রড বাঁধার খটখট শব্দ আর ক্রেনের গর্জন ছাপিয়ে বাতাসজুড়ে বালুর হালকা আস্তর। রাস্তায় বাসের একটানা হর্ন, অটোরিকশার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, হকারের হাঁকডাক আর মাইকের সুড়সুড়ি গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া মোড় আজও চেনা ছন্দেই ছুটছে। কিন্তু এই চিরচেনা ব্যস্ততার ভিড়ে চোখ মেলালে আর খুঁজে পাওয়া যায় না টিনের ছাপড়াঘেরা সেই ঐতিহ্যবাহী সাইনবোর্ডটি ‘বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স’।
২০২৩ সালের সেই অভিশপ্ত ৪ এপ্রিলের আগুনে প্রায় ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া বিশাল জায়গাটায় এখন চলছে ১০৬ কাঠার নতুন নির্মাণযজ্ঞ। গড়ে উঠছে ১০ তলাবিশিষ্ট আধুনিক ‘বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণীবিতান’। বাইরে বিশাল আধুনিকতার ছোঁয়া, অথচ আশপাশের ভবনে কিংবা ফুটপাতে রোদে পুড়ে কেনাবেচা করা পুরোনো ব্যবসায়ীদের চোখে-মুখে আজও কেবলই হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট।
স্মৃতির পাতা ওল্টালে আজও রোমাঞ্চিত হন এখানকার পুরোনো ব্যবসায়ীরা। একসময় দিনে অন্তত দেড়শ বিদেশি ক্রেতার আনাগোনা লেগে থাকত বঙ্গবাজারের গলিগুলোতে। নাইজেরিয়া, সুদান, ওমান, কাতার, নেপাল কিংবা ভুটানের ব্যবসায়ীরা সশরীরে এসে পাইকারি দরে জামাকাপড় কিনে নিয়ে যেতেন। পাশের ইন্টারকন্টিনেন্টাল বা সোনারগাঁও হোটেলে থাকা বিদেশি অতিথি, এমনকি নামীদামি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ক্রু বা অ্যাথলেটরাও দোভাষী সঙ্গে নিয়ে কেনাকাটা করতে আসতেন এই বঙ্গবাজারেই।
এই বাজারের মূল জাদুই ছিল তৈরি পোশাক খাতের ‘এক্সপোর্ট সারপ্লাস’। সামান্য সুতা বের হয়ে থাকা বা ডিজাইনের সামান্য অমিলের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের বাতিল করা বিশ্বমানের সব পোশাক নামমাত্র দামে বিক্রি হতো এখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত সবাই জানতেন, শার্ট-প্যান্টের সেরা কালেকশন সবচেয়ে কম দামে কেবল এখানেই মিলবে।
কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের তাণ্ডবে মুহূর্তে ছাই হয়ে যায় চার দশকের সেই গড়ে ওঠা সংসার। পুড়ে ছাই হয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছেড়েছেন, কেউ ভিটেমাটি বেচে দেনা মিটিয়েছেন, আবার অনেক বড় ব্যবসায়ী আজ অন্যের দোকানে সামান্য বেতনে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন। যাঁরা কোনোমতে টিকে আছেন, তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছেন আশপাশের এনেক্সকো, সিটি প্লাজা, নগর প্লাজায়, কেউবা চলে গেছেন মিরপুর, নিউমার্কেট কিংবা অনলাইনের জগতে।
বঙ্গবাজারের চেনা রূপ বদলে যাওয়ায় বিদেশি ও স্থানীয় তরুণ ক্রেতাদের একটা বড় অংশ এখন চলে গেছেন নিউমার্কেট সংলগ্ন নূরজাহান মার্কেটের দিকে। বঙ্গবাজারের পুরোনো অনেক দোভাষী ও ব্যবসায়ী নূরজাহান মার্কেটের সাড়ে পাঁচশরও বেশি দোকানে নতুন করে পসরা সাজিয়েছেন। বঙ্গবাজার থেকে আনা এক্সপোর্টের পোশাক আর স্থানীয়ভাবে তৈরি মানসম্মত পোশাকের পসরা দিয়ে নূরজাহান মার্কেট এখন জমজমাট।
এদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্মিত হতে যাওয়া নতুন ভবনে প্রায় তিন হাজার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলেও মনে একটা বড় দুশ্চিন্তা কাজ করছে সবার নতুন ভবনের ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ কতটা সামলে উঠতে পারবেন তাঁরা? ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আবার আগের মতো পসরা সাজানো যাবে তো?
তবুও দিনশেষে আশার আলো এটুকুই নির্মাণকাজ শেষ হলে নতুন সেই ১০ তলা ভবনেই হয়তো আবার ফিরবে পুরোনো সম্পর্কের মিষ্টি হাঁকডাক, দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের ভিড় আর হারানো বঙ্গবাজারের সেই চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য।

রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রড বাঁধার খটখট শব্দ আর ক্রেনের গর্জন ছাপিয়ে বাতাসজুড়ে বালুর হালকা আস্তর। রাস্তায় বাসের একটানা হর্ন, অটোরিকশার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, হকারের হাঁকডাক আর মাইকের সুড়সুড়ি গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া মোড় আজও চেনা ছন্দেই ছুটছে। কিন্তু এই চিরচেনা ব্যস্ততার ভিড়ে চোখ মেলালে আর খুঁজে পাওয়া যায় না টিনের ছাপড়াঘেরা সেই ঐতিহ্যবাহী সাইনবোর্ডটি ‘বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স’।
২০২৩ সালের সেই অভিশপ্ত ৪ এপ্রিলের আগুনে প্রায় ভস্মীভূত হয়ে যাওয়া বিশাল জায়গাটায় এখন চলছে ১০৬ কাঠার নতুন নির্মাণযজ্ঞ। গড়ে উঠছে ১০ তলাবিশিষ্ট আধুনিক ‘বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণীবিতান’। বাইরে বিশাল আধুনিকতার ছোঁয়া, অথচ আশপাশের ভবনে কিংবা ফুটপাতে রোদে পুড়ে কেনাবেচা করা পুরোনো ব্যবসায়ীদের চোখে-মুখে আজও কেবলই হারিয়ে যাওয়ার কষ্ট।
স্মৃতির পাতা ওল্টালে আজও রোমাঞ্চিত হন এখানকার পুরোনো ব্যবসায়ীরা। একসময় দিনে অন্তত দেড়শ বিদেশি ক্রেতার আনাগোনা লেগে থাকত বঙ্গবাজারের গলিগুলোতে। নাইজেরিয়া, সুদান, ওমান, কাতার, নেপাল কিংবা ভুটানের ব্যবসায়ীরা সশরীরে এসে পাইকারি দরে জামাকাপড় কিনে নিয়ে যেতেন। পাশের ইন্টারকন্টিনেন্টাল বা সোনারগাঁও হোটেলে থাকা বিদেশি অতিথি, এমনকি নামীদামি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ক্রু বা অ্যাথলেটরাও দোভাষী সঙ্গে নিয়ে কেনাকাটা করতে আসতেন এই বঙ্গবাজারেই।
এই বাজারের মূল জাদুই ছিল তৈরি পোশাক খাতের ‘এক্সপোর্ট সারপ্লাস’। সামান্য সুতা বের হয়ে থাকা বা ডিজাইনের সামান্য অমিলের কারণে বিদেশি ক্রেতাদের বাতিল করা বিশ্বমানের সব পোশাক নামমাত্র দামে বিক্রি হতো এখানে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত সবাই জানতেন, শার্ট-প্যান্টের সেরা কালেকশন সবচেয়ে কম দামে কেবল এখানেই মিলবে।
কিন্তু অগ্নিকাণ্ডের তাণ্ডবে মুহূর্তে ছাই হয়ে যায় চার দশকের সেই গড়ে ওঠা সংসার। পুড়ে ছাই হয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে ব্যবসা ছেড়েছেন, কেউ ভিটেমাটি বেচে দেনা মিটিয়েছেন, আবার অনেক বড় ব্যবসায়ী আজ অন্যের দোকানে সামান্য বেতনে কর্মচারী হিসেবে কাজ করছেন। যাঁরা কোনোমতে টিকে আছেন, তাঁরা ছড়িয়ে পড়েছেন আশপাশের এনেক্সকো, সিটি প্লাজা, নগর প্লাজায়, কেউবা চলে গেছেন মিরপুর, নিউমার্কেট কিংবা অনলাইনের জগতে।
বঙ্গবাজারের চেনা রূপ বদলে যাওয়ায় বিদেশি ও স্থানীয় তরুণ ক্রেতাদের একটা বড় অংশ এখন চলে গেছেন নিউমার্কেট সংলগ্ন নূরজাহান মার্কেটের দিকে। বঙ্গবাজারের পুরোনো অনেক দোভাষী ও ব্যবসায়ী নূরজাহান মার্কেটের সাড়ে পাঁচশরও বেশি দোকানে নতুন করে পসরা সাজিয়েছেন। বঙ্গবাজার থেকে আনা এক্সপোর্টের পোশাক আর স্থানীয়ভাবে তৈরি মানসম্মত পোশাকের পসরা দিয়ে নূরজাহান মার্কেট এখন জমজমাট।
এদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নির্মিত হতে যাওয়া নতুন ভবনে প্রায় তিন হাজার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীকে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হলেও মনে একটা বড় দুশ্চিন্তা কাজ করছে সবার নতুন ভবনের ভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ কতটা সামলে উঠতে পারবেন তাঁরা? ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আবার আগের মতো পসরা সাজানো যাবে তো?
তবুও দিনশেষে আশার আলো এটুকুই নির্মাণকাজ শেষ হলে নতুন সেই ১০ তলা ভবনেই হয়তো আবার ফিরবে পুরোনো সম্পর্কের মিষ্টি হাঁকডাক, দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের ভিড় আর হারানো বঙ্গবাজারের সেই চিরচেনা প্রাণচাঞ্চল্য।

আপনার মতামত লিখুন