভেতরের জং থামাতে পারল না।
ঝড়টা যখন এল, তখন কোনো সতর্কবার্তা ছিল না।
হঠাৎ এক ঝটকায় ফিউজ কেটে গেল। আর সেই মুহূর্তে সোডিয়ামের উদ্ধত হলুদ রাজত্বটা নিমিষেই মিলিয়ে গেল। পুরো মোড়টাকে চেপে ধরল এক নিঃশব্দ, হিমশীতল অন্ধকার।
ঝড় যখন তাণ্ডব শুরু করল, ল্যাম্পপোস্টের লম্বা ধাতব দেহটা বাতাসের প্রতিটি ধাক্কায় কাঁপতে লাগল। গোড়ার দিকের জংধরা, ক্ষয়ে যাওয়া ধাতু আর চাপ নিতে পারল না। এক কর্কশ, চেরা ধাতব শব্দে গোড়াটা ভেঙে গেল। ল্যাম্পপোস্টের দেহ আছড়ে পড়ল রাস্তার ভেজা কাদায়। মাথার কাচের আবরণ চুরমার হয়ে ছড়িয়ে গেল চারদিকে।
বটগাছটার ওপর দিয়েও তছনছ হয়ে গেল বাতাস। ঝড়ে তার দুটো ভারী ডাল ভেঙে নিচে হেলে পড়ল। একটি ডালের ভাঙা অংশ এসে আটকে গেল পড়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের ওপর। বটগাছের বুক ফেটে বেরিয়ে এল ভেজা কাঠের আঠালো রস। কিন্তু মাটির বুক চিরে গভীর থেকে গভীরে ছড়িয়ে থাকা শিকড়গুলো তাকে শক্ত করে আঁকড়ে রাখল। কাণ্ডটা দোলা খেল ঠিকই, কিন্তু হেলে পড়ল না।
ভোরবেলা বৃষ্টি থামতে শুরু করলে চারপাশজুড়ে নেমে এল গভীর নিস্তব্ধতা।
ইটগুলোর গা থেকে রুপালি রঙের প্রলেপ ধুয়ে গেছে। কাদার মধ্যে মুচড়ে পড়ে থাকা ভাঙা লোহার খুঁটিটার দিকে তারা চুপচাপ চেয়ে রইল।
ল্যাম্পপোস্টের নিথর দেহটার ওপর আর কোনো দামি আলো ছিল না। বটগাছের ভাঙা ডালটির ভেজা পাতাগুলো ছড়িয়ে ছিল তার ফেটে যাওয়া কাচের আবরণের ঠিক ওপরে। একটি জলের ফোঁটা টুপ করে ঝরে পড়ল ঠান্ডা লোহার গায়ে।
চারপাশে আর কোনো সংলাপ ছিল না, কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। কেবল ভেজা মাটির এক আদিম গন্ধে ভরে রইল চারপাশ।

সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ অক্টোবর ২০২৬
রাতের নির্জন মোড়টায় যখন একটা ঝিঁঝিঁ পোকাও ডাকছিল না, তখন একলা জ্বলে থাকা সোডিয়ামের হলুদ আলোটা যেন বিরক্তি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ল ফুটপাতের ওপর।
চারকোণা বাল্বের কাচের আবরণটা একটু থরথর করে কেঁপে উঠল। নিচে পড়ে থাকা কংক্রিটের ইটগুলোর ফাঁকে জমে ছিল ভেজা স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। ল্যাম্পপোস্টের শরীর থেকে ছড়িয়ে পড়া সামান্য উত্তাপে ইটগুলো একটার ওপর আরেকটা গা ঘেঁষে শুয়ে ছিল।
"এখনও একটা কুকুরের ছায়াও পড়ে না এখানটায়," ধাতব গমগমে শব্দে বলে উঠল ল্যাম্পপোস্ট।
ইটগুলো একটু নড়েচড়ে বসল। তাদের গা ঘেঁষে থাকা বালি আর গুঁড়ো সিমেন্ট ফিসফিস করে উঠল, "যা বলেছ, ল্যাম্পপোস্ট ভাই! আঁধারটা কেমন জ্যান্ত হয়ে চেপে বসেছে, দেখেছ? ওই পেছনটায় কিছু একটা কালো মতো ভারী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে..."
ল্যাম্পপোস্ট কোনো জবাব দিল না। তার ভেতরের সস্তা তারে বিদ্যুতের একটা খসখসে শব্দ হলো। সে এক ঝটকায় তার পুরো আলোর তীব্রতা টেনে নিল ফুটপাতের দিকে। পেছনের সুবিশাল কালো অবয়বটা, যার অজস্র পাতার আড়ালে নিঃশব্দে জমা ছিল কতগুলো পুরোনো প্রহর, মুহূর্তেই ঘোর আঁধারে ঢেকে গেল। সেদিকে সামান্য একটা আলোর ফোঁটাও পৌঁছাল না।
বটগাছের একটা শুকনো, কড়া পাতা আলতো করে খসে পড়ল শান্ত ইটগুলোর ওপর। বাতাসে পুরোনো মাটির গন্ধ ছাড়া আর কোনো শোরগোল ছিল না।
কয়েকটা সকাল গড়িয়ে যাওয়ার পর মোড়টায় কিছু অচেনা মানুষের পা পড়ল। জংধরা কুড়াল আর করাতের ধারালো ফলা রোদে ঝিকমিক করছিল।
লোহার রডের বাড়ি আর করাতের টানে একটা মোটা ডাল মড়মড় করে কেঁপে ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। ডালের ডগায় থাকা পাখির পুরোনো, শূন্য বাসাটা আছড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল শুকনো কাঠ আর কাঁচা কষের এক অদ্ভুত কটু গন্ধ।
ল্যাম্পপোস্টের চকচকে ধাতব গা ঘেঁষে কাটিং মেশিনের শব্দটা বেশ মিহি শোনাল। সে নিস্পৃহ ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল নিচের দিকে, যেখানে তার আলোর পথ খুলে দিতে বটগাছের কাটা ডালপালাগুলো স্তূপ হয়ে উঠছিল।
বিকেলের দিকে একঝাঁক চড়াই এসে আকাশে চক্কর কাটল। যে ডালটায় গতকালও তাদের নামার জায়গা ছিল, সেখানটায় এখন কেবল খোলা নীল আকাশ। পাখিগুলো কিছুক্ষণ শূন্যতায় ডানা ঝাপটে দূরের কোনো টিনের চালের দিকে উড়ে গেল।
পৌরসভার লোকগুলো বিদায় নেওয়ার আগে ল্যাম্পপোস্টের জংধরা গোড়ায় এক পোচ চকচকে রুপালি রং মাখিয়ে দিয়ে গেল। কিন্তু ড্রেনের নোংরা জলের ঠিক ওপরে থাকা তার ধাতব ভিত্তির নিচের অংশটা বছরের পর বছর আর্দ্রতায় ক্ষয়ে যাচ্ছিল। রঙের প্রলেপ সেই ক্ষয় ঢেকে দিলেও ভেতরের জং থামাতে পারল না।
ঝড়টা যখন এল, তখন কোনো সতর্কবার্তা ছিল না।
হঠাৎ এক ঝটকায় ফিউজ কেটে গেল। আর সেই মুহূর্তে সোডিয়ামের উদ্ধত হলুদ রাজত্বটা নিমিষেই মিলিয়ে গেল। পুরো মোড়টাকে চেপে ধরল এক নিঃশব্দ, হিমশীতল অন্ধকার।
ঝড় যখন তাণ্ডব শুরু করল, ল্যাম্পপোস্টের লম্বা ধাতব দেহটা বাতাসের প্রতিটি ধাক্কায় কাঁপতে লাগল। গোড়ার দিকের জংধরা, ক্ষয়ে যাওয়া ধাতু আর চাপ নিতে পারল না। এক কর্কশ, চেরা ধাতব শব্দে গোড়াটা ভেঙে গেল। ল্যাম্পপোস্টের দেহ আছড়ে পড়ল রাস্তার ভেজা কাদায়। মাথার কাচের আবরণ চুরমার হয়ে ছড়িয়ে গেল চারদিকে।
বটগাছটার ওপর দিয়েও তছনছ হয়ে গেল বাতাস। ঝড়ে তার দুটো ভারী ডাল ভেঙে নিচে হেলে পড়ল। একটি ডালের ভাঙা অংশ এসে আটকে গেল পড়ে থাকা ল্যাম্পপোস্টের ওপর। বটগাছের বুক ফেটে বেরিয়ে এল ভেজা কাঠের আঠালো রস। কিন্তু মাটির বুক চিরে গভীর থেকে গভীরে ছড়িয়ে থাকা শিকড়গুলো তাকে শক্ত করে আঁকড়ে রাখল। কাণ্ডটা দোলা খেল ঠিকই, কিন্তু হেলে পড়ল না।
ভোরবেলা বৃষ্টি থামতে শুরু করলে চারপাশজুড়ে নেমে এল গভীর নিস্তব্ধতা।
ইটগুলোর গা থেকে রুপালি রঙের প্রলেপ ধুয়ে গেছে। কাদার মধ্যে মুচড়ে পড়ে থাকা ভাঙা লোহার খুঁটিটার দিকে তারা চুপচাপ চেয়ে রইল।
ল্যাম্পপোস্টের নিথর দেহটার ওপর আর কোনো দামি আলো ছিল না। বটগাছের ভাঙা ডালটির ভেজা পাতাগুলো ছড়িয়ে ছিল তার ফেটে যাওয়া কাচের আবরণের ঠিক ওপরে। একটি জলের ফোঁটা টুপ করে ঝরে পড়ল ঠান্ডা লোহার গায়ে।
চারপাশে আর কোনো সংলাপ ছিল না, কোনো ব্যাখ্যা ছিল না। কেবল ভেজা মাটির এক আদিম গন্ধে ভরে রইল চারপাশ।

আপনার মতামত লিখুন