বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে বিগত দুই হাজার আঠারো সাল থেকে শুরু করে প্রতিবছরই কম-বেশি কোরবানি পশুর কাঁচা চামড়া অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হচ্ছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, চলতি বছরেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ও ন্যায্য মূল্য না পেয়ে বিপুল পরিমাণ সংগৃহীত চামড়া অবহেলায় রাস্তায় ফেলে দিয়ে ক্ষোভ ও হতাশায় বাজার ছেড়েছেন প্রান্তিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর কোরবানির মৌসুম এলে চামড়া বাজারের এমন নজিরবিহীন বিপর্যয় ও চরম অস্থিরতার জন্য তারা সরাসরি বড় বড় ব্যবসায়ী এবং আড়তদারদের সিন্ডিকেটের অশুভ কারসাজিকে দায়ী করেছেন।
পশুর কাঁচা চামড়ার এই লাভজনক ব্যবসাটি মূলত দেশের বাজারে সারা বছর জুড়েই চলমান থাকে। তবে পবিত্র কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কেন এমন চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, এই মৌলিক প্রশ্নের আসল উত্তর ও নেপথ্য কারণ খুঁজতে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সাথে বিস্তারিত কথা বলেছে সংবাদমাধ্যম। তাদের দাবি, প্রভাবশালী চক্র বা সিন্ডিকেটের সুনির্দিষ্ট কারসাজির পাশাপাশি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চরম সমন্বয়হীনতা ও দূরদর্শিতার অভাবের কারণেই বার বার বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছেন মাঠপর্যায়ের সাধারণ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এর ফলে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের মূল সরবরাহ চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে। একই সাথে প্রতিবছর দেশের বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জাতীয় সম্পদ নষ্ট হয়ে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে, যার অত্যন্ত নেতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে দেশের মূল জাতীয় অর্থনীতির ওপর।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্রের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও বড় কারণে দেশের এক সময়ের সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের দুর্দিন কোনোভাবেই কাটছে না। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ও প্রথম কারণ হলো, সাভারে চামড়াশিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাকারটি পুরোপুরি ও সঠিকভাবে সচল না হওয়া। এর ফলে পরিবেশগত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শর্ত ও ছাড়পত্রের জটিলতায় বৈশ্বিক বাজারে উন্নত দেশগুলোর প্রতিযোগিতায় অংশই নিতে পারছে না বাংলাদেশের উৎপাদিত চামড়া। এর বাইরে সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার চরম সমন্বয়হীনতাকে। প্রতিবছর কোরবানি ঈদের ঠিক আগে লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার একটি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। কিন্তু সেই দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান বাস্তব বাজারদর কিংবা মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই বিবেচনা করা হয় না।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে রাজধানী ঢাকার একজন শীর্ষস্থানীয় ট্যানারি মালিক অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, মাত্র কয়েকজন ট্যানারি মালিক অথবা নামধারী ব্যবসায়ী নেতার সাথে তড়িঘড়ি করে নামমাত্র বৈঠক করেই প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণের আনুষ্ঠানিকতা সারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সব সরকারের আমলেই মন্ত্রণালয়ের এই নীতি নির্ধারণী বৈঠকে যাদের নিয়মিত আমন্ত্রণ জানানো হয়, তাদের বড় একটি অংশের সাথে বর্তমানে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ বা ট্যানারি ব্যবসার কোনো বাস্তব সম্পর্কই নেই। তারা এক সময় হয়তো এই ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন; কিন্তু এখন স্রেফ রাজনৈতিক বিবেচনায় মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ডাক পান। এই ধরনের ব্যক্তিদের পরামর্শে চামড়ার দাম নির্ধারণ করার ফলে মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মাঝে মস্ত বড় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। কারণ সরকারি বৈঠকে মূলত লবণ দিয়ে প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত করা চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সাধারণ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে এই মূল বার্তাটি সঠিকভাবে পৌঁছায় না। তারা মনে করেন কাঁচা চামড়ার দামই বোধহয় এটি।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের একমাত্র সচল ট্যানারি রীফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান এই শিল্পের বাস্তব জটিলতা তুলে ধরে জানান, কোরবানির ঈদের সময় মাত্র একদিনের ব্যবধানে সারা দেশের সিংহভাগ চামড়া এক সাথে বাজারে আসে। কিন্তু এই সামগ্রিক ব্যবসাটি মূলত সারা বছর ধরেই ধীরলয়ে চলমান থাকে। এমনকি ঈদের আগের দিন সকালেও নিয়মিত সরবরাহকারীদের দেওয়া চামড়া ট্যানারিগুলো নিয়মিত কেনে। সাধারণত পশুর চামড়ার গুণগত মান ও গ্রেড অনুযায়ী এর সঠিক দাম নির্ধারণ করা হয়। তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খুব ভালো মানের অর্থাৎ এ প্লাস গ্রেডের চামড়া প্রতি বর্গফুট বা স্কয়ার ফিট সর্বোচ্চ বাষট্টি থেকে তেষট্টি টাকা দরে আড়তদারদের কাছ থেকে কিনেছেন। আর সবচেয়ে নিম্নমানের চামড়া প্রতি বর্গফুট সর্বনিম্ন তেত্রিশ টাকা পর্যন্ত কেনা হয়েছে। গত এক বছরে দেশের সব ট্যানারি ও আড়তদারদের বেচাকেনার হিসাবের খাতা পর্যালোচনা করলে এই বাস্তব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যাবে। কোরবানি ঈদের দিন মাঠ থেকে সবচেয়ে ভালো মানের চামড়া যেমন পাওয়া যায়; তেমনই অসচেতনতার কারণে নষ্ট হওয়া নিম্নমানের চামড়ার পরিমাণও কিন্তু কম নয়। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন দাম বেঁধে দেয়, তখন তারা কেবল ভালো মানের চামড়াটি বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করে। ফলে মাঠের নিম্নমানের চামড়াটি আসলে কী দামে বেচা-কেনা হবে, তা নিয়ে এক বিশাল ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলতি বছরে ঢাকার বাইরে ছাপ্পান্ন থেকে বাষট্টি টাকা আর ঢাকার ভেতরে বাষট্টি থেকে সাতষট্টি টাকা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। তিনি ঢাকার বাইরের একজন ট্যানারি মালিক হিসেবে ঈদের আগে ভালো মানের চামড়া পঁয়ষট্টি টাকা বর্গফুটেও কিনেছেন, আবার নিম্নমানের চামড়া পঁয়ত্রিশ টাকা বর্গফুটেও সংগ্রহ করেছেন। যারা নিয়মিত এবং বংশানুক্রমিকভাবে এই কাঁচা চামড়ার ব্যবসা করে আসছেন, তারা এই বাণিজ্যিক হিসাবটি খুব সহজেই বোঝেন। কিন্তু পাড়া-মহল্লার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এই জটিল সমীকরণ না বুঝেই সরকারের বেঁধে দেওয়া গড় দাম হিসাব করে পশুর চামড়া কিনে ফেলেন এবং পরবর্তীতে আড়তে এসে চরম লোকসানের মুখে পড়েন।
চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো কাঁচা চামড়া আড়ৎদার সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বাজারের ভেতরের চিত্র ব্যাখ্যা করে জানান, চামড়ার ব্যবসাটি মূলত সারা বছরের একটি সুশৃঙ্খল ব্যবসা। আড়তদাররা ট্যানারিতে যে চামড়া সরবরাহ করেন, তা প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার পর গুণগত মান অনুযায়ী আলাদা করা হয়। যারা বড় ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী, তারা এই মান যাচাইয়ের পর নিখুঁতভাবে দাম নির্ধারণ করে বড় পরিসরে বেচাকেনা করেন। আর যারা অপেক্ষাকৃত ছোট বা প্রান্তিক ব্যবসায়ী, তারা কোনো ঝামেলায় না গিয়ে গড়ে একটি দাম নির্ধারণ করে কাঁচা চামড়া দ্রুত বিক্রি করে দেন। ঈদের আগে গুণগত মান অনুযায়ী আলাদা করা চামড়া পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়ষট্টি টাকা বর্গফুট হিসাবে তারা বিক্রি করেছেন। আর যারা গড়ে বিক্রি করেছেন, তারা প্রতি বর্গফুটে বিয়াল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ টাকার বেশি কোনোভাবেই পাননি। কিন্তু ঈদের ঠিক আগে সরকার চামড়ার গড় দাম নির্ধারণ করে দিল প্রতি বর্গফুট ছাপ্পান্ন থেকে বাষট্টি টাকা হিসাব করে। মাঠের কোনো ট্যানারি মালিকই পাইকারি বাজার থেকে গড়ে এই চড়া দামে চামড়া কিনতে রাজি হবেন না। কিন্তু এই নির্ধারিত দামটি গণমাধ্যমে ঢালাওভাবে প্রচার হয়ে যাওয়ার কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেকেই মাঠ পর্যায় থেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেন; আবার কেউ কেউ আড়তে এসে বেশি দামে বিক্রি করার আশায় দাম ধরে রেখে সময় পার করেন। এভাবে সময়ক্ষেপণ করার ফলে গরমে লবণহীন চামড়া দ্রুত পচে যায় এবং বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের মাঠপর্যায়ের সংকট ও খরচ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে জানান, তারা সারা বছর নিয়মিত কসাইদের কাছ থেকে পশুর চামড়া প্রতি বর্গফুট পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা হিসাবে কিনে থাকেন। কিন্তু কোরবানির সময় এলে সরকার হুট করে দাম বেঁধে দেয় বাষট্টি টাকা করে। সারা বছর প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অল্প অল্প করে যে চামড়া আসে, তা আড়তের নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মচারী দিয়েই সহজে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঈদের দিন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আড়তে বিপুল পরিমাণ চামড়া একসাথে চলে আসায় জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করতে হয় এবং বাজারে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক বেশি দামে লবণ কিনতে হয়। এর ফলে একদিকে যেমন চামড়া সংরক্ষণের প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ অনেক বেড়ে যায়, অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত চড়া দামে চামড়া কেনার এক মানসিক চাপ থাকে। এই দ্বিমুখী লোকসানের কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা চিরতরে ছেড়ে দিয়েছেন। মাত্র ১০ বছর আগেও চট্টগ্রামে সচল আড়তদারের সংখ্যা ছিল অন্তত একশো ত্রিশ জন। অথচ চরম লোকসান আর ক্রমাগত ধসের কারণে এখন মাত্র ত্রিশ থেকে বত্রিশ জনের বেশি নিয়মিত ব্যবসায়ী মাঠে টিকে নেই। সরকার কেবল একদিনের জন্য একটি দাম নির্ধারণ করে গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে। ট্যানারি মালিকরা আসলেই সেই বেঁধে দেওয়া দামে আড়তদারদের কাছ থেকে চামড়া কিনছে কি না, সে ব্যাপারে সরকারের কোনো মাঠপর্যায়ের তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। তিনি আরও জানান, কোরবানির চামড়া এখনো আড়ত থেকে ট্যানারিতে পৌঁছানো শুরু হয়নি, সব চামড়া আড়তেই সংরক্ষিত আছে। সরকার চাইলে এখন থেকেই ট্যানারি মালিকরা কী দামে চামড়া নিচ্ছে এবং তাদের বেঁধে দেওয়া দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে পারে।
রীফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান অতীতের অভিজ্ঞতার সাথে বর্তমানের তুলনা করে বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগেও বাজারে প্রতি বর্গফুট চামড়া একশো টাকায় কিনেও তারা অনায়াসে ভালো মুনাফা বা লাভ করতে পেরেছেন। কিন্তু বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় মাত্র পঞ্চাশ টাকা বর্গফুট মূল্যে চামড়া কিনেও ট্যানারিগুলোকে প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত কেবল কাগজে-কলমে দাম বেঁধে দেওয়ার ক্ষণস্থায়ী অভ্যাসের দিকে নজর সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক মূল বাজারে বাংলাদেশি চামড়ার একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী বাজার তৈরির দিকে দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ দেওয়া। অন্যথায় দেশের এক সময়ের অন্যতম শীর্ষ সম্ভাবনাময় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পের চলমান মহা বিপর্যয় ও ক্রান্তিকাল কোনোদিনই কাটবে না।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬
বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে বিগত দুই হাজার আঠারো সাল থেকে শুরু করে প্রতিবছরই কম-বেশি কোরবানি পশুর কাঁচা চামড়া অবহেলা আর অব্যবস্থাপনায় নষ্ট হচ্ছে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, চলতি বছরেও এর কোনো ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও মাঠপর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ও ন্যায্য মূল্য না পেয়ে বিপুল পরিমাণ সংগৃহীত চামড়া অবহেলায় রাস্তায় ফেলে দিয়ে ক্ষোভ ও হতাশায় বাজার ছেড়েছেন প্রান্তিক ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। প্রতিবছর কোরবানির মৌসুম এলে চামড়া বাজারের এমন নজিরবিহীন বিপর্যয় ও চরম অস্থিরতার জন্য তারা সরাসরি বড় বড় ব্যবসায়ী এবং আড়তদারদের সিন্ডিকেটের অশুভ কারসাজিকে দায়ী করেছেন।
পশুর কাঁচা চামড়ার এই লাভজনক ব্যবসাটি মূলত দেশের বাজারে সারা বছর জুড়েই চলমান থাকে। তবে পবিত্র কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কেন এমন চরম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, এই মৌলিক প্রশ্নের আসল উত্তর ও নেপথ্য কারণ খুঁজতে মাঠপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও অংশীজনদের সাথে বিস্তারিত কথা বলেছে সংবাদমাধ্যম। তাদের দাবি, প্রভাবশালী চক্র বা সিন্ডিকেটের সুনির্দিষ্ট কারসাজির পাশাপাশি সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চরম সমন্বয়হীনতা ও দূরদর্শিতার অভাবের কারণেই বার বার বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ছেন মাঠপর্যায়ের সাধারণ মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এর ফলে কাঁচা চামড়া সংগ্রহের মূল সরবরাহ চেইন বা সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে। একই সাথে প্রতিবছর দেশের বিপুল পরিমাণ মূল্যবান জাতীয় সম্পদ নষ্ট হয়ে মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে, যার অত্যন্ত নেতিবাচক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে দেশের মূল জাতীয় অর্থনীতির ওপর।
সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্বশীল সূত্রের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জানা যায়, বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও বড় কারণে দেশের এক সময়ের সম্ভাবনাময় চামড়াশিল্পের দুর্দিন কোনোভাবেই কাটছে না। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান ও প্রথম কারণ হলো, সাভারে চামড়াশিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাকারটি পুরোপুরি ও সঠিকভাবে সচল না হওয়া। এর ফলে পরিবেশগত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শর্ত ও ছাড়পত্রের জটিলতায় বৈশ্বিক বাজারে উন্নত দেশগুলোর প্রতিযোগিতায় অংশই নিতে পারছে না বাংলাদেশের উৎপাদিত চামড়া। এর বাইরে সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার চরম সমন্বয়হীনতাকে। প্রতিবছর কোরবানি ঈদের ঠিক আগে লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার একটি সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। কিন্তু সেই দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশের বর্তমান বাস্তব বাজারদর কিংবা মাঠপর্যায়ের প্রকৃত পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই বিবেচনা করা হয় না।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে রাজধানী ঢাকার একজন শীর্ষস্থানীয় ট্যানারি মালিক অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান, মাত্র কয়েকজন ট্যানারি মালিক অথবা নামধারী ব্যবসায়ী নেতার সাথে তড়িঘড়ি করে নামমাত্র বৈঠক করেই প্রতিবছর চামড়ার দাম নির্ধারণের আনুষ্ঠানিকতা সারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, সব সরকারের আমলেই মন্ত্রণালয়ের এই নীতি নির্ধারণী বৈঠকে যাদের নিয়মিত আমন্ত্রণ জানানো হয়, তাদের বড় একটি অংশের সাথে বর্তমানে চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ বা ট্যানারি ব্যবসার কোনো বাস্তব সম্পর্কই নেই। তারা এক সময় হয়তো এই ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন; কিন্তু এখন স্রেফ রাজনৈতিক বিবেচনায় মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ডাক পান। এই ধরনের ব্যক্তিদের পরামর্শে চামড়ার দাম নির্ধারণ করার ফলে মাঠপর্যায়ের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মাঝে মস্ত বড় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। কারণ সরকারি বৈঠকে মূলত লবণ দিয়ে প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাত করা চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সাধারণ ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে এই মূল বার্তাটি সঠিকভাবে পৌঁছায় না। তারা মনে করেন কাঁচা চামড়ার দামই বোধহয় এটি।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের একমাত্র সচল ট্যানারি রীফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান এই শিল্পের বাস্তব জটিলতা তুলে ধরে জানান, কোরবানির ঈদের সময় মাত্র একদিনের ব্যবধানে সারা দেশের সিংহভাগ চামড়া এক সাথে বাজারে আসে। কিন্তু এই সামগ্রিক ব্যবসাটি মূলত সারা বছর ধরেই ধীরলয়ে চলমান থাকে। এমনকি ঈদের আগের দিন সকালেও নিয়মিত সরবরাহকারীদের দেওয়া চামড়া ট্যানারিগুলো নিয়মিত কেনে। সাধারণত পশুর চামড়ার গুণগত মান ও গ্রেড অনুযায়ী এর সঠিক দাম নির্ধারণ করা হয়। তারা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খুব ভালো মানের অর্থাৎ এ প্লাস গ্রেডের চামড়া প্রতি বর্গফুট বা স্কয়ার ফিট সর্বোচ্চ বাষট্টি থেকে তেষট্টি টাকা দরে আড়তদারদের কাছ থেকে কিনেছেন। আর সবচেয়ে নিম্নমানের চামড়া প্রতি বর্গফুট সর্বনিম্ন তেত্রিশ টাকা পর্যন্ত কেনা হয়েছে। গত এক বছরে দেশের সব ট্যানারি ও আড়তদারদের বেচাকেনার হিসাবের খাতা পর্যালোচনা করলে এই বাস্তব তথ্যের সত্যতা পাওয়া যাবে। কোরবানি ঈদের দিন মাঠ থেকে সবচেয়ে ভালো মানের চামড়া যেমন পাওয়া যায়; তেমনই অসচেতনতার কারণে নষ্ট হওয়া নিম্নমানের চামড়ার পরিমাণও কিন্তু কম নয়। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন দাম বেঁধে দেয়, তখন তারা কেবল ভালো মানের চামড়াটি বিবেচনায় নিয়ে হিসাব করে। ফলে মাঠের নিম্নমানের চামড়াটি আসলে কী দামে বেচা-কেনা হবে, তা নিয়ে এক বিশাল ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলতি বছরে ঢাকার বাইরে ছাপ্পান্ন থেকে বাষট্টি টাকা আর ঢাকার ভেতরে বাষট্টি থেকে সাতষট্টি টাকা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল সরকার। তিনি ঢাকার বাইরের একজন ট্যানারি মালিক হিসেবে ঈদের আগে ভালো মানের চামড়া পঁয়ষট্টি টাকা বর্গফুটেও কিনেছেন, আবার নিম্নমানের চামড়া পঁয়ত্রিশ টাকা বর্গফুটেও সংগ্রহ করেছেন। যারা নিয়মিত এবং বংশানুক্রমিকভাবে এই কাঁচা চামড়ার ব্যবসা করে আসছেন, তারা এই বাণিজ্যিক হিসাবটি খুব সহজেই বোঝেন। কিন্তু পাড়া-মহল্লার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এই জটিল সমীকরণ না বুঝেই সরকারের বেঁধে দেওয়া গড় দাম হিসাব করে পশুর চামড়া কিনে ফেলেন এবং পরবর্তীতে আড়তে এসে চরম লোকসানের মুখে পড়েন।
চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো কাঁচা চামড়া আড়ৎদার সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বাজারের ভেতরের চিত্র ব্যাখ্যা করে জানান, চামড়ার ব্যবসাটি মূলত সারা বছরের একটি সুশৃঙ্খল ব্যবসা। আড়তদাররা ট্যানারিতে যে চামড়া সরবরাহ করেন, তা প্রাথমিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করার পর গুণগত মান অনুযায়ী আলাদা করা হয়। যারা বড় ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী, তারা এই মান যাচাইয়ের পর নিখুঁতভাবে দাম নির্ধারণ করে বড় পরিসরে বেচাকেনা করেন। আর যারা অপেক্ষাকৃত ছোট বা প্রান্তিক ব্যবসায়ী, তারা কোনো ঝামেলায় না গিয়ে গড়ে একটি দাম নির্ধারণ করে কাঁচা চামড়া দ্রুত বিক্রি করে দেন। ঈদের আগে গুণগত মান অনুযায়ী আলাদা করা চামড়া পঁয়ত্রিশ থেকে পঁয়ষট্টি টাকা বর্গফুট হিসাবে তারা বিক্রি করেছেন। আর যারা গড়ে বিক্রি করেছেন, তারা প্রতি বর্গফুটে বিয়াল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ টাকার বেশি কোনোভাবেই পাননি। কিন্তু ঈদের ঠিক আগে সরকার চামড়ার গড় দাম নির্ধারণ করে দিল প্রতি বর্গফুট ছাপ্পান্ন থেকে বাষট্টি টাকা হিসাব করে। মাঠের কোনো ট্যানারি মালিকই পাইকারি বাজার থেকে গড়ে এই চড়া দামে চামড়া কিনতে রাজি হবেন না। কিন্তু এই নির্ধারিত দামটি গণমাধ্যমে ঢালাওভাবে প্রচার হয়ে যাওয়ার কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেকেই মাঠ পর্যায় থেকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বেশি দামে চামড়া কিনে ফেলেন; আবার কেউ কেউ আড়তে এসে বেশি দামে বিক্রি করার আশায় দাম ধরে রেখে সময় পার করেন। এভাবে সময়ক্ষেপণ করার ফলে গরমে লবণহীন চামড়া দ্রুত পচে যায় এবং বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের মাঠপর্যায়ের সংকট ও খরচ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে জানান, তারা সারা বছর নিয়মিত কসাইদের কাছ থেকে পশুর চামড়া প্রতি বর্গফুট পঁয়ত্রিশ থেকে পঞ্চাশ টাকা হিসাবে কিনে থাকেন। কিন্তু কোরবানির সময় এলে সরকার হুট করে দাম বেঁধে দেয় বাষট্টি টাকা করে। সারা বছর প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অল্প অল্প করে যে চামড়া আসে, তা আড়তের নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মচারী দিয়েই সহজে প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হয়। কিন্তু ঈদের দিন মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে আড়তে বিপুল পরিমাণ চামড়া একসাথে চলে আসায় জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করতে হয় এবং বাজারে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক বেশি দামে লবণ কিনতে হয়। এর ফলে একদিকে যেমন চামড়া সংরক্ষণের প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ অনেক বেড়ে যায়, অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত চড়া দামে চামড়া কেনার এক মানসিক চাপ থাকে। এই দ্বিমুখী লোকসানের কারণে অনেকেই বাধ্য হয়ে এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসা চিরতরে ছেড়ে দিয়েছেন। মাত্র ১০ বছর আগেও চট্টগ্রামে সচল আড়তদারের সংখ্যা ছিল অন্তত একশো ত্রিশ জন। অথচ চরম লোকসান আর ক্রমাগত ধসের কারণে এখন মাত্র ত্রিশ থেকে বত্রিশ জনের বেশি নিয়মিত ব্যবসায়ী মাঠে টিকে নেই। সরকার কেবল একদিনের জন্য একটি দাম নির্ধারণ করে গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে। ট্যানারি মালিকরা আসলেই সেই বেঁধে দেওয়া দামে আড়তদারদের কাছ থেকে চামড়া কিনছে কি না, সে ব্যাপারে সরকারের কোনো মাঠপর্যায়ের তদারকি বা মনিটরিং ব্যবস্থা নেই। তিনি আরও জানান, কোরবানির চামড়া এখনো আড়ত থেকে ট্যানারিতে পৌঁছানো শুরু হয়নি, সব চামড়া আড়তেই সংরক্ষিত আছে। সরকার চাইলে এখন থেকেই ট্যানারি মালিকরা কী দামে চামড়া নিচ্ছে এবং তাদের বেঁধে দেওয়া দাম কার্যকর হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে পারে।
রীফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান অতীতের অভিজ্ঞতার সাথে বর্তমানের তুলনা করে বলেন, আজ থেকে ১০ বছর আগেও বাজারে প্রতি বর্গফুট চামড়া একশো টাকায় কিনেও তারা অনায়াসে ভালো মুনাফা বা লাভ করতে পেরেছেন। কিন্তু বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকায় মাত্র পঞ্চাশ টাকা বর্গফুট মূল্যে চামড়া কিনেও ট্যানারিগুলোকে প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত কেবল কাগজে-কলমে দাম বেঁধে দেওয়ার ক্ষণস্থায়ী অভ্যাসের দিকে নজর সীমাবদ্ধ না রেখে, দেশের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক মূল বাজারে বাংলাদেশি চামড়ার একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী বাজার তৈরির দিকে দীর্ঘমেয়াদি মনোযোগ দেওয়া। অন্যথায় দেশের এক সময়ের অন্যতম শীর্ষ সম্ভাবনাময় ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই শিল্পের চলমান মহা বিপর্যয় ও ক্রান্তিকাল কোনোদিনই কাটবে না।

আপনার মতামত লিখুন