শৈশবে কোনো দিন বিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখা হয়নি, পড়াশোনা করার সুযোগ তো বহুদূরের কথা। ছোটবেলায় যখন অন্যান্য শিশুরা বই-খাতা হাতে স্কুলে যেত, তখন হোসনে আরাকে সামলাতে হতো তার ছোট ভাইকে, কারণ অভাবের তাড়নায় তার মা তখন অন্যের বাড়িতে কাজে যেতেন। আর এখন একটু বড় হতেই বেঁচে থাকার তাগিদে সে নিজেই যোগ দিয়েছে পোশাক কারখানায়। রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেললাইন সংলগ্ন বস্তির বাসিন্দা চৌদ্দ বছর বয়সী কিশোরী হোসনে আরা এভাবেই চরম আক্ষেপের সঙ্গে তার বিদ্যালয়ে যেতে না পারার যন্ত্রণাদায়ক জীবনের কথা বলছিল। হোসনে আরার মা লাইলি বেগমও বাস্তবতার নিরিখে জানালেন, গরিব মানুষেরা শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হাজারটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসুবিধার কারণে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারেন না।
রাজধানীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশছোঁয়া বহুতল অট্টালিকাগুলোর ঠিক নিচেই গড়ে উঠেছে এক অন্য রকম শহর, যা বস্তি নামে পরিচিত। যেখানে হাজারো বৈষম্য, চরম নোংরা পরিবেশ ও নিত্যদিনের প্রতিকূলতার মাঝে বেড়ে ওঠে অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশু। এই বস্তির শিশুদের চোখেও রঙিন স্বপ্ন থাকে, মনে থাকে এক অদম্য জানার কৌতূহল। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন আর কৌতূহলগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্যের কঠিন ও নির্মম দেয়ালে মাথা ঠুকে অকালেই নিঃশেষ হয়ে যায়। একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে যখন দেশজুড়ে আমরা ডিজিটাল ও স্মার্ট সমাজ বিনির্মাণের বড় বড় কথা বলছি, তখন শহুরে বস্তির এই লাখ লাখ শিশুর মৌলিক শিক্ষার অধিকার যেন এক সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া অন্ধকার অধ্যায় হয়েই থেকে যাচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, কমলাপুর রেললাইন বস্তি, মোহাম্মদপুরের বরকতের বস্তি, বেড়িবাঁধ মাস্টারের বস্তি এবং আগারগাঁওয়ের করিমের বস্তি সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বস্তির নোংরা ও ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে কিছু প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হলেও সেখানে শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতির হার খুবই হতাশাজনক। বস্তির শিশুদের এই যৎসামান্য পড়াশোনা মূলত কেবল প্রাথমিকের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলে যাওয়ার দিক থেকে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বস্তিতে মেয়েশিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়েছে পাহাড়সম পারিবারিক ও সামাজিক বাধা। এর মধ্যে চরম অভাব-অনটনই মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। জীবন ও জীবিকার কঠিন যুদ্ধে জয়ী হতে অনেক মেয়েশিশুই মাঝপথে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। বস্তিতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা অনেক কম বয়সে উপার্জন শুরু করে। একটু বড় হলেই তারা বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে লেগে যায় এবং বয়স বারো-তেরো বছর হতে না হতেই তারা পোশাক কারখানার মতো কঠিন পরিশ্রমে যুক্ত হয়।
আগারগাঁওয়ের করিমের বস্তি ও কুমিল্লা বস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানকার কিছু শিশু শেরেবাংলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলোক শিশু শিক্ষালয় এবং শেরেবাংলা নগর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে লেখাপড়া করে। তবে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের রয়েছে একরাশ ক্ষোভ ও অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের দাবি, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকেরা পড়া ঠিকমতো বুঝিয়ে দেন না, উপরন্তু তাদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করা হয় এবং কারণে-অকারণে মারধর করা হয়। এর বাইরেও রয়েছে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ। বিভিন্ন অজুহাতে স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়, যা এই অভাবী মা-বাবাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেরেবাংলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এই রূঢ় সত্যটি স্বীকার করে বলেন, শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেরই সুবিধাবঞ্চিত বা গরিব শিশুদের প্রতি একধরনের অবহেলা করার মানসিকতা থাকে। এ কারণে তাদের যত্নের সঙ্গে পড়া শেখানোর কোনো আগ্রহ থাকে না। তা ছাড়া শিক্ষকদের ওপর সারা দিন অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকায় অনেক সময় এই শিশুদের প্রতি আলাদাভাবে খেয়াল করাও সম্ভব হয়ে ওঠে না।
আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল এবং ব্র্যাকের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, বস্তিতে বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে প্রায় চল্লিশ শতাংশ শিশুই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকে। আর যারা অনেক কষ্ট করে স্কুলে ভর্তি হতে পারে, তাদের একটি বড় অংশই পঞ্চম শ্রেণি পার হওয়ার আগেই পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে চরম দারিদ্র্য, বাসস্থানের অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যালয়ের ভেতরের বৈষম্যমূলক ও ভীতিভীতিকর পরিবেশ। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক শিশু তহবিলের একটি ভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিশুদের শিক্ষার গুণগত মান এবং মৌলিক দক্ষতা অর্জনে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে প্রায় ছয় দশমিক সাত শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত এবং প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী শিশুরা এই বঞ্চনার অন্ধকারে সবচেয়ে বেশি নিমজ্জিত।
উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র উনিশ শতাংশ শিশু প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের স্কুলে ভর্তির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশের সাফল্য বেশ প্রশংসনীয়, তবুও প্রাপ্ত তথ্য এটাই প্রমাণ করে যে, শিশুদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই স্কুল ছাড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় অভিশপ্ত বাল্যবিবাহ এবং ছেলেদের বেলায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী থাকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যেসব শিশু কোনোমতে স্কুলে যাচ্ছে, তাদের মধ্যেও অনেকেই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম শিশু তাদের বয়স অনুযায়ী সাধারণ সাক্ষরতা এবং গাণিতিক সংখ্যাগত দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারির আগে দেশে দশ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র তেতাল্লিশ শতাংশ শিশু দক্ষতার সঙ্গে পড়তে পারত। এ ছাড়া মাধ্যমিক পর্যায় পার হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র পঁচিশ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের মৌলিক জীবনমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছিল।
বস্তিতে বসবাসকারী অভিভাবকেরা অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে জানান, অভাবের কারণে শিশুদের পড়ালেখা একবার বন্ধ হলে তা আর নতুন করে শুরু করা সম্ভব হয় না। আবার বস্তির পারিপার্শ্বিক পরিবেশও মোটেও পড়াশোনার অনুকূল নয়। অনেক অভিভাবক জোর করে মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর চেষ্টা করলেও তারা স্কুলে যেতে চায় না, আর গেলেও নানা অজুহাতে একসময় যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। মূলত পড়ালেখার প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণই তৈরি হয় না। মোহাম্মদপুর বরকতের বস্তির বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, তিনি তার মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য প্রতিদিন মারধর পর্যন্ত করেছেন, তবুও অভাবের পরিবেশের কারণে মেয়ে আর স্কুলে যায়নি।
বেড়িবাঁধ মাস্টারের বস্তির স্বপ্নীল শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক মামুন রহমান বলেন, তাদের এখানে মূলত সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে পড়ানো হয়। কিন্তু নানা সামাজিক সমস্যার কারণে এদের পড়াশোনা নিয়মিত হয় না। অথচ প্রতিটি মা-বাবাই মনেপ্রাণে চান যে তাদের সন্তান অন্তত একটু শিক্ষিত হোক। সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা শিশুদের শিক্ষার জন্য নানা মুখরোচক কর্মসূচি চালু করলেও বস্তির বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় স্কুল বা দরদী শিক্ষকের অভাব প্রকট। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হতে না হতেই এই শিশুরা উপার্জনের জন্য শিশুশ্রমিক হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বস্তির অভিভাবকেরা শিক্ষার গুরুত্ব বোঝেন, কিন্তু পকেটে টাকা না থাকায় সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন না। এখানে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কেউ চায়ের দোকানে কাজ করছে, কেউ রিকশার গ্যারেজে কালঘাম ঝরাচ্ছে, আবার কেউ অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় শ্রম দিচ্ছে। এই শিশুরা স্কুলে যাওয়ার বদলে পরিবারের ক্ষুধা মেটাতে সংসারের হাল ধরেছে।
শিক্ষক মামুন রহমানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই শিশুদের শিক্ষার আলো থেকে দূরে রাখার প্রধান অন্তরায় হলো তাদের পরিবারের চরম আর্থিক অসচ্ছলতা। তাদের মা-বাবা সাধারণত দিনমজুর বা দিন আনি দিন খাই ধরনের অস্থায়ী পেশায় নিযুক্ত। তাদের কাছে সন্তানের স্কুলের বেতন বা খাতা-কলম কেনার চেয়ে দিনশেষে পরিবারের সবার এক বেলার খাবার জোগাড় করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও জীবন-মরণ সমস্যা। ফলে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ছাড়া বস্তির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পুষ্টিহীনতা এবং নিরাপত্তার অভাব তাদের বিদ্যালয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অনেক বস্তির আসেপাশে ভালো মানের কোনো বিদ্যালয় নেই, আর থাকলেও সেখানকার পরিবেশ ও শিক্ষকদের আচরণ বস্তির শিশুদের প্রতি মোটেও সহানুভূতিশীল বা মানবিক হয় না। ফলে তীব্র সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে এই শিশুরা একসময় স্কুল থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।
যদিও এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু উদ্যোগ চোখে পড়ে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বস্তির ভেতরে বা তার আশপাশে অস্থায়ী আনন্দ স্কুল কিংবা বিশেষ একাডেমি পরিচালনা করছে, যা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং স্কুলফিডিং কর্মসূচির মতো প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশের সংবিধান অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিটি শিশুর একটি মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র এই অধিকার নিশ্চিত করতে আইনত বাধ্য। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, শহরের ঝলমলে আলোর নিচে বস্তির এই শিশুরা এক অদৃশ্য ও মানবেতর জীবনযাপন করে। তাদের অনেকেরই জন্মনিবন্ধন সনদ নেই, যা সরকারি স্কুলে ভর্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত। ফলে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তারা আইনি মারপ্যাঁচে পিছিয়ে পড়ে। যে বয়সে তাদের হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সেই কোমল বয়সেই তারা সংসারের নির্মম বোঝা কাঁধে তুলে নেয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বর্তমানে বস্তিগুলোতে উন্নত মানের কোনো সরকারি স্কুল নেই। শিক্ষা বলতে সেখানে কেবল বেসরকারি সংস্থাগুলোর কিছু অস্থায়ী প্রাথমিক কার্যক্রমকেই বোঝায়। বনানীর গোডাউন বস্তিতে বেসরকারি সংস্থার কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের বিনামূল্যে পড়াচ্ছেন জুলিয়া সুবর্ণা। নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, তার এখানে শিশুরা কেবল দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির সমমানের প্রাথমিক পড়াশোনাটুকু করতে পারে। এরপর অধিকাংশ শিশুই পরিবারের তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে বাইরের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। অনেক শিশুর দারুণ মেধা ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেবল সামর্থ্য না থাকায় মা-বাবা তাদের উচ্চশিক্ষার আলো দেখাতে পারেন না। ফলে তারা শিক্ষাজীবন থেকে চিরতরে ঝরে যায়। তাদের শেখানো প্রারম্ভিক ওই বর্ণমালাই হয়ে থাকে তাদের জীবনের শেষ শিক্ষা। এরপর একপর্যায়ে তারা সস্তা শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে এবং অনেক শিশু সঠিক নির্দেশনার অভাবে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। জুলিয়া সুবর্ণার মতে, বস্তিতে থাকা কিশোরীদের জীবন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের অনেককেই বারো থেকে পনেরো বছর বয়স হতে না হতেই জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তারা পড়াশোনা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অল্প বয়সে বিয়ে ও অপরিণত বয়সে সন্তান জন্মদানের কারণে তারা নানাবিধ মারাত্মক স্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগে। বস্তিতে মেয়েদের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই বাল্যবিবাহ। যেহেতু বস্তির অভিভাবকদের একটি বড় অংশেরই ধারণা যে মেয়েরা বিয়ের পর অন্য মানুষের ঘরে চলে যাবে, তাই তাদের পেছনে কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করে পড়াশোনা করিয়ে আখেরে কী লাভ—এমন সংকীর্ণ মানসিকতাই তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
শৈশবে কোনো দিন বিদ্যালয়ের আঙিনায় পা রাখা হয়নি, পড়াশোনা করার সুযোগ তো বহুদূরের কথা। ছোটবেলায় যখন অন্যান্য শিশুরা বই-খাতা হাতে স্কুলে যেত, তখন হোসনে আরাকে সামলাতে হতো তার ছোট ভাইকে, কারণ অভাবের তাড়নায় তার মা তখন অন্যের বাড়িতে কাজে যেতেন। আর এখন একটু বড় হতেই বেঁচে থাকার তাগিদে সে নিজেই যোগ দিয়েছে পোশাক কারখানায়। রাজধানীর কারওয়ান বাজার রেললাইন সংলগ্ন বস্তির বাসিন্দা চৌদ্দ বছর বয়সী কিশোরী হোসনে আরা এভাবেই চরম আক্ষেপের সঙ্গে তার বিদ্যালয়ে যেতে না পারার যন্ত্রণাদায়ক জীবনের কথা বলছিল। হোসনে আরার মা লাইলি বেগমও বাস্তবতার নিরিখে জানালেন, গরিব মানুষেরা শত ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও হাজারটা সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসুবিধার কারণে সন্তানদের পড়াশোনা করাতে পারেন না।
রাজধানীর বুকে দাঁড়িয়ে থাকা আকাশছোঁয়া বহুতল অট্টালিকাগুলোর ঠিক নিচেই গড়ে উঠেছে এক অন্য রকম শহর, যা বস্তি নামে পরিচিত। যেখানে হাজারো বৈষম্য, চরম নোংরা পরিবেশ ও নিত্যদিনের প্রতিকূলতার মাঝে বেড়ে ওঠে অসংখ্য সুবিধাবঞ্চিত শিশু। এই বস্তির শিশুদের চোখেও রঙিন স্বপ্ন থাকে, মনে থাকে এক অদম্য জানার কৌতূহল। কিন্তু তাদের সেই স্বপ্ন আর কৌতূহলগুলো বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দারিদ্র্যের কঠিন ও নির্মম দেয়ালে মাথা ঠুকে অকালেই নিঃশেষ হয়ে যায়। একবিংশ শতাব্দীর এই আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে যখন দেশজুড়ে আমরা ডিজিটাল ও স্মার্ট সমাজ বিনির্মাণের বড় বড় কথা বলছি, তখন শহুরে বস্তির এই লাখ লাখ শিশুর মৌলিক শিক্ষার অধিকার যেন এক সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া অন্ধকার অধ্যায় হয়েই থেকে যাচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, কমলাপুর রেললাইন বস্তি, মোহাম্মদপুরের বরকতের বস্তি, বেড়িবাঁধ মাস্টারের বস্তি এবং আগারগাঁওয়ের করিমের বস্তি সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বস্তির নোংরা ও ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে শিশুদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম। বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার উদ্যোগে কিছু প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হলেও সেখানে শিশুদের নিয়মিত উপস্থিতির হার খুবই হতাশাজনক। বস্তির শিশুদের এই যৎসামান্য পড়াশোনা মূলত কেবল প্রাথমিকের গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, প্রাথমিক পর্যায়ে স্কুলে যাওয়ার দিক থেকে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা কিছুটা এগিয়ে থাকলেও বস্তিতে মেয়েশিশুদের শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়েছে পাহাড়সম পারিবারিক ও সামাজিক বাধা। এর মধ্যে চরম অভাব-অনটনই মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। জীবন ও জীবিকার কঠিন যুদ্ধে জয়ী হতে অনেক মেয়েশিশুই মাঝপথে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। বস্তিতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েরা অনেক কম বয়সে উপার্জন শুরু করে। একটু বড় হলেই তারা বাসাবাড়িতে গৃহকর্মীর কাজে লেগে যায় এবং বয়স বারো-তেরো বছর হতে না হতেই তারা পোশাক কারখানার মতো কঠিন পরিশ্রমে যুক্ত হয়।
আগারগাঁওয়ের করিমের বস্তি ও কুমিল্লা বস্তির বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানকার কিছু শিশু শেরেবাংলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলোক শিশু শিক্ষালয় এবং শেরেবাংলা নগর শিশু শিক্ষাকেন্দ্রে লেখাপড়া করে। তবে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের রয়েছে একরাশ ক্ষোভ ও অভিযোগ। শিক্ষার্থীদের দাবি, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকেরা পড়া ঠিকমতো বুঝিয়ে দেন না, উপরন্তু তাদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ ব্যবহার করা হয় এবং কারণে-অকারণে মারধর করা হয়। এর বাইরেও রয়েছে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ। বিভিন্ন অজুহাতে স্কুল থেকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হয়, যা এই অভাবী মা-বাবাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে চরমভাবে নিরুৎসাহিত করে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেরেবাংলা আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এই রূঢ় সত্যটি স্বীকার করে বলেন, শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেরই সুবিধাবঞ্চিত বা গরিব শিশুদের প্রতি একধরনের অবহেলা করার মানসিকতা থাকে। এ কারণে তাদের যত্নের সঙ্গে পড়া শেখানোর কোনো আগ্রহ থাকে না। তা ছাড়া শিক্ষকদের ওপর সারা দিন অতিরিক্ত কাজের চাপ থাকায় অনেক সময় এই শিশুদের প্রতি আলাদাভাবে খেয়াল করাও সম্ভব হয়ে ওঠে না।
আন্তর্জাতিক শিশু তহবিল এবং ব্র্যাকের যৌথ তথ্য অনুযায়ী, বস্তিতে বসবাসকারী শিশুদের মধ্যে প্রায় চল্লিশ শতাংশ শিশুই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার আলো থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত থাকে। আর যারা অনেক কষ্ট করে স্কুলে ভর্তি হতে পারে, তাদের একটি বড় অংশই পঞ্চম শ্রেণি পার হওয়ার আগেই পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। এর প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে চরম দারিদ্র্য, বাসস্থানের অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যালয়ের ভেতরের বৈষম্যমূলক ও ভীতিভীতিকর পরিবেশ। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিয়ে আন্তর্জাতিক শিশু তহবিলের একটি ভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক স্তরে শিশুদের শিক্ষার গুণগত মান এবং মৌলিক দক্ষতা অর্জনে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে প্রায় ছয় দশমিক সাত শতাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত এবং প্রান্তিক ও প্রতিবন্ধী শিশুরা এই বঞ্চনার অন্ধকারে সবচেয়ে বেশি নিমজ্জিত।
উক্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র উনিশ শতাংশ শিশু প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের স্কুলে ভর্তির হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে দেশের সাফল্য বেশ প্রশংসনীয়, তবুও প্রাপ্ত তথ্য এটাই প্রমাণ করে যে, শিশুদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই স্কুল ছাড়ার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় অভিশপ্ত বাল্যবিবাহ এবং ছেলেদের বেলায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী থাকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যেসব শিশু কোনোমতে স্কুলে যাচ্ছে, তাদের মধ্যেও অনেকেই ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করতে পারছে না। তিন থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের এক-তৃতীয়াংশেরও কম শিশু তাদের বয়স অনুযায়ী সাধারণ সাক্ষরতা এবং গাণিতিক সংখ্যাগত দক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মহামারির আগে দেশে দশ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র তেতাল্লিশ শতাংশ শিশু দক্ষতার সঙ্গে পড়তে পারত। এ ছাড়া মাধ্যমিক পর্যায় পার হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র পঁচিশ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের মৌলিক জীবনমুখী দক্ষতা অর্জন করতে পেরেছিল।
বস্তিতে বসবাসকারী অভিভাবকেরা অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে জানান, অভাবের কারণে শিশুদের পড়ালেখা একবার বন্ধ হলে তা আর নতুন করে শুরু করা সম্ভব হয় না। আবার বস্তির পারিপার্শ্বিক পরিবেশও মোটেও পড়াশোনার অনুকূল নয়। অনেক অভিভাবক জোর করে মেয়েকে বিদ্যালয়ে পাঠানোর চেষ্টা করলেও তারা স্কুলে যেতে চায় না, আর গেলেও নানা অজুহাতে একসময় যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। মূলত পড়ালেখার প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণই তৈরি হয় না। মোহাম্মদপুর বরকতের বস্তির বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, তিনি তার মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর জন্য প্রতিদিন মারধর পর্যন্ত করেছেন, তবুও অভাবের পরিবেশের কারণে মেয়ে আর স্কুলে যায়নি।
বেড়িবাঁধ মাস্টারের বস্তির স্বপ্নীল শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষক মামুন রহমান বলেন, তাদের এখানে মূলত সমাজের সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে পড়ানো হয়। কিন্তু নানা সামাজিক সমস্যার কারণে এদের পড়াশোনা নিয়মিত হয় না। অথচ প্রতিটি মা-বাবাই মনেপ্রাণে চান যে তাদের সন্তান অন্তত একটু শিক্ষিত হোক। সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা শিশুদের শিক্ষার জন্য নানা মুখরোচক কর্মসূচি চালু করলেও বস্তির বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় স্কুল বা দরদী শিক্ষকের অভাব প্রকট। ফলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ হতে না হতেই এই শিশুরা উপার্জনের জন্য শিশুশ্রমিক হয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বস্তির অভিভাবকেরা শিক্ষার গুরুত্ব বোঝেন, কিন্তু পকেটে টাকা না থাকায় সন্তানের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেন না। এখানে শ্রমজীবী শিশুর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কেউ চায়ের দোকানে কাজ করছে, কেউ রিকশার গ্যারেজে কালঘাম ঝরাচ্ছে, আবার কেউ অন্য কোনো ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় শ্রম দিচ্ছে। এই শিশুরা স্কুলে যাওয়ার বদলে পরিবারের ক্ষুধা মেটাতে সংসারের হাল ধরেছে।
শিক্ষক মামুন রহমানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই শিশুদের শিক্ষার আলো থেকে দূরে রাখার প্রধান অন্তরায় হলো তাদের পরিবারের চরম আর্থিক অসচ্ছলতা। তাদের মা-বাবা সাধারণত দিনমজুর বা দিন আনি দিন খাই ধরনের অস্থায়ী পেশায় নিযুক্ত। তাদের কাছে সন্তানের স্কুলের বেতন বা খাতা-কলম কেনার চেয়ে দিনশেষে পরিবারের সবার এক বেলার খাবার জোগাড় করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও জীবন-মরণ সমস্যা। ফলে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই উপার্জনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ ছাড়া বস্তির অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, পুষ্টিহীনতা এবং নিরাপত্তার অভাব তাদের বিদ্যালয় থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। অনেক বস্তির আসেপাশে ভালো মানের কোনো বিদ্যালয় নেই, আর থাকলেও সেখানকার পরিবেশ ও শিক্ষকদের আচরণ বস্তির শিশুদের প্রতি মোটেও সহানুভূতিশীল বা মানবিক হয় না। ফলে তীব্র সামাজিক বৈষম্যের শিকার হয়ে এই শিশুরা একসময় স্কুল থেকে চিরতরে হারিয়ে যায়।
যদিও এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বেশ কিছু উদ্যোগ চোখে পড়ে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বস্তির ভেতরে বা তার আশপাশে অস্থায়ী আনন্দ স্কুল কিংবা বিশেষ একাডেমি পরিচালনা করছে, যা শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনার ক্ষেত্রে প্রশংসনীয় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে বই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান এবং স্কুলফিডিং কর্মসূচির মতো প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দেশের সংবিধান অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিটি শিশুর একটি মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্র এই অধিকার নিশ্চিত করতে আইনত বাধ্য। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো, শহরের ঝলমলে আলোর নিচে বস্তির এই শিশুরা এক অদৃশ্য ও মানবেতর জীবনযাপন করে। তাদের অনেকেরই জন্মনিবন্ধন সনদ নেই, যা সরকারি স্কুলে ভর্তির প্রথম এবং প্রধান শর্ত। ফলে শিক্ষাজীবনের শুরুতেই তারা আইনি মারপ্যাঁচে পিছিয়ে পড়ে। যে বয়সে তাদের হাতে বই-খাতা থাকার কথা, সেই কোমল বয়সেই তারা সংসারের নির্মম বোঝা কাঁধে তুলে নেয়।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, বর্তমানে বস্তিগুলোতে উন্নত মানের কোনো সরকারি স্কুল নেই। শিক্ষা বলতে সেখানে কেবল বেসরকারি সংস্থাগুলোর কিছু অস্থায়ী প্রাথমিক কার্যক্রমকেই বোঝায়। বনানীর গোডাউন বস্তিতে বেসরকারি সংস্থার কর্মী হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের বিনামূল্যে পড়াচ্ছেন জুলিয়া সুবর্ণা। নিজের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, তার এখানে শিশুরা কেবল দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির সমমানের প্রাথমিক পড়াশোনাটুকু করতে পারে। এরপর অধিকাংশ শিশুই পরিবারের তীব্র আর্থিক সংকটের কারণে বাইরের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্কুলে ভর্তি হতে পারে না। অনেক শিশুর দারুণ মেধা ও প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকা সত্ত্বেও কেবল সামর্থ্য না থাকায় মা-বাবা তাদের উচ্চশিক্ষার আলো দেখাতে পারেন না। ফলে তারা শিক্ষাজীবন থেকে চিরতরে ঝরে যায়। তাদের শেখানো প্রারম্ভিক ওই বর্ণমালাই হয়ে থাকে তাদের জীবনের শেষ শিক্ষা। এরপর একপর্যায়ে তারা সস্তা শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করে এবং অনেক শিশু সঠিক নির্দেশনার অভাবে নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। জুলিয়া সুবর্ণার মতে, বস্তিতে থাকা কিশোরীদের জীবন আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের অনেককেই বারো থেকে পনেরো বছর বয়স হতে না হতেই জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। ফলে তারা পড়াশোনা থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। অল্প বয়সে বিয়ে ও অপরিণত বয়সে সন্তান জন্মদানের কারণে তারা নানাবিধ মারাত্মক স্বাস্থ্য জটিলতায় ভোগে। বস্তিতে মেয়েদের শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই বাল্যবিবাহ। যেহেতু বস্তির অভিভাবকদের একটি বড় অংশেরই ধারণা যে মেয়েরা বিয়ের পর অন্য মানুষের ঘরে চলে যাবে, তাই তাদের পেছনে কষ্টার্জিত অর্থ খরচ করে পড়াশোনা করিয়ে আখেরে কী লাভ—এমন সংকীর্ণ মানসিকতাই তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন