বিশ্বের অতি উচ্চবিত্ত এবং অত্যধিক ভোগকারী দশ শতাংশ মানুষের জীবনধারা পৃথিবীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর যে ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করছে, তা নিয়ে এক নতুন গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এই জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত ভোগের কারণে প্রতি বছর পরিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তার আর্থিক মূল্য প্রায় পাঁচ লাখ ৭০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। বিস্ময়কর বিষয় হলো, শীর্ষ এই দশ শতাংশ মানুষের দ্বারা সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির এই বিশাল অংক বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোর বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের চেয়েও বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর পরিবেশের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছেন মূলত উন্নত বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে বসবাসকারী মানুষেরা। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৪৫ শতাংশ নাগরিক এই অতি-ভোগকারী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাদের ভোগবিলাসের প্রধান দুটি খাত—অর্থাৎ উচ্চ মাত্রায় লাল মাংস গ্রহণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল জীবনযাত্রা—পরিবেশের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। মাংসের চাহিদা মেটাতে বন উজাড় হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা নিয়মিত আকাশপথে ভ্রমণের ফলে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে একজন অতি-ভোগকারী মানুষের কারণে বার্ষিক পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ গড়ে ১৯ হাজার থেকে ৬৩ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে শুধুমাত্র ধনী দেশেই নয়, চীনসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতেও উচ্চবিত্ত পরিবারের কারণে পরিবেশের এই ক্ষতির মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চীনের শীর্ষ দশ শতাংশ মানুষের গড় পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ এখন জার্মানির শীর্ষ ধনী শ্রেণির ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই ব্যাপক পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির সিংহভাগ বা প্রায় অর্ধেকেরও বেশি দায়ী জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য, আর বাকি অংশটি জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবের কারণে ঘটছে। অক্সফোর্ড মার্টিন স্কুলের অধ্যাপক পল বেরেনস জানিয়েছেন, এই ভয়াবহ হিসাবটি আসলে একটি রক্ষণশীল অনুমান। কারণ এর মধ্যে ধনী ব্যক্তিদের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বা শেয়ার বাজারের মাধ্যমে হওয়া কার্বন নিঃসরণের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদি সব বিষয় যোগ করা হতো, তবে ক্ষতির অংকটি আরও অনেক বেশি হতো। এর আগে গ্রিনপিসের পৃথক একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে, পৃথিবীর মাত্র এক শতাংশ ধনীর সম্পদের কারণে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের চার ভাগের এক ভাগ ঘটে, যা প্রতি বছর এক ট্রিলিয়ন ডলারের সমান জলবায়ু ক্ষতি সাধন করে।
এই ক্রমবর্ধমান পরিবেশ বিপর্যয় রোধে গবেষকরা নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা মনে করছেন, সরকারগুলোর উচিত উচ্চ-ভোগকারী এই শ্রেণির মানুষের বিলাসপণ্য, সম্পদ এবং কার্বন ব্যবহারের ওপর বিশেষ কর বা শুল্ক আরোপ করা। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণকারী কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে, অন্যদিকে সংগৃহীত কর থেকে টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে। সম্পদশালী ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার লাগাম টানার মাধ্যমেই কেবল পৃথিবীকে রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬
বিশ্বের অতি উচ্চবিত্ত এবং অত্যধিক ভোগকারী দশ শতাংশ মানুষের জীবনধারা পৃথিবীর পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর যে ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করছে, তা নিয়ে এক নতুন গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লাইডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ প্রচেষ্টায় পরিচালিত এই সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, এই জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত ভোগের কারণে প্রতি বছর পরিবেশের যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তার আর্থিক মূল্য প্রায় পাঁচ লাখ ৭০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। বিস্ময়কর বিষয় হলো, শীর্ষ এই দশ শতাংশ মানুষের দ্বারা সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির এই বিশাল অংক বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশগুলোর বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের চেয়েও বেশি।
গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর পরিবেশের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছেন মূলত উন্নত বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে বসবাসকারী মানুষেরা। এর মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ৪৫ শতাংশ নাগরিক এই অতি-ভোগকারী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাদের ভোগবিলাসের প্রধান দুটি খাত—অর্থাৎ উচ্চ মাত্রায় লাল মাংস গ্রহণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল জীবনযাত্রা—পরিবেশের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনছে। মাংসের চাহিদা মেটাতে বন উজাড় হচ্ছে এবং ঘরবাড়ি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ বা নিয়মিত আকাশপথে ভ্রমণের ফলে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকারক গ্যাস নির্গত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে একজন অতি-ভোগকারী মানুষের কারণে বার্ষিক পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ গড়ে ১৯ হাজার থেকে ৬৩ হাজার ডলার পর্যন্ত হতে পারে। তবে শুধুমাত্র ধনী দেশেই নয়, চীনসহ উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতেও উচ্চবিত্ত পরিবারের কারণে পরিবেশের এই ক্ষতির মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। চীনের শীর্ষ দশ শতাংশ মানুষের গড় পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ এখন জার্মানির শীর্ষ ধনী শ্রেণির ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই ব্যাপক পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির সিংহভাগ বা প্রায় অর্ধেকেরও বেশি দায়ী জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের জন্য, আর বাকি অংশটি জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র প্রভাবের কারণে ঘটছে। অক্সফোর্ড মার্টিন স্কুলের অধ্যাপক পল বেরেনস জানিয়েছেন, এই ভয়াবহ হিসাবটি আসলে একটি রক্ষণশীল অনুমান। কারণ এর মধ্যে ধনী ব্যক্তিদের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বা শেয়ার বাজারের মাধ্যমে হওয়া কার্বন নিঃসরণের হিসাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যদি সব বিষয় যোগ করা হতো, তবে ক্ষতির অংকটি আরও অনেক বেশি হতো। এর আগে গ্রিনপিসের পৃথক একটি গবেষণায় দেখা গিয়েছিল যে, পৃথিবীর মাত্র এক শতাংশ ধনীর সম্পদের কারণে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের চার ভাগের এক ভাগ ঘটে, যা প্রতি বছর এক ট্রিলিয়ন ডলারের সমান জলবায়ু ক্ষতি সাধন করে।
এই ক্রমবর্ধমান পরিবেশ বিপর্যয় রোধে গবেষকরা নীতিনির্ধারকদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা মনে করছেন, সরকারগুলোর উচিত উচ্চ-ভোগকারী এই শ্রেণির মানুষের বিলাসপণ্য, সম্পদ এবং কার্বন ব্যবহারের ওপর বিশেষ কর বা শুল্ক আরোপ করা। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণকারী কর্মকাণ্ড হ্রাস পাবে, অন্যদিকে সংগৃহীত কর থেকে টেকসই উন্নয়ন এবং সামাজিক বৈষম্য কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় তহবিলের জোগান দেওয়া সম্ভব হবে। সম্পদশালী ব্যক্তিদের জীবনযাত্রার লাগাম টানার মাধ্যমেই কেবল পৃথিবীকে রক্ষা করা এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা সম্ভব বলে মনে করছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আপনার মতামত লিখুন