রাজধানীর অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতালের অতি গুরুত্বপূর্ণ এমআরআই মেশিনটি অচল হয়ে পড়ে আছে। ২০২১ সালের ২৭ মার্চ থেকে অকেজো হয়ে থাকা এই যন্ত্রটি মেরামতের জন্য কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারি অনুমোদন না মেলায় তা আর সচল করা সম্ভব হয়নি। প্রায় আঠারো কোটি টাকা মূল্যের এই অত্যাধুনিক যন্ত্রটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় এখন সেটি পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সরকারি এই হাসপাতালে সুলভ মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় সাধারণ রোগীদের, বিশেষ করে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষরা চরম অসহায়ত্বের শিকার হচ্ছেন। তাদের বাধ্য হয়ে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে পরীক্ষা করতে হচ্ছে, যা অনেকের পক্ষেই বহন করা অসম্ভব।
শুধু এমআরআই মেশিন নয়, হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগে আরও অন্তত ২০ থেকে ২৫টির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে সিটিস্ক্যান, এক্স-রে, ডায়ালাইসিস মেশিন, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ভেন্টিলেটর এবং ফটোথেরাপির মতো জরুরি যন্ত্রপাতিও রয়েছে। অনেক যন্ত্রের আয়ুষ্কাল ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, আবার কিছু সামান্য ত্রুটির কারণে অকেজো হয়ে থাকলেও নিয়মিত মেরামতের অভাবে তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। হাসপাতালটিতে ভিটামিন ডি বা অ্যালবুমিনের মতো প্রয়োজনীয় ৯৭টি পরীক্ষার সুযোগ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তার এক-তৃতীয়াংশই বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, লোকবল সংকট এবং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে এই যন্ত্রপাতিগুলো দ্রুত মেরামত করা যাচ্ছে না।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী এখানে ভিড় করছেন, কিন্তু চিকিৎসাসেবার প্রতিটি ধাপে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী হওয়ায় হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ—সবখানেই বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করছে। টিকিটের লাইন, চিকিৎসকের কক্ষের সামনে ভিড় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছাচ্ছে। করিডোর থেকে শুরু করে হাসপাতালের মেঝেতে অবস্থান নেওয়া রোগী ও তাদের স্বজনরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া হাসপাতাল ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে অবৈধ দোকানপাট ও দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলসহ সামগ্রিক সেবা কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে মেশিনটি কেনার মাত্র দেড় বছরের মাথায় সেটি নষ্ট হয়ে যায়। এরপর কয়েকবার মেরামত করা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। জাপানের মূল প্রস্তুতকারক কোম্পানির পরামর্শ অনুযায়ী মেশিনটি সচল করতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা খরচের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু অত্যধিক ব্যয়ের কারণে মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। এদিকে, হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের অনেকে স্ট্রোক বা গুরুতর শারীরিক জটিলতা নিয়ে আসছেন, যাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে এমআরআই প্রয়োজন। সরকারিভাবে এই পরীক্ষার খরচ দুই থেকে চার হাজার টাকা হলেও বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা ছয় থেকে বারো হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ জোগাতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
নেফ্রোলজি বিভাগেও একই রকম সংকট দেখা যাচ্ছে, যেখানে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ৩১টি মেশিনের মধ্যে ২৬টি সচল থাকলেও রোগীর সংখ্যার তুলনায় তা অত্যন্ত সামান্য। ফিস্টুলা বা অন্যান্য অস্ত্রোপচারের মতো জরুরি সেবাগুলোও এখানে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে রোগীদের পাঠানো হচ্ছে অন্য হাসপাতালে। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহার মতে, সাতশ পঞ্চাশ শয্যার বিপরীতে তেরোশ পঞ্চাশের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানিয়েছেন, মেশিনটি মেরামতের পরিবর্তে নতুন করে কেনার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় সাধারণ মানুষ তাদের জীবন রক্ষার জরুরি সেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন।

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬
রাজধানীর অন্যতম প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতালের অতি গুরুত্বপূর্ণ এমআরআই মেশিনটি অচল হয়ে পড়ে আছে। ২০২১ সালের ২৭ মার্চ থেকে অকেজো হয়ে থাকা এই যন্ত্রটি মেরামতের জন্য কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সরকারি অনুমোদন না মেলায় তা আর সচল করা সম্ভব হয়নি। প্রায় আঠারো কোটি টাকা মূল্যের এই অত্যাধুনিক যন্ত্রটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকায় এখন সেটি পুরোপুরি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সরকারি এই হাসপাতালে সুলভ মূল্যে পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় সাধারণ রোগীদের, বিশেষ করে দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষরা চরম অসহায়ত্বের শিকার হচ্ছেন। তাদের বাধ্য হয়ে বাইরের বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কয়েক গুণ বেশি অর্থ ব্যয় করে পরীক্ষা করতে হচ্ছে, যা অনেকের পক্ষেই বহন করা অসম্ভব।
শুধু এমআরআই মেশিন নয়, হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগসহ অন্যান্য বিভাগে আরও অন্তত ২০ থেকে ২৫টির মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। এর মধ্যে সিটিস্ক্যান, এক্স-রে, ডায়ালাইসিস মেশিন, ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটের ভেন্টিলেটর এবং ফটোথেরাপির মতো জরুরি যন্ত্রপাতিও রয়েছে। অনেক যন্ত্রের আয়ুষ্কাল ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, আবার কিছু সামান্য ত্রুটির কারণে অকেজো হয়ে থাকলেও নিয়মিত মেরামতের অভাবে তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। হাসপাতালটিতে ভিটামিন ডি বা অ্যালবুমিনের মতো প্রয়োজনীয় ৯৭টি পরীক্ষার সুযোগ থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে তার এক-তৃতীয়াংশই বন্ধ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের ভাষ্যমতে, লোকবল সংকট এবং জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে এই যন্ত্রপাতিগুলো দ্রুত মেরামত করা যাচ্ছে না।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রতিদিন হাজার হাজার রোগী এখানে ভিড় করছেন, কিন্তু চিকিৎসাসেবার প্রতিটি ধাপে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগী হওয়ায় হাসপাতালের বহির্বিভাগ থেকে শুরু করে জরুরি বিভাগ—সবখানেই বিশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করছে। টিকিটের লাইন, চিকিৎসকের কক্ষের সামনে ভিড় এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকায় রোগীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছাচ্ছে। করিডোর থেকে শুরু করে হাসপাতালের মেঝেতে অবস্থান নেওয়া রোগী ও তাদের স্বজনরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সময় কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। এছাড়া হাসপাতাল ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে অবৈধ দোকানপাট ও দালালদের দৌরাত্ম্যের কারণে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলসহ সামগ্রিক সেবা কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে মেশিনটি কেনার মাত্র দেড় বছরের মাথায় সেটি নষ্ট হয়ে যায়। এরপর কয়েকবার মেরামত করা হলেও তা স্থায়ী হয়নি। জাপানের মূল প্রস্তুতকারক কোম্পানির পরামর্শ অনুযায়ী মেশিনটি সচল করতে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা খরচের প্রয়োজন ছিল, কিন্তু অত্যধিক ব্যয়ের কারণে মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। এদিকে, হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের অনেকে স্ট্রোক বা গুরুতর শারীরিক জটিলতা নিয়ে আসছেন, যাদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে এমআরআই প্রয়োজন। সরকারিভাবে এই পরীক্ষার খরচ দুই থেকে চার হাজার টাকা হলেও বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তা ছয় থেকে বারো হাজার টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ জোগাতে গিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
নেফ্রোলজি বিভাগেও একই রকম সংকট দেখা যাচ্ছে, যেখানে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ৩১টি মেশিনের মধ্যে ২৬টি সচল থাকলেও রোগীর সংখ্যার তুলনায় তা অত্যন্ত সামান্য। ফিস্টুলা বা অন্যান্য অস্ত্রোপচারের মতো জরুরি সেবাগুলোও এখানে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে রোগীদের পাঠানো হচ্ছে অন্য হাসপাতালে। হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহার মতে, সাতশ পঞ্চাশ শয্যার বিপরীতে তেরোশ পঞ্চাশের বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি জানিয়েছেন, মেশিনটি মেরামতের পরিবর্তে নতুন করে কেনার জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় সাধারণ মানুষ তাদের জীবন রক্ষার জরুরি সেবা থেকে প্রতিনিয়ত বঞ্চিত হচ্ছেন।

আপনার মতামত লিখুন