দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নিতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মেগা প্রকল্প ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) রেলওয়ে’। কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ওমান—এই ছয়টি উপসাগরীয় দেশকে একটি সুসংগঠিত একক রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে নতুন গতি এসেছে। সম্প্রতি জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রীদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই প্রকল্পের কাজ দ্রুততম সময়ে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গালফ রেলওয়ে শুধু একটি সাধারণ পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও লজিস্টিক সংযোগে এক ঐতিহাসিক যুগের সূচনা করবে।
প্রস্তাবিত জিসিসি রেলওয়ে নেটওয়ার্কটির মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ হাজার ১১৭ কিলোমিটার। এটি কুয়েত সিটি থেকে যাত্রা শুরু করে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে ওমানের রাজধানী মাসকাট পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পরিবহনমন্ত্রীদের বৈঠকে জানানো হয়, এই রেলপথটি চালু হলে মধ্যপ্রাচ্যে সড়কপথের ওপর পণ্য পরিবহনের অতিরিক্ত চাপ ও নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে যাতায়াত ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, যা সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক বাণিজ্যকে আরও সহজ ও লাভজনক করে তুলবে।
বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে জানা গেছে, এই বিশাল মেগা প্রকল্পটির প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো রেল নেটওয়ার্কটি সম্পূর্ণ সচল করার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কুয়েত ইতোমধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটি নিজেদের শাদাদিয়া অঞ্চল থেকে সৌদি সীমান্তবর্তী নুয়াইসিব পর্যন্ত ১১১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথের চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি কুয়েত পৌর কাউন্সিল সৌদি আরবের সঙ্গে রেল সংযোগের রুট ও করিডর অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও কুয়েত-সৌদি রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুয়েত সীমান্ত থেকে শুরু করে ইউএই সীমান্ত পর্যন্ত সৌদি অংশের রেলপথ নির্মাণের কাজ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই নেটওয়ার্কে যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করতে পারবে। বিভিন্ন টেকনিক্যাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই উচ্চগতির কারণে কুয়েত সিটি থেকে সৌদির রাজধানী রিয়াদ পর্যন্ত দীর্ঘ দূরত্ব মাত্র দুই ঘণ্টারও কম সময়ে পাড়ি দেওয়া সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেনের মাধ্যমে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুত পণ্য সরবরাহ করা যাবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গালফ রেলওয়ে প্রকল্প চালু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক একীকরণ ও পারস্পরিক লজিস্টিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে। এটি কেবল বাণিজ্য নয়, বরং পর্যটন, বৈদেশিক বিনিয়োগ, শ্রমবাজারের গতিশীলতা এবং আন্তঃদেশীয় যোগাযোগব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সাথে সমুদ্রপথে কোনো আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট বা নৌ-বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটলে, তার বিকল্প নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে এই স্থল রেল নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে।

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে রূপ নিতে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের মেগা প্রকল্প ‘গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল (জিসিসি) রেলওয়ে’। কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) এবং ওমান—এই ছয়টি উপসাগরীয় দেশকে একটি সুসংগঠিত একক রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে নতুন গতি এসেছে। সম্প্রতি জিসিসিভুক্ত দেশগুলোর পরিবহন ও যোগাযোগমন্ত্রীদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এই প্রকল্পের কাজ দ্রুততম সময়ে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গালফ রেলওয়ে শুধু একটি সাধারণ পরিবহন ব্যবস্থা নয়, এটি সমগ্র উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও লজিস্টিক সংযোগে এক ঐতিহাসিক যুগের সূচনা করবে।
প্রস্তাবিত জিসিসি রেলওয়ে নেটওয়ার্কটির মোট দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ২ হাজার ১১৭ কিলোমিটার। এটি কুয়েত সিটি থেকে যাত্রা শুরু করে সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে ওমানের রাজধানী মাসকাট পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। পরিবহনমন্ত্রীদের বৈঠকে জানানো হয়, এই রেলপথটি চালু হলে মধ্যপ্রাচ্যে সড়কপথের ওপর পণ্য পরিবহনের অতিরিক্ত চাপ ও নির্ভরতা অনেকাংশে কমে আসবে। একই সঙ্গে যাতায়াত ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, যা সদস্য দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক বাণিজ্যকে আরও সহজ ও লাভজনক করে তুলবে।
বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে জানা গেছে, এই বিশাল মেগা প্রকল্পটির প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর যৌথ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে পুরো রেল নেটওয়ার্কটি সম্পূর্ণ সচল করার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে কুয়েত ইতোমধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটি নিজেদের শাদাদিয়া অঞ্চল থেকে সৌদি সীমান্তবর্তী নুয়াইসিব পর্যন্ত ১১১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথের চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নের জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। পাশাপাশি কুয়েত পৌর কাউন্সিল সৌদি আরবের সঙ্গে রেল সংযোগের রুট ও করিডর অনুমোদন দিয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবও কুয়েত-সৌদি রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কুয়েত সীমান্ত থেকে শুরু করে ইউএই সীমান্ত পর্যন্ত সৌদি অংশের রেলপথ নির্মাণের কাজ আগামী কয়েক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্য রয়েছে।
প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে এই নেটওয়ার্কে যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো ঘণ্টায় ২০০ থেকে ৩০০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করতে পারবে। বিভিন্ন টেকনিক্যাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই উচ্চগতির কারণে কুয়েত সিটি থেকে সৌদির রাজধানী রিয়াদ পর্যন্ত দীর্ঘ দূরত্ব মাত্র দুই ঘণ্টারও কম সময়ে পাড়ি দেওয়া সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেনের মাধ্যমে অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্রুত পণ্য সরবরাহ করা যাবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গালফ রেলওয়ে প্রকল্প চালু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর অর্থনৈতিক একীকরণ ও পারস্পরিক লজিস্টিক সহযোগিতা আরও শক্তিশালী হবে। এটি কেবল বাণিজ্য নয়, বরং পর্যটন, বৈদেশিক বিনিয়োগ, শ্রমবাজারের গতিশীলতা এবং আন্তঃদেশীয় যোগাযোগব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একই সাথে সমুদ্রপথে কোনো আকস্মিক ভূ-রাজনৈতিক সংকট বা নৌ-বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটলে, তার বিকল্প নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে এই স্থল রেল নেটওয়ার্ক মধ্যপ্রাচ্যের জন্য অন্যতম লাইফলাইন হিসেবে কাজ করবে।

আপনার মতামত লিখুন