তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধারণা মূলত ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চলা শীতল যুদ্ধের সময় ব্যাপকতা পায়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশে পরোক্ষ সংঘাত বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
কোরীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের মতো সংঘাতগুলো বড় পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার উদাহরণ হলেও এগুলোর কোনোটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়নি।
পারমাণবিক অস্ত্রের আবিষ্কার এই আশঙ্কাকে আরও গভীর করে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাব্য চিত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
ইতিহাসে ‘World War III’ বা ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ শব্দবন্ধটির প্রাথমিক ব্যবহার নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের উল্লেখ রয়েছে। ১৯৪১ সালের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত টাইম-এর একটি সংখ্যায় ‘World War III’ শব্দটি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। পরে ১৯৪৩ সালের ২২ মার্চের সংখ্যাতেও তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি এ. ওয়ালেস তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সম্ভাব্য নতুন সংঘাত নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক পরিকল্পনাও তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ব্রিটিশ সামরিক পরিকল্পনা ‘অপারেশন আনথিঙ্কেবল’।
১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সোভিয়েত রেড আর্মির শক্তি ও পূর্ব ইউরোপে তাদের অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তি ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। তবে ব্রিটিশ সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিকল্পনাটিকে বাস্তবায়নের দিক থেকে অসম্ভব বলে প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ড্রপশট’ নামে আরেকটি সম্ভাব্য যুদ্ধপরিকল্পনা তৈরি করে। এতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পারমাণবিক ও প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছিল। পরিকল্পনায় ১০০টি শহর ও স্থানের ২০০টি লক্ষ্যবস্তুতে ৩০০টি পারমাণবিক বোমা এবং ২৯ হাজার প্রচলিত বোমা ব্যবহারের কথা ছিল।
সম্ভাব্য সোভিয়েত আক্রমণ মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ন্যাটোও বিভিন্ন বড় সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। ১৯৫২ সালের ‘এক্সারসাইজ মেইনব্রেস’-এ প্রায় ২০০টি জাহাজ এবং ৫০ হাজারের বেশি সামরিক সদস্য অংশ নেয়। ডেনমার্ক ও নরওয়ের প্রতিরক্ষাকে কেন্দ্র করে এ মহড়া পরিচালিত হয়েছিল।
একই সময়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ‘গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ ও ‘লংস্টেপ’ নামে নৌ মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়। এসব মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল শত্রু বাহিনীর দখল থেকে এলাকা পুনরুদ্ধার এবং উভচর আক্রমণ মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই করা।
১৯৫৭ সালে ন্যাটো ‘এক্সারসাইজ স্ট্রাইকব্যাক’ নামে আরও বড় একটি নৌ মহড়া পরিচালনা করে। এতে প্রায় ২০০টি যুদ্ধজাহাজ, ৬৫০টি বিমান এবং ৭৫ হাজার সামরিক সদস্য অংশ নিয়েছিলেন।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধারণার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি যুক্ত, তা হলো পারমাণবিক অস্ত্র। পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধ হলে তা আগের বিশ্বযুদ্ধগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও সামরিক প্রতিরোধনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের ধারণা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর মূল ধারণা ছিল—পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়বে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাই ইতিহাসে সংঘটিত কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের নাম নয়। এটি মূলত এমন একটি সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংঘাতের ধারণা, যেখানে বড় পরাশক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং পারমাণবিক বা অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ আগস্ট ২০২৬
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধারণা মূলত ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চলা শীতল যুদ্ধের সময় ব্যাপকতা পায়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা, পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং বিভিন্ন দেশে পরোক্ষ সংঘাত বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছিল।
কোরীয় যুদ্ধ, ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের মতো সংঘাতগুলো বড় পরাশক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার উদাহরণ হলেও এগুলোর কোনোটি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়নি।
পারমাণবিক অস্ত্রের আবিষ্কার এই আশঙ্কাকে আরও গভীর করে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলার পর পারমাণবিক যুদ্ধের সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাব্য চিত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
ইতিহাসে ‘World War III’ বা ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ শব্দবন্ধটির প্রাথমিক ব্যবহার নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনের উল্লেখ রয়েছে। ১৯৪১ সালের ৩ নভেম্বর প্রকাশিত টাইম-এর একটি সংখ্যায় ‘World War III’ শব্দটি ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। পরে ১৯৪৩ সালের ২২ মার্চের সংখ্যাতেও তৎকালীন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট হেনরি এ. ওয়ালেস তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সম্ভাব্য নতুন সংঘাত নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক পরিকল্পনাও তৈরি হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ব্রিটিশ সামরিক পরিকল্পনা ‘অপারেশন আনথিঙ্কেবল’।
১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল সোভিয়েত রেড আর্মির শক্তি ও পূর্ব ইউরোপে তাদের অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তি ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর চাপ প্রয়োগের একটি পরিকল্পনা তৈরি করা হয়। তবে ব্রিটিশ সামরিক কর্তৃপক্ষ পরিকল্পনাটিকে বাস্তবায়নের দিক থেকে অসম্ভব বলে প্রত্যাখ্যান করে।
এরপর ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন ড্রপশট’ নামে আরেকটি সম্ভাব্য যুদ্ধপরিকল্পনা তৈরি করে। এতে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে পারমাণবিক ও প্রচলিত অস্ত্র ব্যবহারের একটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনা করা হয়েছিল। পরিকল্পনায় ১০০টি শহর ও স্থানের ২০০টি লক্ষ্যবস্তুতে ৩০০টি পারমাণবিক বোমা এবং ২৯ হাজার প্রচলিত বোমা ব্যবহারের কথা ছিল।
সম্ভাব্য সোভিয়েত আক্রমণ মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ন্যাটোও বিভিন্ন বড় সামরিক মহড়া পরিচালনা করে। ১৯৫২ সালের ‘এক্সারসাইজ মেইনব্রেস’-এ প্রায় ২০০টি জাহাজ এবং ৫০ হাজারের বেশি সামরিক সদস্য অংশ নেয়। ডেনমার্ক ও নরওয়ের প্রতিরক্ষাকে কেন্দ্র করে এ মহড়া পরিচালিত হয়েছিল।
একই সময়ে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ‘গ্র্যান্ড স্ল্যাম’ ও ‘লংস্টেপ’ নামে নৌ মহড়াও অনুষ্ঠিত হয়। এসব মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল শত্রু বাহিনীর দখল থেকে এলাকা পুনরুদ্ধার এবং উভচর আক্রমণ মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই করা।
১৯৫৭ সালে ন্যাটো ‘এক্সারসাইজ স্ট্রাইকব্যাক’ নামে আরও বড় একটি নৌ মহড়া পরিচালনা করে। এতে প্রায় ২০০টি যুদ্ধজাহাজ, ৬৫০টি বিমান এবং ৭৫ হাজার সামরিক সদস্য অংশ নিয়েছিলেন।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধারণার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি যুক্ত, তা হলো পারমাণবিক অস্ত্র। পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধ হলে তা আগের বিশ্বযুদ্ধগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ব্যাপক ও ধ্বংসাত্মক হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ও সামরিক প্রতিরোধনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
১৯৬২ সালের কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের ধারণা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর মূল ধারণা ছিল—পূর্ণমাত্রার পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হলে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই ভয়াবহ ধ্বংসের মুখে পড়বে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ তাই ইতিহাসে সংঘটিত কোনো নির্দিষ্ট যুদ্ধের নাম নয়। এটি মূলত এমন একটি সম্ভাব্য বৈশ্বিক সংঘাতের ধারণা, যেখানে বড় পরাশক্তিগুলো সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে এবং পারমাণবিক বা অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন