দিকপাল

রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, অপরাধের ভিত্তিতেই গ্রেফতার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী


সুমাইয়া জাবির
সুমাইয়া জাবির ন্যাশনাল ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ | ০৪:৩৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, অপরাধের ভিত্তিতেই গ্রেফতার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সারাদেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়নে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট করে জানান, বর্তমান স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পুলিশ কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে গ্রেফতার করছে না, কেবল সুনির্দিষ্ট অপরাধের ভিত্তিতেই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একটি ঐতিহাসিক ও রেকর্ডসংখ্যক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, এবং নারী ও শিশু নির্যাতনসহ প্রচলিত অপরাধের হার পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও তিনি সংসদে উত্থাপন করেন।

তবে অপরাধের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আমাদের পরিসংখ্যান কিছুটা উর্ধ্বমুখী, আর তা হলো ধর্ষণ মামলার সংখ্যা। তবে এর পেছনে একটি সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার পরিবর্তন রয়েছে। অতীতে সামাজিক সম্মানহানির ভয় কিংবা রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের নানামুখী হস্তক্ষেপের কারণে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার থানায় গিয়ে মামলা করার সাহস পেত না। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের অধীনে দেশের প্রতিটি থানায় ভুক্তভোগীদের জন্য হয়রানিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ এখন নির্দ্বিধায় থানায় কিংবা অনলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারছেন, যার কারণে মামলা রেকর্ডের সংখ্যা বেড়েছে।”

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আসামি গ্রেফতার, দ্রুততম সময়ে নিখুঁত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল, আদালতে সাক্ষী উপস্থাপন এবং বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে প্রতিটি ধাপে পুলিশ বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

এরই সুফল হিসেবে তিনি দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর ‘রামিষা হত্যা’ মামলার উদাহরণ টেনে বলেন, মাত্র ১৫ থেকে ১৭ দিনের মধ্যে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে, যা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের একটি অনন্য রেকর্ড। এছাড়া, দীর্ঘ প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিষয়ে মন্ত্রী এক যুগান্তকারী তথ্য দেন। তিনি জানান, পূর্ববর্তী দীর্ঘ ১৫-১৭ বছরের সমস্ত অচলাবস্থার রেকর্ড ভেঙে বর্তমান পুলিশ বাহিনী আধুনিক ডিএনএ (DNA) রিপোর্টের অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে এবং বাকি আসামিদেরও দ্রুততম সময়ে আইনের মুখোমুখি করা হবে।

দেশের তরুণ সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে (ডিএনসি) সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে এখন থেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, আধুনিক এবং শক্তিশালী ডিপার্টমেন্ট হিসেবে গড়ে তোলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অধিদপ্তরের নিজস্ব কার্যক্রমের জন্য স্পেশালাইজড ‘ডগ স্কোয়াড’ গঠন, কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত অস্ত্র প্রশিক্ষণ, প্রতিটি কার্যালয়ে আধুনিক হাজতখানা স্থাপন, মাদক শনাক্তকরণে আধুনিক পরীক্ষাগার (ল্যাবরেটরি) এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ট্র্যাকিং সরঞ্জাম সংযোজনের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাদকের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং আধুনিক লজিস্টিকস সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

চব্বিশের ছাত্র-নাগরিক গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন ও সামগ্রিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বের হয়ে আসার একটি সুস্পষ্ট বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে তনু বা রামিষা হত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোর দ্রুত অগ্রগতি ও প্রযুক্তিগত তদন্তের নজির বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানে বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বড় প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


রাজনৈতিক পরিচয়ে নয়, অপরাধের ভিত্তিতেই গ্রেফতার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬

featured Image

সারাদেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়নে কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হবে না বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট করে জানান, বর্তমান স্বাধীন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পুলিশ কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় কাউকে গ্রেফতার করছে না, কেবল সুনির্দিষ্ট অপরাধের ভিত্তিতেই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন। সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, বর্তমান নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে একটি ঐতিহাসিক ও রেকর্ডসংখ্যক ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। খুন, ডাকাতি, দস্যুতা, এবং নারী ও শিশু নির্যাতনসহ প্রচলিত অপরাধের হার পূর্বের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যানও তিনি সংসদে উত্থাপন করেন।

তবে অপরাধের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “একটি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে আমাদের পরিসংখ্যান কিছুটা উর্ধ্বমুখী, আর তা হলো ধর্ষণ মামলার সংখ্যা। তবে এর পেছনে একটি সামাজিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতার পরিবর্তন রয়েছে। অতীতে সামাজিক সম্মানহানির ভয় কিংবা রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের নানামুখী হস্তক্ষেপের কারণে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার থানায় গিয়ে মামলা করার সাহস পেত না। কিন্তু বর্তমান প্রশাসনের অধীনে দেশের প্রতিটি থানায় ভুক্তভোগীদের জন্য হয়রানিমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ এখন নির্দ্বিধায় থানায় কিংবা অনলাইনের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারছেন, যার কারণে মামলা রেকর্ডের সংখ্যা বেড়েছে।”

ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক আসামি গ্রেফতার, দ্রুততম সময়ে নিখুঁত চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল, আদালতে সাক্ষী উপস্থাপন এবং বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে প্রতিটি ধাপে পুলিশ বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে।

এরই সুফল হিসেবে তিনি দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর ‘রামিষা হত্যা’ মামলার উদাহরণ টেনে বলেন, মাত্র ১৫ থেকে ১৭ দিনের মধ্যে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হয়েছে, যা বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের একটি অনন্য রেকর্ড। এছাড়া, দীর্ঘ প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার বিষয়ে মন্ত্রী এক যুগান্তকারী তথ্য দেন। তিনি জানান, পূর্ববর্তী দীর্ঘ ১৫-১৭ বছরের সমস্ত অচলাবস্থার রেকর্ড ভেঙে বর্তমান পুলিশ বাহিনী আধুনিক ডিএনএ (DNA) রিপোর্টের অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে এবং বাকি আসামিদেরও দ্রুততম সময়ে আইনের মুখোমুখি করা হবে।

দেশের তরুণ সমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে (ডিএনসি) সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর ঘোষণা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরকে এখন থেকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ, আধুনিক এবং শক্তিশালী ডিপার্টমেন্ট হিসেবে গড়ে তোলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এই আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অধিদপ্তরের নিজস্ব কার্যক্রমের জন্য স্পেশালাইজড ‘ডগ স্কোয়াড’ গঠন, কর্মকর্তাদের জন্য উন্নত অস্ত্র প্রশিক্ষণ, প্রতিটি কার্যালয়ে আধুনিক হাজতখানা স্থাপন, মাদক শনাক্তকরণে আধুনিক পরীক্ষাগার (ল্যাবরেটরি) এবং উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ট্র্যাকিং সরঞ্জাম সংযোজনের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের সীমান্ত এলাকাগুলোতে মাদকের অবৈধ অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান কঠোরভাবে প্রতিরোধ করতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং আধুনিক লজিস্টিকস সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে বলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে আশ্বস্ত করেন।

চব্বিশের ছাত্র-নাগরিক গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসন ও সামগ্রিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর জনসাধারণের আস্থা ফিরিয়ে আনা নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। অতীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বের হয়ে আসার একটি সুস্পষ্ট বার্তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশেষ করে তনু বা রামিষা হত্যার মতো স্পর্শকাতর মামলাগুলোর দ্রুত অগ্রগতি ও প্রযুক্তিগত তদন্তের নজির বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসানে বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বড় প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য হিসেবে গণ্য হচ্ছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল