দিকপাল

অনলাইন ফাঁদে ভয়াবহ ‘পটাশ-চিনি বার্ন’, বাড়ছে অঙ্গহানির ঘটনা


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬ | ০২:১৮ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

অনলাইন ফাঁদে ভয়াবহ ‘পটাশ-চিনি বার্ন’, বাড়ছে অঙ্গহানির ঘটনা

আমাদের সমাজে অন্ধবিশ্বাস ও মানসিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে প্রতারণার এক ভয়ঙ্কর জাল বিস্তার করেছে একদল ভণ্ড হুজুর, কবিরাজ ও তান্ত্রিক। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের চিকিৎসা অঙ্গনে, বিশেষ করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এমন কিছু অদ্ভুত ও লোমহর্ষক কেস আসছে, যা চিকিৎসকদেরও রীতিমতো স্তম্ভিত করে দিয়েছে। গত প্রায় এক বছর ধরে এমন অসংখ্য রোগী হাসপাতালে আসছেন, যাদের হাতের তালু কেমিক্যাল বার্ন বা রাসায়নিক পদার্থে মারাত্মকভাবে ঝলসে গেছে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই ভুক্তভোগীদের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশই তরুণী ও যুবতী, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ঢাকা ছাড়াও খুলনা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটগুলোতেও একই ধরনের দগ্ধ রোগী পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।


হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এই রোগীরা প্রথমে আসল ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করেন। পারিবারিক লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে তারা বলেন যে, ভাতের মাড় গালতে গিয়ে কিংবা রান্নাঘরের গরম ডাল ও পানি পড়ে হাত পুড়ে গেছে। কিন্তু অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা ক্ষত দেখেই বুঝতে পারেন এটি সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়। গৃহস্থালির সাধারণ পোড়ায় ত্বকে ফোসকা পড়ে এবং ক্ষত ছড়ানো থাকে। কিন্তু এই রোগীদের ক্ষেত্রে ক্ষতস্থানটি সুনির্দিষ্টভাবে কেবল হাতের তালুর ভেতরেই সীমাবদ্ধ এবং তা অত্যন্ত গভীর, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ডিপ বার্ন বলা হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসকেরা যখন ভুক্তভোগীদের আশ্বস্ত করে আলাদাভাবে গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, তখন বেরিয়ে আসে এক চরম সত্য। জানা যায়, এরা প্রত্যেকেই একশ্রেণির অনলাইনভিত্তিক প্রতারক চক্রের ব্ল্যাকমেইল ও অন্ধবিশ্বাসের শিকার হয়েছেন।


ভুক্তভোগীদের জীবনের গল্পগুলো প্রায় একই সুতোয় গাঁথা। কেউ পারিবারিক কলহ, কেউ বিবাহবিচ্ছেদ, কেউ দীর্ঘদিনের একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা, আবার কেউ ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ভণ্ড সাধু, হুজুর বা কবিরাজদের শরণাপন্ন হন। এই প্রতারকেরা ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চালায়। তারা শুরুতে কোনো টাকা দাবি না করে পনেরো বা বিশ মিনিটে সব সমস্যার সমাধানের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে। এরপর তাদের মূল ফাঁদ শুরু হয়।


এই তান্ত্রিকেরা ভুক্তভোগীদের বাজার থেকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট নামের একটি রাসায়নিক গুঁড়ো কিনতে বলে, যা সাধারণত ফার্মেসিতে জীবাণুনাশক হিসেবে বিক্রি হয়। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবলই পটাশ নামে পরিচিত। এরপর রাত দুপুরে জায়নামাজে বসে বা ঘরে একা থাকার সুযোগে ভিডিও কলে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতারকেরা কৌশলে নিজেদের মুখ লুকিয়ে রাখে এবং ভুক্তভোগীদের শুধু হাতের তালুর দিকে ক্যামেরা ধরে রাখতে বলে। এরপর পটাশের গুঁড়োর সাথে চিনি বা মিষ্টির রস মিশিয়ে হাতের তালুতে নিয়ে শক্ত করে মুঠো করে চেপে ধরে রাখতে বলা হয়।


বিজ্ঞান অনুযায়ী, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট হলো একটি তীব্র জারক পদার্থ এবং চিনি হলো বিজারক। এই দুটি শুকনো উপাদান যখন একসাথে মিশিয়ে সামান্য চাপ বা ঘর্ষণ দেওয়া হয়, তখন সেখানে মুহূর্তের মধ্যে একটি তীব্র জারণ-বিজারণ রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এর ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচণ্ড তাপ, আগুন ও ধোঁয়া উৎপন্ন হয়। হাতের মুঠোয় থাকা এই মিশ্রণটি যখন জ্বলতে শুরু করে, তখন ভুক্তভোগীরা তীব্র ব্যথায় চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে ভণ্ড হুজুর বা কবিরাজেরা ভয় দেখাতে শুরু করে যে, হাত ছেড়ে দিলে ভয়ঙ্কর বিপদ হবে, জিনের রাগে পরিবারের সদস্য বা মা মারা যাবে। অলৌকিক শক্তির ভয়ে এবং কাজ সফল হওয়ার আশায় অনেকেই তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে হাত মুঠো করে রাখেন। ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের এই সামান্য সময়ই হাতের চামড়া ও মাংস সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।


হাত ঝলসে যাওয়ার এই চরম মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় প্রতারকদের আসল খেলা। তারা দাবি করে যে, জিন বা দেবী রাগ করেছেন এবং তাদের শান্ত করতে অবিলম্বে বিকাশের মাধ্যমে এক মণ বা দুই মণ মিষ্টির টাকা পাঠাতে হবে। অনেকেই হাতের অসহ্য যন্ত্রণায় এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার আশায় হাজার হাজার টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন। কোনো কোনো ভুক্তভোগী পরিবারকে না জানিয়ে ধাপে ধাপে লাখ টাকা পর্যন্ত এই চক্রের হাতে তুলে দিয়েছেন। কাজ হাসিল হয়ে গেলে বা ভুক্তভোগী বুঝতে পেরে চাপ দিলে প্রতারকেরা দ্রুত তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ করে দেয় এবং নতুন নম্বরে অন্য কাউকে শিকার বানায়।


রাসায়নিকের এই তীব্র আগুনে হাতের তালুর পুরু চামড়ার নিচের চর্বি, মাংসপেশি, রক্তনালী এবং স্নায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় ক্ষত এতটাই গভীরে পৌঁছায় যে তা হাড় পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেলে, যা চতুর্থ ডিগ্রির পোড়া হিসেবে পরিচিত। এই ধরনের গভীর ক্ষতের কারণে রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে হাত অকেজো হয়ে যায় এবং অনেক সময় জীবন বাঁচাতে পুরো হাত কেটেও ফেলতে হয়। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে এই ধরনের রোগীদের সুস্থ করতে প্লাস্টিক সার্জারির একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে পেটের চামড়া ও টিস্যুর সাথে হাতটিকে সাময়িকভাবে জুড়ে দিয়ে নতুন চামড়া গজানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই পুরো চিকিৎসা ও থেরাপি প্রক্রিয়া শেষ হতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লেগে যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার পরেও এই হাতগুলো আর কখনোই আগের মতো স্বাভাবিক বা সুন্দর হয় না, এগুলোকে কেবল কোনোমতে কাজকর্ম করার উপযোগী করে তোলা সম্ভব হয়।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চক্রের শিকার বেশিরভাগই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তীব্র মানসিক ও আবেগীয় সংকটের মুহূর্তে তারা সাধারণ বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেন। দ্রুত সমস্যা সমাধানের শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে গিয়ে তারা জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি ডেকে আনছেন। চিকিৎসকেরা ও সচেতন মহল বারবার সতর্ক করছেন যে, ধর্মীয় বা অলৌকিকতার নামে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা এসব ফাঁদ থেকে সবাইকে দূরে থাকতে হবে এবং যেকোনো মানসিক সংকটে কবিরাজের কাছে না গিয়ে পেশাদার কাউন্সিলিং ও পরিবারের সহায়তা নেওয়া জরুরি।

 

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


অনলাইন ফাঁদে ভয়াবহ ‘পটাশ-চিনি বার্ন’, বাড়ছে অঙ্গহানির ঘটনা

প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

featured Image

আমাদের সমাজে অন্ধবিশ্বাস ও মানসিক দুর্বলতাকে পুঁজি করে প্রতারণার এক ভয়ঙ্কর জাল বিস্তার করেছে একদল ভণ্ড হুজুর, কবিরাজ ও তান্ত্রিক। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের চিকিৎসা অঙ্গনে, বিশেষ করে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে এমন কিছু অদ্ভুত ও লোমহর্ষক কেস আসছে, যা চিকিৎসকদেরও রীতিমতো স্তম্ভিত করে দিয়েছে। গত প্রায় এক বছর ধরে এমন অসংখ্য রোগী হাসপাতালে আসছেন, যাদের হাতের তালু কেমিক্যাল বার্ন বা রাসায়নিক পদার্থে মারাত্মকভাবে ঝলসে গেছে। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই ভুক্তভোগীদের প্রায় পঁচানব্বই শতাংশই তরুণী ও যুবতী, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। ঢাকা ছাড়াও খুলনা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটগুলোতেও একই ধরনের দগ্ধ রোগী পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।


হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এই রোগীরা প্রথমে আসল ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করেন। পারিবারিক লোকলজ্জা বা ভয়ের কারণে তারা বলেন যে, ভাতের মাড় গালতে গিয়ে কিংবা রান্নাঘরের গরম ডাল ও পানি পড়ে হাত পুড়ে গেছে। কিন্তু অভিজ্ঞ চিকিৎসকেরা ক্ষত দেখেই বুঝতে পারেন এটি সাধারণ কোনো দুর্ঘটনা নয়। গৃহস্থালির সাধারণ পোড়ায় ত্বকে ফোসকা পড়ে এবং ক্ষত ছড়ানো থাকে। কিন্তু এই রোগীদের ক্ষেত্রে ক্ষতস্থানটি সুনির্দিষ্টভাবে কেবল হাতের তালুর ভেতরেই সীমাবদ্ধ এবং তা অত্যন্ত গভীর, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ডিপ বার্ন বলা হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসকেরা যখন ভুক্তভোগীদের আশ্বস্ত করে আলাদাভাবে গোপনে জিজ্ঞাসাবাদ করেন, তখন বেরিয়ে আসে এক চরম সত্য। জানা যায়, এরা প্রত্যেকেই একশ্রেণির অনলাইনভিত্তিক প্রতারক চক্রের ব্ল্যাকমেইল ও অন্ধবিশ্বাসের শিকার হয়েছেন।


ভুক্তভোগীদের জীবনের গল্পগুলো প্রায় একই সুতোয় গাঁথা। কেউ পারিবারিক কলহ, কেউ বিবাহবিচ্ছেদ, কেউ দীর্ঘদিনের একাকীত্ব ও বিষণ্ণতা, আবার কেউ ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার তীব্র ব্যাকুলতা থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এসব ভণ্ড সাধু, হুজুর বা কবিরাজদের শরণাপন্ন হন। এই প্রতারকেরা ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিজেদের অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চালায়। তারা শুরুতে কোনো টাকা দাবি না করে পনেরো বা বিশ মিনিটে সব সমস্যার সমাধানের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে মানুষের বিশ্বাস অর্জন করে। এরপর তাদের মূল ফাঁদ শুরু হয়।


এই তান্ত্রিকেরা ভুক্তভোগীদের বাজার থেকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট নামের একটি রাসায়নিক গুঁড়ো কিনতে বলে, যা সাধারণত ফার্মেসিতে জীবাণুনাশক হিসেবে বিক্রি হয়। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবলই পটাশ নামে পরিচিত। এরপর রাত দুপুরে জায়নামাজে বসে বা ঘরে একা থাকার সুযোগে ভিডিও কলে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রতারকেরা কৌশলে নিজেদের মুখ লুকিয়ে রাখে এবং ভুক্তভোগীদের শুধু হাতের তালুর দিকে ক্যামেরা ধরে রাখতে বলে। এরপর পটাশের গুঁড়োর সাথে চিনি বা মিষ্টির রস মিশিয়ে হাতের তালুতে নিয়ে শক্ত করে মুঠো করে চেপে ধরে রাখতে বলা হয়।


বিজ্ঞান অনুযায়ী, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট হলো একটি তীব্র জারক পদার্থ এবং চিনি হলো বিজারক। এই দুটি শুকনো উপাদান যখন একসাথে মিশিয়ে সামান্য চাপ বা ঘর্ষণ দেওয়া হয়, তখন সেখানে মুহূর্তের মধ্যে একটি তীব্র জারণ-বিজারণ রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। এর ফলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচণ্ড তাপ, আগুন ও ধোঁয়া উৎপন্ন হয়। হাতের মুঠোয় থাকা এই মিশ্রণটি যখন জ্বলতে শুরু করে, তখন ভুক্তভোগীরা তীব্র ব্যথায় চিৎকার করে ওঠেন। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে ভণ্ড হুজুর বা কবিরাজেরা ভয় দেখাতে শুরু করে যে, হাত ছেড়ে দিলে ভয়ঙ্কর বিপদ হবে, জিনের রাগে পরিবারের সদস্য বা মা মারা যাবে। অলৌকিক শক্তির ভয়ে এবং কাজ সফল হওয়ার আশায় অনেকেই তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করে হাত মুঠো করে রাখেন। ৩০ থেকে ৬০ সেকেন্ডের এই সামান্য সময়ই হাতের চামড়া ও মাংস সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।


হাত ঝলসে যাওয়ার এই চরম মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় প্রতারকদের আসল খেলা। তারা দাবি করে যে, জিন বা দেবী রাগ করেছেন এবং তাদের শান্ত করতে অবিলম্বে বিকাশের মাধ্যমে এক মণ বা দুই মণ মিষ্টির টাকা পাঠাতে হবে। অনেকেই হাতের অসহ্য যন্ত্রণায় এবং দ্রুত সুস্থ হওয়ার আশায় হাজার হাজার টাকা তাদের অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দেন। কোনো কোনো ভুক্তভোগী পরিবারকে না জানিয়ে ধাপে ধাপে লাখ টাকা পর্যন্ত এই চক্রের হাতে তুলে দিয়েছেন। কাজ হাসিল হয়ে গেলে বা ভুক্তভোগী বুঝতে পেরে চাপ দিলে প্রতারকেরা দ্রুত তাদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ করে দেয় এবং নতুন নম্বরে অন্য কাউকে শিকার বানায়।


রাসায়নিকের এই তীব্র আগুনে হাতের তালুর পুরু চামড়ার নিচের চর্বি, মাংসপেশি, রক্তনালী এবং স্নায়ু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় ক্ষত এতটাই গভীরে পৌঁছায় যে তা হাড় পর্যন্ত পুড়িয়ে ফেলে, যা চতুর্থ ডিগ্রির পোড়া হিসেবে পরিচিত। এই ধরনের গভীর ক্ষতের কারণে রক্তনালীতে রক্ত জমাট বেঁধে হাত অকেজো হয়ে যায় এবং অনেক সময় জীবন বাঁচাতে পুরো হাত কেটেও ফেলতে হয়। জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে এই ধরনের রোগীদের সুস্থ করতে প্লাস্টিক সার্জারির একটি বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, যেখানে পেটের চামড়া ও টিস্যুর সাথে হাতটিকে সাময়িকভাবে জুড়ে দিয়ে নতুন চামড়া গজানোর ব্যবস্থা করা হয়। এই পুরো চিকিৎসা ও থেরাপি প্রক্রিয়া শেষ হতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লেগে যায়। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার পরেও এই হাতগুলো আর কখনোই আগের মতো স্বাভাবিক বা সুন্দর হয় না, এগুলোকে কেবল কোনোমতে কাজকর্ম করার উপযোগী করে তোলা সম্ভব হয়।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই চক্রের শিকার বেশিরভাগই নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তীব্র মানসিক ও আবেগীয় সংকটের মুহূর্তে তারা সাধারণ বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেন। দ্রুত সমস্যা সমাধানের শর্টকাট রাস্তা খুঁজতে গিয়ে তারা জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি ডেকে আনছেন। চিকিৎসকেরা ও সচেতন মহল বারবার সতর্ক করছেন যে, ধর্মীয় বা অলৌকিকতার নামে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে থাকা এসব ফাঁদ থেকে সবাইকে দূরে থাকতে হবে এবং যেকোনো মানসিক সংকটে কবিরাজের কাছে না গিয়ে পেশাদার কাউন্সিলিং ও পরিবারের সহায়তা নেওয়া জরুরি।

 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল