দিকপাল

তাইওয়ান সীমান্তে আবারও চীনের যুদ্ধবিমান ও নৌযান শনাক্ত


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬ | ০৫:৫৮ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

তাইওয়ান সীমান্তে আবারও চীনের যুদ্ধবিমান ও নৌযান শনাক্ত

তাইওয়ান প্রণালী এবং এর সংলগ্ন কৌশলগত জলসীমায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানের চারপাশে আবারও প্রতিবেশি রাষ্ট্র চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির ব্যাপক সামরিক ও নৌ তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় তাদের সার্বভৌম আকাশসীমা ও জলসীমার অত্যন্ত কাছাকাছি চীনের দুটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ছয়টি যুদ্ধজাহাজ এবং সাতটি সরকারি নজরদারি জাহাজের বিপজ্জনক উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই ধরনের ধারাবাহিক সামরিক উপস্থিতি তাইওয়ান প্রণালীর দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা ও শান্তিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।


তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, শনাক্ত হওয়া চীনা যুদ্ধবিমান দুটি তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলের ভেতরে বেশ কিছু সময় ধরে অবস্থান করেছিল। বেইজিংয়ের এই ধরনের উস্কানিমূলক সামরিক আগ্রাসনের পর তাইওয়ানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। তারা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নৌবাহিনীকে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি পাল্টা কৌশলগত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তাইওয়ান প্রশাসনের দাবি, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে তোয়াক্কা না করে চীন প্রায় প্রতিদিনই এই অঞ্চলের আকাশ ও জলসীমা লঙ্ঘন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


এদিকে এই আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এর আগে মে মাসে আয়োজিত এক বিশেষ আলাপচারিতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ‘তাইওয়ান সমস্যা’ নিয়ে কাজ করবে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে তাঁর একটি অত্যন্ত চমৎকার ও অসাধারণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তাইওয়ানের চলমান নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়ে তিনি সব পক্ষের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলবেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছিলেন যে, এই অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি বর্তমানে ওয়াশিংটনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের আশ্বাসের পরও তাইওয়ানের ওপর চীনের সামরিক চাপ প্রয়োগের কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসেনি।


প্রকৃতপক্ষে তাইওয়ানের ওপর চীনের মালিকানার দাবিটি দীর্ঘদিনের একটি অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক, কৌশলগত ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়। বেইজিং বরাবরই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস ও প্রচার করে যে, তাইওয়ান মূলত চীনের মূল ভূখণ্ডেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। নিজেদের এই দাবির সপক্ষে ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন করে চীন দাবি করে যে, ১৬৮৩ সালে ঐতিহাসিক চিং রাজবংশ কর্তৃক এই দ্বীপটি জয় এবং দখলের সময় থেকেই এটি চীনা সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ভিত্তি করেই বেইজিং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাইওয়ানের ওপর তাদের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের দাবি জানিয়ে আসছে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হলেও দ্বীপটিকে মূল ভূখণ্ডের সাথে একীভূত করার হুমকি দিয়ে আসছে।


এর বিপরীতে তাইওয়ান সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং বিশ্বমানের স্বাবলম্বী অর্থনীতি পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন জাতিসত্তা হিসেবে নিজেদের পরিচয় বজায় রেখেছে। যদিও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ চীনের চাপের কারণে তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিতে পারে না, তবুও আন্তর্জাতিক আইনে তাইওয়ানের এই সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক ধারা এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক মঞ্চে এক জটিল আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। বেইজিংয়ের বর্তমান এই ক্রমবর্ধমান সামরিক উস্কানি দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক বিরোধকে এক নতুন ও বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


সূত্র: এএনআই

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


তাইওয়ান সীমান্তে আবারও চীনের যুদ্ধবিমান ও নৌযান শনাক্ত

প্রকাশের তারিখ : ০৮ জুন ২০২৬

featured Image

তাইওয়ান প্রণালী এবং এর সংলগ্ন কৌশলগত জলসীমায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানের চারপাশে আবারও প্রতিবেশি রাষ্ট্র চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির ব্যাপক সামরিক ও নৌ তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী চব্বিশ ঘণ্টায় তাদের সার্বভৌম আকাশসীমা ও জলসীমার অত্যন্ত কাছাকাছি চীনের দুটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ছয়টি যুদ্ধজাহাজ এবং সাতটি সরকারি নজরদারি জাহাজের বিপজ্জনক উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই ধরনের ধারাবাহিক সামরিক উপস্থিতি তাইওয়ান প্রণালীর দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতা ও শান্তিকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকরা।


তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, শনাক্ত হওয়া চীনা যুদ্ধবিমান দুটি তাইওয়ানের পূর্বাঞ্চলীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলের ভেতরে বেশ কিছু সময় ধরে অবস্থান করেছিল। বেইজিংয়ের এই ধরনের উস্কানিমূলক সামরিক আগ্রাসনের পর তাইওয়ানের সশস্ত্র বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছে। তারা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও নৌবাহিনীকে প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি পাল্টা কৌশলগত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তাইওয়ান প্রশাসনের দাবি, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে তোয়াক্কা না করে চীন প্রায় প্রতিদিনই এই অঞ্চলের আকাশ ও জলসীমা লঙ্ঘন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


এদিকে এই আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। এর আগে মে মাসে আয়োজিত এক বিশেষ আলাপচারিতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ‘তাইওয়ান সমস্যা’ নিয়ে কাজ করবে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে তাঁর একটি অত্যন্ত চমৎকার ও অসাধারণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে ট্রাম্প আশ্বস্ত করেছিলেন যে, তাইওয়ানের চলমান নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়ে তিনি সব পক্ষের সাথে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলবেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছিলেন যে, এই অঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি বর্তমানে ওয়াশিংটনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ধরনের আশ্বাসের পরও তাইওয়ানের ওপর চীনের সামরিক চাপ প্রয়োগের কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসেনি।


প্রকৃতপক্ষে তাইওয়ানের ওপর চীনের মালিকানার দাবিটি দীর্ঘদিনের একটি অত্যন্ত জটিল রাজনৈতিক, কৌশলগত ও ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়। বেইজিং বরাবরই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস ও প্রচার করে যে, তাইওয়ান মূলত চীনের মূল ভূখণ্ডেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রয়েছে। নিজেদের এই দাবির সপক্ষে ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন করে চীন দাবি করে যে, ১৬৮৩ সালে ঐতিহাসিক চিং রাজবংশ কর্তৃক এই দ্বীপটি জয় এবং দখলের সময় থেকেই এটি চীনা সাম্রাজ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ভিত্তি করেই বেইজিং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাইওয়ানের ওপর তাদের পূর্ণ সার্বভৌমত্বের দাবি জানিয়ে আসছে এবং প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হলেও দ্বীপটিকে মূল ভূখণ্ডের সাথে একীভূত করার হুমকি দিয়ে আসছে।


এর বিপরীতে তাইওয়ান সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজস্ব গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং বিশ্বমানের স্বাবলম্বী অর্থনীতি পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন জাতিসত্তা হিসেবে নিজেদের পরিচয় বজায় রেখেছে। যদিও বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ চীনের চাপের কারণে তাইওয়ানকে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিতে পারে না, তবুও আন্তর্জাতিক আইনে তাইওয়ানের এই সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক ধারা এবং জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক মঞ্চে এক জটিল আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। বেইজিংয়ের বর্তমান এই ক্রমবর্ধমান সামরিক উস্কানি দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক বিরোধকে এক নতুন ও বিপজ্জনক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।


সূত্র: এএনআই


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল