লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার জেরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি দুই নেতার মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি অত্যন্ত গোপন ও উত্তপ্ত ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নজিরবিহীনভাবে ক্ষোভে ফেটে পড়তে দেখা গেছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ফোনালাপে দুই নেতার মধ্যে বেশ কিছু অশালীন ও চরম আক্রমণাত্মক শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। দুইজন মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং এই কূটনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত তৃতীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র সংবাদমাধ্যমকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই ফোনালাপটি অনুষ্ঠিত হওয়ার ঠিক আগেই লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক ও নির্বিচার বিমান হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আমেরিকার সঙ্গে চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত হুমকি দিয়েছিল ইরান। উদ্ভূত এই চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি উন্মাদ বলে আখ্যায়িত করেন। ফোনালাপে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চরম অকৃতজ্ঞতার গুরুতর অভিযোগও তোলেন। একইসঙ্গে বৈরুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালানোর যে দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা ইসরায়েল গ্রহণ করেছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্টের তীব্র আপত্তির মুখে আপাতত তাতে শক্ত রাশ টানতে বাধ্য হয়েছে তেল আবিব।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোভাবের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, লেবাননের জনবহুল রাজধানীতে নতুন করে বোমাবর্ষণের অবাস্তব হুমকি বাস্তবায়ন করলে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েল সম্পূর্ণভাবে বন্ধুহীন ও একঘরে হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন যে, মার্কিন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সমর্থনের কারণেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এখনও জেলের বাইরে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মূলত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অতীতে দায়ের হওয়া একাধিক হাই-প্রোফাইল দুর্নীতি মামলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প যেভাবে তাকে ঢাল হয়ে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন, সেই রাজনৈতিক সমর্থনের দিকেই তিনি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন।
ফোনালাপে নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের মূল সারসংক্ষেপ এতটাই কঠোর ছিল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি চরম উন্মাদনার পরিচয় দিচ্ছেন। ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন সমর্থন না থাকলে নেতানিয়াহুকে এতদিনে দুর্নীতির দায়ে কারাগারে পচতে হতো এবং আমেরিকার কারণেই তিনি বারবার রক্ষা পাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রায় সবাই নেতানিয়াহুকে তীব্র ঘৃণা করে এবং তার এই আগ্রাসী নীতির কারণে এখন গোটা ইসরায়েল রাষ্ট্রও বিশ্ববাসীর কাছে চরম ঘৃণার পাত্রে পরিণত হচ্ছে। এই ফোনালাপের বিষয়ে অবগত দ্বিতীয় আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে এতটাই ত্যক্তবিরক্ত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, একপর্যায়ে তিনি নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড চিৎকার করে জানতে চান যে তিনি আসলে কী করতে চাচ্ছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের মনে হয়েছে যে নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মাত্রাতিরিক্ত এবং সম্পূর্ণ অহেতুক সামরিক আগ্রাসন দেখিয়ে চলেছেন।
বর্তমানে বৈরুতে হামলার প্রকাশ্য হুমকির পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্থল-অভিযানও ক্রমশ সম্প্রসারিত করছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য একজন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় বিপুলসংখ্যক সাধারণ ও নিরপরাধ নাগরিকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে হিজবুল্লাহর মাত্র একজন কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করে পুরো একটি বহুতল আবাসিক ভবন ধূলিসাৎ করে দেওয়ার যে ইসরায়েলি নিষ্ঠুর সামরিক কৌশল, তার তীব্র ও প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মার্কিন প্রশাসনের এই প্রচণ্ড চাপের মুখে ইসরায়েলের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন যে, বৈরুতে হিজবুল্লাহর মূল ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানোর যে পূর্বপরিকল্পনা ছিল, তা আপাতত স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে ইসরায়েল।
যদিও অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে বেশ কয়েকবার উত্তপ্ত ফোনালাপ এবং মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছে, তবুও ইরানসহ একাধিক আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে তারা সবসময় পরস্পরের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেই কাজ সম্পন্ন করেছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিক দায়িত্ব নেওয়ার পর নেতানিয়াহুর সঙ্গে এটিই ছিল তার প্রশাসনের অন্যতম দীর্ঘ ও তিক্ততম ফোনালাপ। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও তীব্র ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, হোয়াইট হাউসকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে লেবাননে আগ্রাসন বাড়ানোর বিষয়ে নেতানিয়াহুর সম্পূর্ণ একতরফা ও হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। যার ফলশ্রুতিতে ইরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আমেরিকার চলমান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি একটি কূটনৈতিক আলোচনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অবশ্য এই তিক্ত ফোনালাপের পরপরই ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ইতিবাচক বার্তা পোস্ট করে লেখেন যে, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এবং সঠিক দিশায় এগিয়ে চলেছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ শেষ হওয়ার পর জলঘোলা করতে নেতানিয়াহু নিজের দেশে একটি দায়সারা বিবৃতি জারি করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন যে, তিনি ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ যদি ইসরায়েলের মাটিতে রকেট ও ড্রোন হামলা বন্ধ না করে, তবে বৈরুতে তাদের মূল ঘাঁটিতে সর্বাত্মক আক্রমণ চালাবে ইসরায়েল। সেইসঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে তাদের চলমান সামরিক স্থল অভিযানও কোনো বাধা ছাড়াই অব্যাহত থাকবে। বিবৃতিতে নেতানিয়াহু অহংকার করে লেখেন যে, যুদ্ধ নিয়ে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থানে কোনো ধরনের বদল বা আপস হয়নি। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা জানিয়েছেন, বাস্তবে ওই ফোনালাপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রবল ও প্রচণ্ড চাপের মুখে পুরোপুরি নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন কর্মকর্তা উপহাসের ছলে জানান, ট্রাম্পের ধমক শুনে নেতানিয়াহু কেবল মিনমিন করে বলেছিলেন যে, সবদিক যেন ঠিকঠাক সামলে নেওয়া হয়, তিনি বিষয়টি দেখছেন। এই স্পর্শকাতর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্যের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও স্বভাবসুলভভাবেই তারা কোনো সাড়া দেয়নি। কূটনৈতিক সূত্রমতে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, তার অন্যতম প্রধান ও অপরিবর্তনীয় শর্তই হলো লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা, যা ইসরায়েল বারবার লঙ্ঘন করতে চাইছে।
মূল উৎস (Original Source): অ্যাক্সিওস (Axios)।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক আগ্রাসন ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার জেরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি দুই নেতার মধ্যে অনুষ্ঠিত একটি অত্যন্ত গোপন ও উত্তপ্ত ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নজিরবিহীনভাবে ক্ষোভে ফেটে পড়তে দেখা গেছে। অত্যন্ত সংবেদনশীল এই ফোনালাপে দুই নেতার মধ্যে বেশ কিছু অশালীন ও চরম আক্রমণাত্মক শব্দও ব্যবহৃত হয়েছে বলে জানা গেছে। দুইজন মার্কিন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং এই কূটনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়টি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত তৃতীয় একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র সংবাদমাধ্যমকে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই ফোনালাপটি অনুষ্ঠিত হওয়ার ঠিক আগেই লেবাননে ইসরায়েলের ধারাবাহিক ও নির্বিচার বিমান হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আমেরিকার সঙ্গে চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত হুমকি দিয়েছিল ইরান। উদ্ভূত এই চরম উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি উন্মাদ বলে আখ্যায়িত করেন। ফোনালাপে ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে চরম অকৃতজ্ঞতার গুরুতর অভিযোগও তোলেন। একইসঙ্গে বৈরুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালানোর যে দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক পরিকল্পনা ইসরায়েল গ্রহণ করেছিল, মার্কিন প্রেসিডেন্টের তীব্র আপত্তির মুখে আপাতত তাতে শক্ত রাশ টানতে বাধ্য হয়েছে তেল আবিব।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মনোভাবের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়ে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, লেবাননের জনবহুল রাজধানীতে নতুন করে বোমাবর্ষণের অবাস্তব হুমকি বাস্তবায়ন করলে আন্তর্জাতিক মহলে ইসরায়েল সম্পূর্ণভাবে বন্ধুহীন ও একঘরে হয়ে পড়বে। শুধু তাই নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেন যে, মার্কিন প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সাহায্য ও সমর্থনের কারণেই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এখনও জেলের বাইরে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মূলত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অতীতে দায়ের হওয়া একাধিক হাই-প্রোফাইল দুর্নীতি মামলার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প যেভাবে তাকে ঢাল হয়ে বুক দিয়ে আগলে রেখেছিলেন, সেই রাজনৈতিক সমর্থনের দিকেই তিনি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন।
ফোনালাপে নেতানিয়াহুর প্রতি ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের মূল সারসংক্ষেপ এতটাই কঠোর ছিল যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাকে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, তিনি চরম উন্মাদনার পরিচয় দিচ্ছেন। ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন সমর্থন না থাকলে নেতানিয়াহুকে এতদিনে দুর্নীতির দায়ে কারাগারে পচতে হতো এবং আমেরিকার কারণেই তিনি বারবার রক্ষা পাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রায় সবাই নেতানিয়াহুকে তীব্র ঘৃণা করে এবং তার এই আগ্রাসী নীতির কারণে এখন গোটা ইসরায়েল রাষ্ট্রও বিশ্ববাসীর কাছে চরম ঘৃণার পাত্রে পরিণত হচ্ছে। এই ফোনালাপের বিষয়ে অবগত দ্বিতীয় আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডে এতটাই ত্যক্তবিরক্ত ও ক্ষুব্ধ ছিলেন যে, একপর্যায়ে তিনি নেতানিয়াহুর ওপর প্রচণ্ড চিৎকার করে জানতে চান যে তিনি আসলে কী করতে চাচ্ছেন। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের মনে হয়েছে যে নেতানিয়াহু নিজের রাজনৈতিক স্বার্থে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মাত্রাতিরিক্ত এবং সম্পূর্ণ অহেতুক সামরিক আগ্রাসন দেখিয়ে চলেছেন।
বর্তমানে বৈরুতে হামলার প্রকাশ্য হুমকির পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে স্থল-অভিযানও ক্রমশ সম্প্রসারিত করছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী। এই বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অন্য একজন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় বিপুলসংখ্যক সাধারণ ও নিরপরাধ নাগরিকের মর্মান্তিক মৃত্যুতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এবং ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে হিজবুল্লাহর মাত্র একজন কমান্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করে পুরো একটি বহুতল আবাসিক ভবন ধূলিসাৎ করে দেওয়ার যে ইসরায়েলি নিষ্ঠুর সামরিক কৌশল, তার তীব্র ও প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। মার্কিন প্রশাসনের এই প্রচণ্ড চাপের মুখে ইসরায়েলের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন যে, বৈরুতে হিজবুল্লাহর মূল ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানোর যে পূর্বপরিকল্পনা ছিল, তা আপাতত স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে ইসরায়েল।
যদিও অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে বেশ কয়েকবার উত্তপ্ত ফোনালাপ এবং মতবিরোধের ঘটনা ঘটেছে, তবুও ইরানসহ একাধিক আন্তর্জাতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ইস্যুতে তারা সবসময় পরস্পরের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেই কাজ সম্পন্ন করেছেন। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে মার্কিন প্রেসিডেন্টের ঐতিহাসিক দায়িত্ব নেওয়ার পর নেতানিয়াহুর সঙ্গে এটিই ছিল তার প্রশাসনের অন্যতম দীর্ঘ ও তিক্ততম ফোনালাপ। ট্রাম্পের এই আকস্মিক ও তীব্র ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল, হোয়াইট হাউসকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে লেবাননে আগ্রাসন বাড়ানোর বিষয়ে নেতানিয়াহুর সম্পূর্ণ একতরফা ও হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ। যার ফলশ্রুতিতে ইরানের সঙ্গে পর্দার আড়ালে আমেরিকার চলমান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি একটি কূটনৈতিক আলোচনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। অবশ্য এই তিক্ত ফোনালাপের পরপরই ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ইতিবাচক বার্তা পোস্ট করে লেখেন যে, ইরানের সঙ্গে ওয়াশিংটনের আলোচনা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে এবং সঠিক দিশায় এগিয়ে চলেছে।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ শেষ হওয়ার পর জলঘোলা করতে নেতানিয়াহু নিজের দেশে একটি দায়সারা বিবৃতি জারি করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন যে, তিনি ট্রাম্পকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহ যদি ইসরায়েলের মাটিতে রকেট ও ড্রোন হামলা বন্ধ না করে, তবে বৈরুতে তাদের মূল ঘাঁটিতে সর্বাত্মক আক্রমণ চালাবে ইসরায়েল। সেইসঙ্গে দক্ষিণ লেবাননে তাদের চলমান সামরিক স্থল অভিযানও কোনো বাধা ছাড়াই অব্যাহত থাকবে। বিবৃতিতে নেতানিয়াহু অহংকার করে লেখেন যে, যুদ্ধ নিয়ে তাদের পূর্ববর্তী অবস্থানে কোনো ধরনের বদল বা আপস হয়নি। কিন্তু মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা জানিয়েছেন, বাস্তবে ওই ফোনালাপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রবল ও প্রচণ্ড চাপের মুখে পুরোপুরি নতিস্বীকার করতে বাধ্য হন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। মার্কিন কর্মকর্তা উপহাসের ছলে জানান, ট্রাম্পের ধমক শুনে নেতানিয়াহু কেবল মিনমিন করে বলেছিলেন যে, সবদিক যেন ঠিকঠাক সামলে নেওয়া হয়, তিনি বিষয়টি দেখছেন। এই স্পর্শকাতর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্যের জন্য ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও স্বভাবসুলভভাবেই তারা কোনো সাড়া দেয়নি। কূটনৈতিক সূত্রমতে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যে ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনা চলছে, তার অন্যতম প্রধান ও অপরিবর্তনীয় শর্তই হলো লেবাননে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা, যা ইসরায়েল বারবার লঙ্ঘন করতে চাইছে।
মূল উৎস (Original Source): অ্যাক্সিওস (Axios)।

আপনার মতামত লিখুন