দিকপাল

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে বাড়ল তেলের দাম


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ০১ জুন ২০২৬ | ১২:৫৩ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে বাড়ল তেলের দাম

লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নতুন করে জোরালো অভিযান এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়ার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে দুই শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রায় ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আহ্বান উপেক্ষা করে দক্ষিণ লেবাননের আরও ভেতরের দিকে নিজেদের অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের নির্দেশ জারি করেছে। এর ফলে ইরান-সমর্থিত শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে নতুন করে একটি বড় মাত্রার সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।


সোমবারের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয় ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দুই দশমিক একাত্তর শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে উননব্বই ডলার তিয়াত্তর সেন্টে গিয়ে পৌঁছেছে। ঠিক একই সময়ে বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড বা জ্বালানি তেলের দাম দুই দশমিক সাইত্রিশ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি তিরানব্বই ডলার আটাশ ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার এই সংঘাত হঠাৎ তীব্র আকার ধারণ করায় মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছিল, তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফলে প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক বাজারে স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন বা অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


বিশ্বের জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রাখছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন সংকট। সমগ্র বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা জ্বালানি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশই এই অতি সংবেদনশীল নৌপথটি ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও সামরিক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ইরান এই সামুদ্রিক জলসীমায় নতুন করে আধুনিক মাইন বা বিস্ফোরক পেতে রেখে থাকতে পারে। এই ধরনের খবরের কারণে আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথটি খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে কিনা, তা নিয়ে বড় ধরনের বৈশ্বিক শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


বিশ্বখ্যাত বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইজি মার্কেটসের প্রধান অর্থনৈতিক বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, যদি কোনো কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কিংবা কোনো সমঝোতা চুক্তি সম্পন্নও হয়, তাও তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ বাড়তি তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। কারণ উত্তেজনার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। ফলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ-সংকটের যে গভীর আশঙ্কা রয়েছে, তা সহজে কাটছে না।


অপরদিকে সপ্তাহের শেষভাগে প্রকাশিত এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি দুর্বল ও হতাশাজনক ছিল। দেশটির বৃহৎ কারখানা ও শিল্প উৎপাদন কার্যক্রমে এক ধরনের বড় স্থবিরতা বা মন্দা ভাব লক্ষ্য করা গেছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সামগ্রিক চাহিদা হ্রাস পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে বিশ্ববাজারের বর্তমান গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, চাহিদার এই মন্দা ভাবের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ-সংক্রান্ত বড় ঝুঁকিগুলোই এখন জ্বালানি তেলের বাজারকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত ও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

উৎস: রয়টার্স

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাবে বাড়ল তেলের দাম

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নতুন করে জোরালো অভিযান এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পারদ চড়ার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতেই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে দুই শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার প্রায় ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আহ্বান উপেক্ষা করে দক্ষিণ লেবাননের আরও ভেতরের দিকে নিজেদের অতিরিক্ত সেনা মোতায়েনের নির্দেশ জারি করেছে। এর ফলে ইরান-সমর্থিত শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে নতুন করে একটি বড় মাত্রার সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।


সোমবারের বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অত্যন্ত জনপ্রিয় ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি দুই দশমিক একাত্তর শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে উননব্বই ডলার তিয়াত্তর সেন্টে গিয়ে পৌঁছেছে। ঠিক একই সময়ে বিশ্ববাজারের অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুড বা জ্বালানি তেলের দাম দুই দশমিক সাইত্রিশ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ব্যারেলপ্রতি তিরানব্বই ডলার আটাশ ডলারে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যকার এই সংঘাত হঠাৎ তীব্র আকার ধারণ করায় মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি সম্প্রসারণের যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছিল, তা এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ফলে প্রধান তেল উৎপাদনকারী অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য থেকে বৈশ্বিক বাজারে স্বাভাবিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন বা অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


বিশ্বের জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতার পেছনে অন্যতম বড় ভূমিকা রাখছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে তৈরি হওয়া নতুন সংকট। সমগ্র বিশ্বের মোট উৎপাদিত অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা জ্বালানি পরিবহনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বা ২০ শতাংশই এই অতি সংবেদনশীল নৌপথটি ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও সামরিক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, ইরান এই সামুদ্রিক জলসীমায় নতুন করে আধুনিক মাইন বা বিস্ফোরক পেতে রেখে থাকতে পারে। এই ধরনের খবরের কারণে আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন সংস্থাগুলোর মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথটি খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে কিনা, তা নিয়ে বড় ধরনের বৈশ্বিক শঙ্কা তৈরি হয়েছে।


বিশ্বখ্যাত বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইজি মার্কেটসের প্রধান অর্থনৈতিক বিশ্লেষক টনি সাইকামোর বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, যদি কোনো কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সাময়িক যুদ্ধবিরতি কিংবা কোনো সমঝোতা চুক্তি সম্পন্নও হয়, তাও তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ বাড়তি তেল সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। কারণ উত্তেজনার কারণে উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। ফলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ-সংকটের যে গভীর আশঙ্কা রয়েছে, তা সহজে কাটছে না।


অপরদিকে সপ্তাহের শেষভাগে প্রকাশিত এশিয়ার অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক তথ্য ও পরিসংখ্যান আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি দুর্বল ও হতাশাজনক ছিল। দেশটির বৃহৎ কারখানা ও শিল্প উৎপাদন কার্যক্রমে এক ধরনের বড় স্থবিরতা বা মন্দা ভাব লক্ষ্য করা গেছে, যা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সামগ্রিক চাহিদা হ্রাস পাওয়ার ক্ষেত্রে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে বিশ্ববাজারের বর্তমান গতিপ্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে, চাহিদার এই মন্দা ভাবের চেয়েও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরবরাহ-সংক্রান্ত বড় ঝুঁকিগুলোই এখন জ্বালানি তেলের বাজারকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত ও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

উৎস: রয়টার্স


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল