মিশরের রাজধানী কায়রো বিশ্বজুড়েই তার অতি পরিচিত ও তীব্র যানজটের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বেশ ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রাচীন জনবহুল নগরীর ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে এবং প্রশাসনিক কাজকে আরও গতিশীল করতে মিশর সরকার মরুভূমির বুকে গড়ে তুলছে সম্পূর্ণ নতুন এক প্রশাসনিক রাজধানী। সরকারের সেই মহতী উদ্যোগে এবার এক অভাবনীয় মাত্রা যোগ করেছে আফ্রিকার প্রথম চালকবিহীন মনোরেল নেটওয়ার্ক। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই যাতায়াত ব্যবস্থা কায়রোর সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে তীব্র প্রত্যাশা জাগিয়েছে। সম্প্রতি গত মে মাসের ৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে কায়রো মনোরেলের পূর্ব নীল বা ইস্ট নাইল রুটটি। এটি আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং চালকবিহীন একটি মনোরেল ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রকল্পটির অধীনে থাকা দুটি রুট যখন পুরোপুরি চালু হবে, তখন এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম মনোরেল নেটওয়ার্কের গৌরব অর্জন করবে।
বর্তমানে চালু হওয়া এই পূর্ব নীল রুটটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ৫৬ কিলোমিটার, যা কায়রোর নাসর সিটির আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম এলাকা থেকে শুরু করে একদম নতুন তৈরি হওয়া প্রশাসনিক রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত। এর পাশাপাশি আরেকটি রুট অর্থাৎ প্রায় ৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পশ্চিম নীল বা ওয়েস্ট নাইল রুটের নির্মাণকাজও এখন বেশ জোরেশোরে চলছে। এই দ্বিতীয় রুটটি চালু হলে সেটি ৬ অক্টোবর সিটি থেকে গিজা পর্যন্ত সরাসরি চমৎকার সংযোগ স্থাপন করবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, এই দুটি রুট যখন একসাথে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তখন পুরো নেটওয়ার্কটির মোট দৈর্ঘ্য গিয়ে দাঁড়াবে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি। এর ফলে এটি বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম স্বীকৃত মনোরেল ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত চীনের চংকিং মনোরেলকেও দৈর্ঘ্যের দিক থেকে অনায়াসে ছাড়িয়ে যাবে। বিশাল এই আধুনিক নেটওয়ার্কটির প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী অত্যন্ত নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবহন করার মতো বিশাল সক্ষমতা রয়েছে।
মনোরেলটি উদ্বোধনের পর প্রথম তিন দিন সাধারণ যাত্রীরা একদম বিনামূল্যে ভ্রমণের এক দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য যাতায়াতের সুবিধার জন্য চারটি জোনভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরো পূর্ব নীল রুটে একবার ভ্রমণের জন্য একমুখী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ মিশরীয় পাউন্ড। কায়রোতে আগে থেকেই বিদ্যমান তিনটি মেট্রো লাইন চালু রয়েছে, যা বছরে প্রায় ৫০ কোটি যাত্রী পরিবহন করে থাকে। কিন্তু ক্রমাগত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে ২০১৯ সালে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বিশাল চুক্তির মাধ্যমে এই নতুন মনোরেল প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। ফরাসি রেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলস্টমের নেতৃত্বে গঠিত একটি শক্তিশালী কনসোর্টিয়াম এই পুরো প্রকল্পটির নির্মাণ এবং পরবর্তীতে তা পরিচালনার বড় দায়িত্বটি পালন করছে।
ইংল্যান্ডের ডার্বি কারখানায় বিশেষভাবে তৈরি ২৭২টি মনোরেল কোচ নিয়ে মোট ৬৮টি আধুনিক ট্রেন এই রুটে চলাচলের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এই ট্রেনগুলো প্রতি ঘণ্টায় একমুখী যাতায়াতে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার যাত্রী বহন করতে পারবে এবং এদের গতিবেগ হবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলস্টমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই মনোরেল ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এটি চলাচলের সময় শব্দদূষণ প্রায় হয় না বললেই চলে এবং ট্রেন ব্রেক করার সময় যে শক্তির উৎপন্ন হয়, তার প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত আবার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এর ফলে যাতায়াতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও অপচয় অনেকটাই কমে যাবে। মিশর সরকার অত্যন্ত আশাবাদী যে, তাদের নবনির্মিত এই আধুনিক প্রশাসনিক রাজধানী ভবিষ্যতে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের স্থায়ী আবাসস্থল হয়ে উঠবে এবং সেখানে প্রায় ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আর সেই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কায়রোতে এমন বিশ্বমানের এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬
মিশরের রাজধানী কায়রো বিশ্বজুড়েই তার অতি পরিচিত ও তীব্র যানজটের জন্য দীর্ঘদিন ধরে বেশ ভোগান্তির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই প্রাচীন জনবহুল নগরীর ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমাতে এবং প্রশাসনিক কাজকে আরও গতিশীল করতে মিশর সরকার মরুভূমির বুকে গড়ে তুলছে সম্পূর্ণ নতুন এক প্রশাসনিক রাজধানী। সরকারের সেই মহতী উদ্যোগে এবার এক অভাবনীয় মাত্রা যোগ করেছে আফ্রিকার প্রথম চালকবিহীন মনোরেল নেটওয়ার্ক। অত্যাধুনিক প্রযুক্তির এই যাতায়াত ব্যবস্থা কায়রোর সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে তীব্র প্রত্যাশা জাগিয়েছে। সম্প্রতি গত মে মাসের ৬ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে কায়রো মনোরেলের পূর্ব নীল বা ইস্ট নাইল রুটটি। এটি আফ্রিকার ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় এবং চালকবিহীন একটি মনোরেল ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। প্রকল্পটির অধীনে থাকা দুটি রুট যখন পুরোপুরি চালু হবে, তখন এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম মনোরেল নেটওয়ার্কের গৌরব অর্জন করবে।
বর্তমানে চালু হওয়া এই পূর্ব নীল রুটটির দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে ৫৬ কিলোমিটার, যা কায়রোর নাসর সিটির আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম এলাকা থেকে শুরু করে একদম নতুন তৈরি হওয়া প্রশাসনিক রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত। এর পাশাপাশি আরেকটি রুট অর্থাৎ প্রায় ৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পশ্চিম নীল বা ওয়েস্ট নাইল রুটের নির্মাণকাজও এখন বেশ জোরেশোরে চলছে। এই দ্বিতীয় রুটটি চালু হলে সেটি ৬ অক্টোবর সিটি থেকে গিজা পর্যন্ত সরাসরি চমৎকার সংযোগ স্থাপন করবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, এই দুটি রুট যখন একসাথে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে, তখন পুরো নেটওয়ার্কটির মোট দৈর্ঘ্য গিয়ে দাঁড়াবে ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি। এর ফলে এটি বর্তমানে বিশ্বের দীর্ঘতম স্বীকৃত মনোরেল ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত চীনের চংকিং মনোরেলকেও দৈর্ঘ্যের দিক থেকে অনায়াসে ছাড়িয়ে যাবে। বিশাল এই আধুনিক নেটওয়ার্কটির প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী অত্যন্ত নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে পরিবহন করার মতো বিশাল সক্ষমতা রয়েছে।
মনোরেলটি উদ্বোধনের পর প্রথম তিন দিন সাধারণ যাত্রীরা একদম বিনামূল্যে ভ্রমণের এক দারুণ সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে অবশ্য যাতায়াতের সুবিধার জন্য চারটি জোনভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে পুরো পূর্ব নীল রুটে একবার ভ্রমণের জন্য একমুখী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৮০ মিশরীয় পাউন্ড। কায়রোতে আগে থেকেই বিদ্যমান তিনটি মেট্রো লাইন চালু রয়েছে, যা বছরে প্রায় ৫০ কোটি যাত্রী পরিবহন করে থাকে। কিন্তু ক্রমাগত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাপ সামাল দিতে ২০১৯ সালে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের একটি বিশাল চুক্তির মাধ্যমে এই নতুন মনোরেল প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। ফরাসি রেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলস্টমের নেতৃত্বে গঠিত একটি শক্তিশালী কনসোর্টিয়াম এই পুরো প্রকল্পটির নির্মাণ এবং পরবর্তীতে তা পরিচালনার বড় দায়িত্বটি পালন করছে।
ইংল্যান্ডের ডার্বি কারখানায় বিশেষভাবে তৈরি ২৭২টি মনোরেল কোচ নিয়ে মোট ৬৮টি আধুনিক ট্রেন এই রুটে চলাচলের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এই ট্রেনগুলো প্রতি ঘণ্টায় একমুখী যাতায়াতে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার যাত্রী বহন করতে পারবে এবং এদের গতিবেগ হবে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আলস্টমের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, এই মনোরেল ব্যবস্থাটি সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব। এটি চলাচলের সময় শব্দদূষণ প্রায় হয় না বললেই চলে এবং ট্রেন ব্রেক করার সময় যে শক্তির উৎপন্ন হয়, তার প্রায় ৯৯ শতাংশ পর্যন্ত আবার পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। এর ফলে যাতায়াতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা ও অপচয় অনেকটাই কমে যাবে। মিশর সরকার অত্যন্ত আশাবাদী যে, তাদের নবনির্মিত এই আধুনিক প্রশাসনিক রাজধানী ভবিষ্যতে প্রায় ৬৫ লাখ মানুষের স্থায়ী আবাসস্থল হয়ে উঠবে এবং সেখানে প্রায় ২০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আর সেই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যকে সামনে রেখেই কায়রোতে এমন বিশ্বমানের এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন