রাজশাহী অঞ্চলে এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয় হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর বড় একটি অংশের সংক্রমণের পেছনে সমকামিতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যৌনাচারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৫২ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে বয়সের হিসাবে ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে আরও ৩৪ জন রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের সবাই সমকামী সম্প্রদায়ের। সব মিলিয়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় আটশ ছুঁইছুঁই করছে, যার মধ্যে কেবল সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীতেই সংক্রমণের হার রেকর্ড পরিমাণে বেশি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর বিভিন্ন নির্জন স্থান ও পদ্মা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে রাতের আঁধারে সমকামীদের নিয়মিত আড্ডাসহ নানা নিষিদ্ধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই কর্মকাণ্ডকে প্রসারিত করার চেষ্টাও চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি ও কঠোর হস্তক্ষেপের অভাব থাকায় এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড অবাধে চলছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনিরাপদ যৌনাচার, বিশেষ করে পায়ুপথে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে এবং এই ভাইরাস দীর্ঘসময় শরীরে সক্রিয় থাকায় তা অন্যদের মাঝেও খুব সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সমাজ ও ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, এটি কেবল ধর্মীয় বা সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও চরম হুমকির। তার মতে, পরিবারব্যবস্থা ও নৈতিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি ধর্মীয় ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে সরকারকেও এই ইস্যুতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এইচআইভি আক্রান্তদের সঙ্গে কাজ করা সমাজকর্মীরাও মনে করেন, সামাজিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাঁকা চোখে দেখার প্রবণতা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, ফলে তারা স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়েন। সরকার এইচআইভির চিকিৎসাকে সহজলভ্য ও বিনামূল্যে করার উদ্যোগ নিলেও সামাজিক লাঞ্ছনার ভয় অনেকে প্রকাশ্যে আসতে চান না।
এদিকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও কিছুটা ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে। যদিও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি সেন্টার চালু হয়েছে, তবুও প্রক্রিয়াগত কিছু জটিলতার কারণে পুরনো রোগীদের নিয়মিত ওষুধের জন্য বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একদিকে যেমন শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন, অন্যদিকে যাতায়াত খরচসহ আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু ওষুধ দিয়ে নয়, বরং ব্যক্তিকে সচেতন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে দূরে রাখা গেলেই সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সংক্রমণের এই হার যদি এখনই প্রতিরোধ করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এটি বৃহত্তর জনপদকে ভয়াবহ মহামারির ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

শনিবার, ২০ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ জুন ২০২৬
রাজশাহী অঞ্চলে এইচআইভি ভাইরাসের সংক্রমণ এক উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। স্থানীয় হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এ অঞ্চলে মোট শনাক্ত হওয়া রোগীর বড় একটি অংশের সংক্রমণের পেছনে সমকামিতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ যৌনাচারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যমতে, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছরের মার্চ মাস পর্যন্ত ১২ হাজার ৮৫২ জনের এইচআইভি পরীক্ষা করা হয়, যার মধ্যে ১১৫ জনের শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে বয়সের হিসাবে ২৫ থেকে ৫০ বছর বয়সীদের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যে আরও ৩৪ জন রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যাদের সবাই সমকামী সম্প্রদায়ের। সব মিলিয়ে রাজশাহী বিভাগের আট জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় আটশ ছুঁইছুঁই করছে, যার মধ্যে কেবল সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহীতেই সংক্রমণের হার রেকর্ড পরিমাণে বেশি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজশাহীর বিভিন্ন নির্জন স্থান ও পদ্মা তীরবর্তী এলাকাগুলোতে রাতের আঁধারে সমকামীদের নিয়মিত আড্ডাসহ নানা নিষিদ্ধ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই কর্মকাণ্ডকে প্রসারিত করার চেষ্টাও চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রশাসনের যথাযথ নজরদারি ও কঠোর হস্তক্ষেপের অভাব থাকায় এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ড অবাধে চলছে, যা সংক্রমণের ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, অনিরাপদ যৌনাচার, বিশেষ করে পায়ুপথে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে এবং এই ভাইরাস দীর্ঘসময় শরীরে সক্রিয় থাকায় তা অন্যদের মাঝেও খুব সহজে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সমাজ ও ধর্মতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট থেকে এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, এটি কেবল ধর্মীয় বা সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী নয়, বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও চরম হুমকির। তার মতে, পরিবারব্যবস্থা ও নৈতিক কাঠামোকে সুদৃঢ় করার পাশাপাশি ধর্মীয় ও স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। একইসঙ্গে সরকারকেও এই ইস্যুতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। এইচআইভি আক্রান্তদের সঙ্গে কাজ করা সমাজকর্মীরাও মনে করেন, সামাজিকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বাঁকা চোখে দেখার প্রবণতা তাদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে, ফলে তারা স্বাভাবিক জীবন থেকে ছিটকে পড়েন। সরকার এইচআইভির চিকিৎসাকে সহজলভ্য ও বিনামূল্যে করার উদ্যোগ নিলেও সামাজিক লাঞ্ছনার ভয় অনেকে প্রকাশ্যে আসতে চান না।
এদিকে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও কিছুটা ভোগান্তির চিত্র উঠে এসেছে। যদিও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপি সেন্টার চালু হয়েছে, তবুও প্রক্রিয়াগত কিছু জটিলতার কারণে পুরনো রোগীদের নিয়মিত ওষুধের জন্য বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা একদিকে যেমন শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন, অন্যদিকে যাতায়াত খরচসহ আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু ওষুধ দিয়ে নয়, বরং ব্যক্তিকে সচেতন করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ থেকে দূরে রাখা গেলেই সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সংক্রমণের এই হার যদি এখনই প্রতিরোধ করা না যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে এটি বৃহত্তর জনপদকে ভয়াবহ মহামারির ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন