মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা দিয়ে লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি বিশেষ শান্তি প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি প্রকাশ করেছে বলে নিশ্চিত করেছে লেবানন সরকার। নতুন এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও প্রস্তাবের মূল শর্ত অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ এখন থেকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বা তাদের সীমানার ওপর সব ধরনের রকেট ও ড্রোন হামলা চালানো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখবে এবং এর বিপরীতে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীও লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ওপর কোনো ধরনের সামরিক অভিযান বা আকাশপথে বোমাবর্ষণ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এই মার্কিন প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে গ্রহণের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হয়েছে।
অন্য দিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত এই গোপন সমঝোতার কথা স্বীকার ও নিশ্চিত করেছেন। তবে বরাবরের মতোই নিজের আক্রমণাত্মক মনোভাব বজায় রেখে তিনি হিজবুল্লাহকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, যদি এই চুক্তির বাইরে গিয়ে হিজবুল্লাহ পুনরায় ইসরায়েলের কোনো শহর, জনপদ কিংবা বেসামরিক সাধারণ মানুষের ওপর উসকানিমূলক হামলা চালানো বন্ধ না করে, তবে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে আবারও যেকোনো মুহূর্তে এর চেয়েও বিধ্বংসী ও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। এই যুদ্ধবিরতির পটভূমি তৈরি করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি জানান যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী উত্তেজনা নিরসনে তিনি নিজে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং হিজবুল্লাহর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন এবং উভয় পক্ষই আপাতত নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি ও হামলা-পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে।
সোমবার রাতে দেওয়া এক বিশেষ কূটনৈতিক বিবৃতিতে ওয়াশিংটনে অবস্থিত লেবাননের দূতাবাস স্পষ্ট করে জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই শান্তি প্রস্তাবটি কার্যকর হওয়ার ফলে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে এতদিন ধরে চলা ইসরায়েলের ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। আর এর সুনির্দিষ্ট বিনিময় হিসেবে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে কোনো ধরনের সমরাস্ত্র ব্যবহার করবে না। আন্তর্জাতিক এই যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক লক্ষ্য বৈরুতকেন্দ্রিক হলেও, পরবর্তী সময়ে এই বিশেষ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে পুরো লেবাননজুড়ে সার্বিকভাবে কার্যকর করার একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কাগজে-কলমে এই বড় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও, মাঠপর্যায়ে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা এবং ক্ষোভ পুরোপুরি স্তিমিত হয়ে যায়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতার মধ্যেই নতুন বিতর্ক উসকে দিয়ে বলেছেন, বৈরুতে হামলা বন্ধ থাকলেও একই সাথে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকায় স্থল অভিযান ও বিশেষ সামরিক তৎপরতা নিয়মিত চালিয়ে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হয়েছে বলে বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করার পরও সীমান্তের কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা উত্তর ইসরায়েলের দুটি কৌশলগত গ্রামের কাছে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলি সাঁজোয়া ট্যাংক ও পদাতিক সেনাদের লক্ষ্য করে কামানের গোলা এবং বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন ব্যবহার করে তিনটি সফল ও বড় ধরনের পাল্টা হামলা চালিয়েছে। অপর দিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, লেবাননের দিক থেকে ধেয়ে আসা দুটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঝ আকাশেই সফলভাবে ধ্বংস ও ভূপাতিত করেছেন, যার ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রত্যন্ত এলাকায় নতুন করে ইসরায়েলি বাহিনীর কামানের গোলা ও বিমান হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে ডেববিন নামক একটি সীমান্ত শহরে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বড় ধরনের একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো এলাকায় তীব্র কম্পনের সৃষ্টি করে। মূলত এর আগে হিজবুল্লাহর আকস্মিক রকেট ও ড্রোন হামলার কঠোর জবাব দিতেই বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরের বিভিন্ন ‘সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুতে’ নতুন করে বিমান হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। লেবানন সীমান্তের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের আরেক পরাশক্তি ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা একের পর এক কঠোর কূটনৈতিক সতর্কবার্তা জারি করছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক কড়া বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের সব ফ্রন্টের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট ফ্রন্টে যদি এই যুদ্ধবিরতি কোনো পক্ষ সামান্যতম লঙ্ঘন করে, তবে তা সামগ্রিকভাবে সব ফ্রন্টের যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের শামিল হিসেবেই গণ্য হবে।
এদিকে ইরানের আধাসরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা তেহরানের উচ্চপর্যায়ের সূত্র উল্লেখ করে জানিয়েছে, লেবাননে যদি ইসরায়েলের এই বেআইনি সামরিক কর্মকাণ্ড ও আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তবে তেহরান প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ওমানে চলমান তাদের পরোক্ষ আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে স্থগিত বা পরিহার করতে পারে। সংস্থাটি আরও বিপজ্জনক ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে যে, ইরান এবং তার আঞ্চলিক প্রতিরোধ যোদ্ধারা প্রয়োজনে ইসরায়েলকে কাবু করতে সম্পূর্ণ নতুন ফ্রন্ট বা যুদ্ধের ময়দান সক্রিয় করতে পারে, যার মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পূর্ণ উল্টো দাবি করে বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে তাদের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। একই সাথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার সার্বক্ষণিক ফলপ্রসূ যোগাযোগ হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে বৈরুতের মূল ভূখণ্ডে আর কোনো নতুন ইসরায়েলি সেনা পাঠানো হবে না এবং ইতিমধ্যেই যেসব সেনা সেখানে যাওয়ার পথে অগ্রগামী ছিল, তাদেরও মাঝপথ থেকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, উচ্চ পর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও তার প্রশাসনের অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং হিজবুল্লাহ সব ধরনের উসকানিমূলক গুলি ও রকেট হামলা বন্ধ রাখতে পুরোপুরি সম্মত হয়েছে। একইভাবে ইসরায়েলও তাদের ওপর আকাশপথের হামলা থেকে বিরত থাকবে। মার্কিন প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লেবাননে চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং উত্তেজনা প্রশমনের একটি বিশেষ খসড়া প্রস্তাব ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের কাছে সরাসরি হস্তান্তর করেছেন। গত ১৬ এপ্রিল ইসরায়েল-লেবানন আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী চুক্তি লঙ্ঘন করে দুইবার বৈরুতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল, যার সর্বশেষটি ঘটেছিল গত বৃহস্পতিবার। তবে মার্কিন চাপের কারণে আগের তুলনায় বর্তমানে হামলার তীব্রতা অনেকটাই কমে এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে একটি বৃহত্তর ও স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর অংশ হিসেবেই মূলত হোয়াইট হাউস বর্তমানে ইসরায়েলের ওপর বৈরুতে তাদের সামরিক অভিযান সীমিত রাখার জন্য নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা দিয়ে লেবাননের শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিজবুল্লাহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া একটি বিশেষ শান্তি প্রস্তাবে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মতি প্রকাশ করেছে বলে নিশ্চিত করেছে লেবানন সরকার। নতুন এই দ্বিপাক্ষিক সমঝোতা ও প্রস্তাবের মূল শর্ত অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ এখন থেকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে বা তাদের সীমানার ওপর সব ধরনের রকেট ও ড্রোন হামলা চালানো সম্পূর্ণ বন্ধ রাখবে এবং এর বিপরীতে ইসরায়েলি বিমান বাহিনীও লেবাননের রাজধানী বৈরুতের ওপর কোনো ধরনের সামরিক অভিযান বা আকাশপথে বোমাবর্ষণ করবে না। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত লেবাননের দূতাবাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা হিজবুল্লাহর নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে এই মার্কিন প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে গ্রহণের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে নিশ্চিত হয়েছে।
অন্য দিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত এই গোপন সমঝোতার কথা স্বীকার ও নিশ্চিত করেছেন। তবে বরাবরের মতোই নিজের আক্রমণাত্মক মনোভাব বজায় রেখে তিনি হিজবুল্লাহকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, যদি এই চুক্তির বাইরে গিয়ে হিজবুল্লাহ পুনরায় ইসরায়েলের কোনো শহর, জনপদ কিংবা বেসামরিক সাধারণ মানুষের ওপর উসকানিমূলক হামলা চালানো বন্ধ না করে, তবে লেবাননের রাজধানী বৈরুতে আবারও যেকোনো মুহূর্তে এর চেয়েও বিধ্বংসী ও ভয়াবহ হামলা চালানো হবে। এই যুদ্ধবিরতির পটভূমি তৈরি করার ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি জানান যে, মধ্যপ্রাচ্যের এই রক্তক্ষয়ী উত্তেজনা নিরসনে তিনি নিজে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং হিজবুল্লাহর শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেছেন এবং উভয় পক্ষই আপাতত নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি ও হামলা-পাল্টা হামলা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে নীতিগতভাবে রাজি হয়েছে।
সোমবার রাতে দেওয়া এক বিশেষ কূটনৈতিক বিবৃতিতে ওয়াশিংটনে অবস্থিত লেবাননের দূতাবাস স্পষ্ট করে জানায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই শান্তি প্রস্তাবটি কার্যকর হওয়ার ফলে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে এতদিন ধরে চলা ইসরায়েলের ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক বিমান হামলা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাবে। আর এর সুনির্দিষ্ট বিনিময় হিসেবে হিজবুল্লাহও ইসরায়েলের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে কোনো ধরনের সমরাস্ত্র ব্যবহার করবে না। আন্তর্জাতিক এই যুদ্ধবিরতির প্রাথমিক লক্ষ্য বৈরুতকেন্দ্রিক হলেও, পরবর্তী সময়ে এই বিশেষ ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে পুরো লেবাননজুড়ে সার্বিকভাবে কার্যকর করার একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কাগজে-কলমে এই বড় যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এলেও, মাঠপর্যায়ে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যকার দীর্ঘদিনের মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা এবং ক্ষোভ পুরোপুরি স্তিমিত হয়ে যায়নি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সমঝোতার মধ্যেই নতুন বিতর্ক উসকে দিয়ে বলেছেন, বৈরুতে হামলা বন্ধ থাকলেও একই সাথে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তাদের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকায় স্থল অভিযান ও বিশেষ সামরিক তৎপরতা নিয়মিত চালিয়ে যাবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প উভয় পক্ষ যুদ্ধ বন্ধে সম্মত হয়েছে বলে বিশ্ববাসীকে আশ্বস্ত করার পরও সীমান্তের কিছু কিছু দুর্গম এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা উত্তর ইসরায়েলের দুটি কৌশলগত গ্রামের কাছে অবস্থান নেওয়া ইসরায়েলি সাঁজোয়া ট্যাংক ও পদাতিক সেনাদের লক্ষ্য করে কামানের গোলা এবং বিস্ফোরক বোঝাই ড্রোন ব্যবহার করে তিনটি সফল ও বড় ধরনের পাল্টা হামলা চালিয়েছে। অপর দিকে, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, লেবাননের দিক থেকে ধেয়ে আসা দুটি শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র তারা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঝ আকাশেই সফলভাবে ধ্বংস ও ভূপাতিত করেছেন, যার ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের হতাহত বা ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটেনি।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থাও দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রত্যন্ত এলাকায় নতুন করে ইসরায়েলি বাহিনীর কামানের গোলা ও বিমান হামলার খবর নিশ্চিত করেছে। বিশেষ করে ডেববিন নামক একটি সীমান্ত শহরে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বড় ধরনের একটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে, যা পুরো এলাকায় তীব্র কম্পনের সৃষ্টি করে। মূলত এর আগে হিজবুল্লাহর আকস্মিক রকেট ও ড্রোন হামলার কঠোর জবাব দিতেই বৈরুতের দক্ষিণ উপশহরের বিভিন্ন ‘সন্ত্রাসী লক্ষ্যবস্তুতে’ নতুন করে বিমান হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছিলেন নেতানিয়াহু। লেবানন সীমান্তের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের আরেক পরাশক্তি ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা একের পর এক কঠোর কূটনৈতিক সতর্কবার্তা জারি করছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক কড়া বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধবিরতির চুক্তিটি লেবাননসহ পুরো অঞ্চলের সব ফ্রন্টের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট ফ্রন্টে যদি এই যুদ্ধবিরতি কোনো পক্ষ সামান্যতম লঙ্ঘন করে, তবে তা সামগ্রিকভাবে সব ফ্রন্টের যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের শামিল হিসেবেই গণ্য হবে।
এদিকে ইরানের আধাসরকারি তাসনিম সংবাদ সংস্থা তেহরানের উচ্চপর্যায়ের সূত্র উল্লেখ করে জানিয়েছে, লেবাননে যদি ইসরায়েলের এই বেআইনি সামরিক কর্মকাণ্ড ও আগ্রাসন অব্যাহত থাকে, তবে তেহরান প্রশাসন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ওমানে চলমান তাদের পরোক্ষ আলোচনা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পূর্ণভাবে স্থগিত বা পরিহার করতে পারে। সংস্থাটি আরও বিপজ্জনক ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে যে, ইরান এবং তার আঞ্চলিক প্রতিরোধ যোদ্ধারা প্রয়োজনে ইসরায়েলকে কাবু করতে সম্পূর্ণ নতুন ফ্রন্ট বা যুদ্ধের ময়দান সক্রিয় করতে পারে, যার মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে নিজের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ দেওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পূর্ণ উল্টো দাবি করে বলেছেন যে, ইরানের সঙ্গে তাদের আন্তর্জাতিক পারমাণবিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং দ্রুতগতিতে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। একই সাথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং হিজবুল্লাহর প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তার সার্বক্ষণিক ফলপ্রসূ যোগাযোগ হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও সফল আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে বৈরুতের মূল ভূখণ্ডে আর কোনো নতুন ইসরায়েলি সেনা পাঠানো হবে না এবং ইতিমধ্যেই যেসব সেনা সেখানে যাওয়ার পথে অগ্রগামী ছিল, তাদেরও মাঝপথ থেকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, উচ্চ পর্যায়ের বিশেষ প্রতিনিধিদের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গেও তার প্রশাসনের অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং হিজবুল্লাহ সব ধরনের উসকানিমূলক গুলি ও রকেট হামলা বন্ধ রাখতে পুরোপুরি সম্মত হয়েছে। একইভাবে ইসরায়েলও তাদের ওপর আকাশপথের হামলা থেকে বিরত থাকবে। মার্কিন প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও লেবাননে চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা এবং উত্তেজনা প্রশমনের একটি বিশেষ খসড়া প্রস্তাব ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের কাছে সরাসরি হস্তান্তর করেছেন। গত ১৬ এপ্রিল ইসরায়েল-লেবানন আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী চুক্তি লঙ্ঘন করে দুইবার বৈরুতে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছিল, যার সর্বশেষটি ঘটেছিল গত বৃহস্পতিবার। তবে মার্কিন চাপের কারণে আগের তুলনায় বর্তমানে হামলার তীব্রতা অনেকটাই কমে এসেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে একটি বৃহত্তর ও স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর অংশ হিসেবেই মূলত হোয়াইট হাউস বর্তমানে ইসরায়েলের ওপর বৈরুতে তাদের সামরিক অভিযান সীমিত রাখার জন্য নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করে চলেছে।

আপনার মতামত লিখুন