দিকপাল

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬ | ১২:৫৯ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের অভিশাপ ‘জ জলাবদ্ধতা’ নিরসনে দখল হওয়া খাল উদ্ধার, বক্স কালভার্ট ও নর্দমা থেকে বর্জ্য অপসারণ এবং নতুন করে আধুনিক ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণে মাঠপর্যায়ে সমন্বিত ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার স্থায়ী সমাধানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি) স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি এই মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১০৯.২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য মাত্র তিনটি আউটলেট (কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল) সচল রয়েছে, যা বিশাল এই নগরীর তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এই সংকট কাটাতে জরুরি ভিত্তিতে আরও দুটি নতুন আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানান, স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিউমার্কেট, গ্রিন রোড, শান্তিনগর ও মালিবাগসহ প্রায় ৩৩টি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ ‘জলাবদ্ধতা হটস্পট’ চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির সময় এসব এলাকা থেকে দ্রুত পানি সরাতে পোর্টেবল হাই-পাওয়ার পাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘মেট্রো ঢাকা রেজিলিয়েন্স প্রকল্প’-এর আওতায় গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত একটি বৃহৎ ভূগর্ভস্থ নর্দমা এবং শ্যামপুর খালের পানি বুড়িগঙ্গায় ফেলতে বিশেষ বক্স কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে কালুনগর, শ্যামপুর, জিরানী ও মান্ডা খালের সংস্কার ও নান্দনিক রূপান্তরের কাজ চলছে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তাদের আওতাধীন ২৯টি ঐতিহ্যবাহী খাল পুরোপুরি দখলমুক্ত ও পুনঃখননের কাজ শুরু করেছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, খাল ও ড্রেনেজ লাইনে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য ও স্লাজ (পলিমাটি) অপসারণের কাজ ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা হয়েছে। আকস্মিক জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় শুধু হটস্পটগুলোতেই সাড়ে তিনশর বেশি পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও কুইক রেসপন্স টিম নিয়োজিত রাখা হয়েছে।

তবে দুই সিটির কর্মকর্তারা একটি বড় টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন। মাটির নিচ দিয়ে যাওয়া ড্রেনেজ লাইনের ভেতর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট ও টেলিফোনের ক্যাবল এলোমেলোভাবে থাকায় পানি প্রবাহে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।

ঢাকার এই সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. সাইফুল ইসলাম বলেন, “অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ভরাট করে আবাসন তৈরি এবং পলিথিন-প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে ঢাকার ড্রেনগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না; বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে এবং বর্ষার আগেই পাম্প স্টেশনগুলোর শতভাগ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।”

একই সুরে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার এবং বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির দুই সিটিকে আরও কঠোর আইনি ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তারা বলেন, যত্রতত্র ময়লা ফেলা রোধে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ আইন প্রয়োগ না করলে এই বিপুল বিনিয়োগ বৃথা যাবে।

ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা ছিল খালের শহর, যা প্রাকৃতিকভাবেই বৃষ্টির পানি চারপাশের নদীতে নিয়ে যেত। কিন্তু গত কয়েক দশকের অনিয়ন্ত্রিত দখলদারিত্বে সেই প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে ঢাকার প্রধান প্রধান হটস্পট—যেমন ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, ইস্কাটন, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুর-কাজীপাড়া, পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোড, জুরাইন এবং মতিঝিল-কমলাপুর এলাকা সামান্য বৃষ্টিতেই রূপ নেয় এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই সিটির এই নতুন মহাপরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়ন যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই কেবল ঢাকাবাসী এই তীব্র নাগরিক ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬


ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের বহুমুখী উদ্যোগ

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুন ২০২৬

featured Image

রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের অভিশাপ ‘জ জলাবদ্ধতা’ নিরসনে দখল হওয়া খাল উদ্ধার, বক্স কালভার্ট ও নর্দমা থেকে বর্জ্য অপসারণ এবং নতুন করে আধুনিক ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণে মাঠপর্যায়ে সমন্বিত ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যাওয়ার স্থায়ী সমাধানে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি) স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি এই মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ১০৯.২৪ বর্গকিলোমিটার এলাকার বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য মাত্র তিনটি আউটলেট (কমলাপুর টিটিপাড়া, ধোলাইখাল ও হাতিরঝিল) সচল রয়েছে, যা বিশাল এই নগরীর তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। এই সংকট কাটাতে জরুরি ভিত্তিতে আরও দুটি নতুন আউটলেট নির্মাণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম জানান, স্থায়ী সমাধানের পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিউমার্কেট, গ্রিন রোড, শান্তিনগর ও মালিবাগসহ প্রায় ৩৩টি অতি-ঝুঁকিপূর্ণ ‘জলাবদ্ধতা হটস্পট’ চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির সময় এসব এলাকা থেকে দ্রুত পানি সরাতে পোর্টেবল হাই-পাওয়ার পাম্প ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়াও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘মেট্রো ঢাকা রেজিলিয়েন্স প্রকল্প’-এর আওতায় গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত একটি বৃহৎ ভূগর্ভস্থ নর্দমা এবং শ্যামপুর খালের পানি বুড়িগঙ্গায় ফেলতে বিশেষ বক্স কালভার্ট নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি সরকারি অর্থায়নে কালুনগর, শ্যামপুর, জিরানী ও মান্ডা খালের সংস্কার ও নান্দনিক রূপান্তরের কাজ চলছে।

অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) তাদের আওতাধীন ২৯টি ঐতিহ্যবাহী খাল পুরোপুরি দখলমুক্ত ও পুনঃখননের কাজ শুরু করেছে। ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, খাল ও ড্রেনেজ লাইনে জমে থাকা প্লাস্টিক বর্জ্য ও স্লাজ (পলিমাটি) অপসারণের কাজ ২৪ ঘণ্টা চালু রাখা হয়েছে। আকস্মিক জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় শুধু হটস্পটগুলোতেই সাড়ে তিনশর বেশি পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও কুইক রেসপন্স টিম নিয়োজিত রাখা হয়েছে।

তবে দুই সিটির কর্মকর্তারা একটি বড় টেকনিক্যাল চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন। মাটির নিচ দিয়ে যাওয়া ড্রেনেজ লাইনের ভেতর পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট ও টেলিফোনের ক্যাবল এলোমেলোভাবে থাকায় পানি প্রবাহে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।

ঢাকার এই সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. সাইফুল ইসলাম বলেন, “অপরিকল্পিত নগরায়ন, খাল ভরাট করে আবাসন তৈরি এবং পলিথিন-প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে ঢাকার ড্রেনগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু ড্রেন পরিষ্কার করলেই হবে না; বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী নিয়মিত ড্রেজিং করতে হবে এবং বর্ষার আগেই পাম্প স্টেশনগুলোর শতভাগ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে।”

একই সুরে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার এবং বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির দুই সিটিকে আরও কঠোর আইনি ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। তারা বলেন, যত্রতত্র ময়লা ফেলা রোধে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ আইন প্রয়োগ না করলে এই বিপুল বিনিয়োগ বৃথা যাবে।

ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা ছিল খালের শহর, যা প্রাকৃতিকভাবেই বৃষ্টির পানি চারপাশের নদীতে নিয়ে যেত। কিন্তু গত কয়েক দশকের অনিয়ন্ত্রিত দখলদারিত্বে সেই প্রাকৃতিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে ঢাকার প্রধান প্রধান হটস্পট—যেমন ধানমন্ডি-২৭, গ্রিন রোড, ইস্কাটন, কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট, মিরপুর-কাজীপাড়া, পুরান ঢাকার আগা সাদেক রোড, জুরাইন এবং মতিঝিল-কমলাপুর এলাকা সামান্য বৃষ্টিতেই রূপ নেয় এক একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুই সিটির এই নতুন মহাপরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অর্থায়ন যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত রেখে দ্রুত বাস্তবায়ন করা যায়, তবেই কেবল ঢাকাবাসী এই তীব্র নাগরিক ভোগান্তি থেকে মুক্তি পেতে পারে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল