সিন্ধু নদের পানি চুক্তি (Indus Waters Treaty - IWT) নিয়ে চিরবৈরী দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ এবার চরম উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের ন্যায্য পানির অংশ দখলের চেষ্টা করা হলে ‘সেই হাত কেটে দেওয়া হবে’ বলে ভারতকে নজিরবিহীন ও তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুসাদিক মালিক। মূলত ২০২৫ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে এক সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত একতরফাভাবে এই ঐতিহাসিক পানি চুক্তি স্থগিত করার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে এই যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মুসাদিক মালিক অভিযোগ করেন, ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পাকিস্তানের জীবনরেখা খ্যাত সিন্ধু নদের পানির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “প্রতিবেশী একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এমন আচরণ করছেন যেন তিনি একটি পানির কল নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং বলছেন পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেবেন না। আমাদের দেশের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ হলো, অন্য একটি দেশ আমাদের পুরো জাতির খাদ্য নিরাপত্তা, ৫০ শতাংশ কর্মসংস্থান এবং জিডিপির ২৫ শতাংশকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে।”
মুসাদিক মালিক আরও প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকলেও উজানের দেশ ভাটির দেশের পানি বন্ধ করতে পারে না। সেখানে ১৯৬০ সালের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ভারত কীভাবে পানি বন্ধের হুমকি দেয়? তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা নিজেদের রক্ষা করতে জানি। শুধু ফাঁকা ঘোষণা নয়, পাকিস্তান অতীতেও প্রমাণ করেছে যে আমাদের পানির অংশে আঘাত হানলে তার কঠোর পরিণতি হবে।”
একই সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার ভারতের এই একতরফা পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত ১৯৬০ সালের এই চুক্তি কোনো একটি পক্ষ চাইলেই একক সিদ্ধান্ত বা অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বাতিল বা সংশোধন করতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন ও ফোরামে পাকিস্তানের এই আইনি অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বার্তা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একাধিকবার স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—পানি আমাদের জীবনরেখা, এবং এটি পাকিস্তানের জন্য একটি ‘লাল রেখা’ (Red Line)।”
পাকিস্তানের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি সম্পদ মন্ত্রী সি আর পাটিল এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ভারত সিন্ধু নদ ব্যবস্থার অববাহিকায় নিজের জন্য নির্ধারিত পানির অংশ শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং ভারতের প্রাপ্য এক ফোঁটা পানিও সীমানা পেরিয়ে পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হবে না।
নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পাকিস্তান তাদের ভূখণ্ডে সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদ ও ভারতবিরোধী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। গত বছর পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলায় ২৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহতের পর ভারতের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। ভারতের স্পষ্ট অবস্থান—পাকিস্তান যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের মাটি থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী অবকাঠামো সম্পূর্ণ নির্মূল করার সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই পানি চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিতই থাকবে।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'সিন্ধু পানি চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্বদিকের তিনটি নদী (রবি, বিয়াস ও শতদ্রু)-এর ওপর ভারতের একচ্ছত্র অধিকার এবং পশ্চিমদিকের তিনটি নদী (সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব)-এর পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার পাকিস্তানকে দেওয়া হয়। বিগত ছয় দশকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় বড় তিনটি যুদ্ধ এবং কারগিল সংঘাতের সময়েও এই চুক্তিটি কখনো ভাঙেনি বা স্থগিত হয়নি। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পানির সংকট এবং কাশ্মীরে ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলার জেরে এই চুক্তিটি এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই দেশের মধ্যে নতুন এক 'পানি যুদ্ধ' বা ওয়াটার ওয়ারের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬
সিন্ধু নদের পানি চুক্তি (Indus Waters Treaty - IWT) নিয়ে চিরবৈরী দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ এবার চরম উত্তেজনায় রূপ নিয়েছে। পাকিস্তানের ন্যায্য পানির অংশ দখলের চেষ্টা করা হলে ‘সেই হাত কেটে দেওয়া হবে’ বলে ভারতকে নজিরবিহীন ও তীব্র হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মুসাদিক মালিক। মূলত ২০২৫ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে এক সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারত একতরফাভাবে এই ঐতিহাসিক পানি চুক্তি স্থগিত করার পর থেকেই দুই দেশের মধ্যে এই যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
রাজধানী ইসলামাবাদে আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী মুসাদিক মালিক অভিযোগ করেন, ভারত আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পাকিস্তানের জীবনরেখা খ্যাত সিন্ধু নদের পানির ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “প্রতিবেশী একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী এমন আচরণ করছেন যেন তিনি একটি পানির কল নিয়ন্ত্রণ করছেন এবং বলছেন পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেবেন না। আমাদের দেশের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এর অর্থ হলো, অন্য একটি দেশ আমাদের পুরো জাতির খাদ্য নিরাপত্তা, ৫০ শতাংশ কর্মসংস্থান এবং জিডিপির ২৫ শতাংশকে জিম্মি করার চেষ্টা করছে।”
মুসাদিক মালিক আরও প্রশ্ন তোলেন, আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুযায়ী কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকলেও উজানের দেশ ভাটির দেশের পানি বন্ধ করতে পারে না। সেখানে ১৯৬০ সালের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও ভারত কীভাবে পানি বন্ধের হুমকি দেয়? তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা নিজেদের রক্ষা করতে জানি। শুধু ফাঁকা ঘোষণা নয়, পাকিস্তান অতীতেও প্রমাণ করেছে যে আমাদের পানির অংশে আঘাত হানলে তার কঠোর পরিণতি হবে।”
একই সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার ভারতের এই একতরফা পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত ১৯৬০ সালের এই চুক্তি কোনো একটি পক্ষ চাইলেই একক সিদ্ধান্ত বা অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে বাতিল বা সংশোধন করতে পারে না। আন্তর্জাতিক আইন ও ফোরামে পাকিস্তানের এই আইনি অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত। তিনি দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বার্তা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির একাধিকবার স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন—পানি আমাদের জীবনরেখা, এবং এটি পাকিস্তানের জন্য একটি ‘লাল রেখা’ (Red Line)।”
পাকিস্তানের এই তীব্র প্রতিক্রিয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের কেন্দ্রীয় পানি সম্পদ মন্ত্রী সি আর পাটিল এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে ভারত সিন্ধু নদ ব্যবস্থার অববাহিকায় নিজের জন্য নির্ধারিত পানির অংশ শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং ভারতের প্রাপ্য এক ফোঁটা পানিও সীমানা পেরিয়ে পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হবে না।
নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের অভিযোগ, পাকিস্তান তাদের ভূখণ্ডে সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদ ও ভারতবিরোধী উগ্রপন্থী গোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে আসছে। গত বছর পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলায় ২৫ জন বেসামরিক নাগরিক নিহতের পর ভারতের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। ভারতের স্পষ্ট অবস্থান—পাকিস্তান যতক্ষণ না পর্যন্ত তাদের মাটি থেকে পরিচালিত সন্ত্রাসী অবকাঠামো সম্পূর্ণ নির্মূল করার সুনির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য প্রমাণ দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই পানি চুক্তির কার্যকারিতা স্থগিতই থাকবে।
১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'সিন্ধু পানি চুক্তি' স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী পূর্বদিকের তিনটি নদী (রবি, বিয়াস ও শতদ্রু)-এর ওপর ভারতের একচ্ছত্র অধিকার এবং পশ্চিমদিকের তিনটি নদী (সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব)-এর পানি ব্যবহারের প্রধান অধিকার পাকিস্তানকে দেওয়া হয়। বিগত ছয় দশকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় বড় তিনটি যুদ্ধ এবং কারগিল সংঘাতের সময়েও এই চুক্তিটি কখনো ভাঙেনি বা স্থগিত হয়নি। কিন্তু ২০২৫-২৬ সালের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পানির সংকট এবং কাশ্মীরে ধারাবাহিক সন্ত্রাসী হামলার জেরে এই চুক্তিটি এখন খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রধারী দুই দেশের মধ্যে নতুন এক 'পানি যুদ্ধ' বা ওয়াটার ওয়ারের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন