১৯৫০-এর দশকে যখন ঢাকার মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন এটি ছিল কেবল একটি নতুন নগরের স্বপ্নপূরণের কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং সদ্য জন্ম নেওয়া এক ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। শাপলা চত্বর থেকে দিলকুশা, দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততা, রিকশার টুংটাং শব্দ এবং হাজার হাজার চাকুরিজীবীর পদচারণায় মুখরিত মতিঝিল ছিল পুরো দেশের অর্থনীতির স্পন্দন। তবে কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই চিরচেনা রূপ ও কোলাহল হারিয়ে মতিঝিলে এখন নেমে এসেছে এক গভীর শূন্যতা ও নীরবতা।
পাকিস্তান সরকারের আমলে ভারত থেকে আসা গৃহহীন মোহাজের ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে অধিগ্রহণ করা এই জমিতে গড়ে উঠেছিল তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তানের বাণিজ্যিক ভিত্তি। ইস্পাহানি, বাওয়ানি গ্রুপ, আমিন ব্রাদার্স ও ওমর সন্স-এর মতো প্রতাপশালী অবাঙালি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সিরাজউদ্দিন, ফকির চাঁদ বা লাবিউদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকীর মতো প্রথিতযশা বাঙালি উদ্যোক্তারা তৈরি করেছিলেন ‘আমিন কোর্ট’ ও ‘আদমজী কোর্ট’-এর মতো বহুতল ভবন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে এসব স্থাপনাই হয়ে ওঠে জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
বাণিজ্যিক কার্যক্রম কেবল বিশ তলা ভবনের চকচকে চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যাংকিং লেনদেন, শেয়ারবাজারের উত্থান-পতন এবং বীমা কার্যক্রমের পাশাপাশি তা ছড়িয়ে পড়েছিল ফকিরাপুল, আরামবাগ, টিকাটুলী ও দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল একটি সফল ও প্রাণবন্ত ফুটপাতকেন্দ্রিক অর্থনীতি। ‘ঘরোয়া হোটেল’-এর বিখ্যাত খিচুড়ির লাইনে পিয়ন থেকে শুরু করে শীর্ষ ব্যাংক নির্বাহী—সবাই পদের পার্থক্য ভুলে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মোড়ের চায়ের টং, ফটোকপির দোকান কিংবা হকারদের বেচাকেনা মিলে মতিঝিল ছিল এক অনন্য জীবন্ত ক্যানভাস।
তবে ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির চরম বিকাশ এবং শহরের উত্তরমুখী বিস্তারের সাথে সাথে মতিঝিল তার ধারণক্ষমতা হারাতে শুরু করে। অতিরিক্ত যানজট, আধুনিক পার্কিং সুবিধার অভাব, পুরানো অবকাঠামো এবং বঙ্গভবনের কেপিআইভুক্ত সুরক্ষার কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে তাদের কার্যালয় সরাতে বাধ্য হয়। ব্যবসার নতুন ঠিকানা হিসেবে প্রথমে ধানমণ্ডি, এরপর গুলশান, বনানী এবং সম্প্রতি তেজগাঁওয়ের শিল্প এলাকা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে দীর্ঘ ৫৭ বছরের স্মৃতি বহনকারী ঐতিহ্যবাহী ‘মধুমিতা’ সিনেমা হল ২০২৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মতিঝিলের সায়াহ্নকালীন বিনোদনের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যায়।
বর্তমানে বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশ উত্তরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হলেও মতিঝিল একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়েনি। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'বাংলাদেশ ব্যাংক'-এর প্রধান কার্যালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর (সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী) সদর দফতর, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং রাজউকের মতো সংস্থাসমূহ এখনো ঐতিহ্য রক্ষা করে টিকে রয়েছে। মূলত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন এই ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মূল স্তম্ভ।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, শহর কখনো তার বাণিজ্যিক গুরুত্ব একেবারে হারায় না; সময়ের প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তন করে মাত্র। ইসলামপুর, নবাবপুর ও পল্টনের ধারাবাহিকতায় মতিঝিল যেভাবে অর্থনীতির মুকুট পরেছিল, ঠিক সেভাবেই আজ ঢাকার নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠছে তেজগাঁও ও গুলশানের কাচঘেরা স্কাইস্ক্রেপারগুলো। ঐতিহাসিক আমিন কোর্ট বা আদমজী কোর্ট হয়তো আজ আর আধুনিক ঢাকার আধুনিকতম প্রতীক নয়, তবে সেগুলো বাংলাদেশ বিনির্মাণের মায়াবী স্মারক হয়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৯৫০-এর দশকে যখন ঢাকার মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, তখন এটি ছিল কেবল একটি নতুন নগরের স্বপ্নপূরণের কেন্দ্রবিন্দু নয়, বরং সদ্য জন্ম নেওয়া এক ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। শাপলা চত্বর থেকে দিলকুশা, দৈনন্দিন কাজের ব্যস্ততা, রিকশার টুংটাং শব্দ এবং হাজার হাজার চাকুরিজীবীর পদচারণায় মুখরিত মতিঝিল ছিল পুরো দেশের অর্থনীতির স্পন্দন। তবে কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই চিরচেনা রূপ ও কোলাহল হারিয়ে মতিঝিলে এখন নেমে এসেছে এক গভীর শূন্যতা ও নীরবতা।
পাকিস্তান সরকারের আমলে ভারত থেকে আসা গৃহহীন মোহাজের ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে অধিগ্রহণ করা এই জমিতে গড়ে উঠেছিল তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তানের বাণিজ্যিক ভিত্তি। ইস্পাহানি, বাওয়ানি গ্রুপ, আমিন ব্রাদার্স ও ওমর সন্স-এর মতো প্রতাপশালী অবাঙালি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি সিরাজউদ্দিন, ফকির চাঁদ বা লাবিউদ্দিন আহমেদ সিদ্দিকীর মতো প্রথিতযশা বাঙালি উদ্যোক্তারা তৈরি করেছিলেন ‘আমিন কোর্ট’ ও ‘আদমজী কোর্ট’-এর মতো বহুতল ভবন। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে এসব স্থাপনাই হয়ে ওঠে জাতীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি।
বাণিজ্যিক কার্যক্রম কেবল বিশ তলা ভবনের চকচকে চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যাংকিং লেনদেন, শেয়ারবাজারের উত্থান-পতন এবং বীমা কার্যক্রমের পাশাপাশি তা ছড়িয়ে পড়েছিল ফকিরাপুল, আরামবাগ, টিকাটুলী ও দৈনিক বাংলা মোড় পর্যন্ত। এই বিশাল কর্মীবাহিনীর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল একটি সফল ও প্রাণবন্ত ফুটপাতকেন্দ্রিক অর্থনীতি। ‘ঘরোয়া হোটেল’-এর বিখ্যাত খিচুড়ির লাইনে পিয়ন থেকে শুরু করে শীর্ষ ব্যাংক নির্বাহী—সবাই পদের পার্থক্য ভুলে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মোড়ের চায়ের টং, ফটোকপির দোকান কিংবা হকারদের বেচাকেনা মিলে মতিঝিল ছিল এক অনন্য জীবন্ত ক্যানভাস।
তবে ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতির চরম বিকাশ এবং শহরের উত্তরমুখী বিস্তারের সাথে সাথে মতিঝিল তার ধারণক্ষমতা হারাতে শুরু করে। অতিরিক্ত যানজট, আধুনিক পার্কিং সুবিধার অভাব, পুরানো অবকাঠামো এবং বঙ্গভবনের কেপিআইভুক্ত সুরক্ষার কঠোর আইনি প্রক্রিয়ার কারণে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে তাদের কার্যালয় সরাতে বাধ্য হয়। ব্যবসার নতুন ঠিকানা হিসেবে প্রথমে ধানমণ্ডি, এরপর গুলশান, বনানী এবং সম্প্রতি তেজগাঁওয়ের শিল্প এলাকা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে দীর্ঘ ৫৭ বছরের স্মৃতি বহনকারী ঐতিহ্যবাহী ‘মধুমিতা’ সিনেমা হল ২০২৫ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মতিঝিলের সায়াহ্নকালীন বিনোদনের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যায়।
বর্তমানে বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশ উত্তরাঞ্চলে স্থানান্তরিত হলেও মতিঝিল একেবারে জনশূন্য হয়ে পড়েনি। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক 'বাংলাদেশ ব্যাংক'-এর প্রধান কার্যালয়, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর (সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী) সদর দফতর, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এবং রাজউকের মতো সংস্থাসমূহ এখনো ঐতিহ্য রক্ষা করে টিকে রয়েছে। মূলত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন এই ঐতিহাসিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মূল স্তম্ভ।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, শহর কখনো তার বাণিজ্যিক গুরুত্ব একেবারে হারায় না; সময়ের প্রয়োজনে স্থান পরিবর্তন করে মাত্র। ইসলামপুর, নবাবপুর ও পল্টনের ধারাবাহিকতায় মতিঝিল যেভাবে অর্থনীতির মুকুট পরেছিল, ঠিক সেভাবেই আজ ঢাকার নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠছে তেজগাঁও ও গুলশানের কাচঘেরা স্কাইস্ক্রেপারগুলো। ঐতিহাসিক আমিন কোর্ট বা আদমজী কোর্ট হয়তো আজ আর আধুনিক ঢাকার আধুনিকতম প্রতীক নয়, তবে সেগুলো বাংলাদেশ বিনির্মাণের মায়াবী স্মারক হয়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে।

আপনার মতামত লিখুন