দিকপাল

ওয়াশিংটনে রাসায়নিক ট্যাংক বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ১১


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ০১ জুন ২০২৬ | ১১:১৭ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ওয়াশিংটনে রাসায়নিক ট্যাংক বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ১১

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের একটি কাগজ তৈরির কারখানায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ রাসায়নিক ট্যাংক বিস্ফোরণের ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক রূপ নিয়েছে। ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ থাকা নয়জন শ্রমিকের নিথর মরদেহ অবশেষে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে এই ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এগারো জনে। ঘটনার বেশ কয়েকদিন পার হওয়ার পর গত ত্রিশে মে উদ্ধারকারীরা কারখানার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সবকটি মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করতে সক্ষম হন। কাউলিটজ কাউন্টির করোনার অফিস ইতিমধ্যে নিহত এগারো জন শ্রমিকের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেছে, যাদের বয়স ছাব্বিশ থেকে আটান্ন বছরের মধ্যে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন— গিলবার্ট বার্নাল, টাইলার কোভিংটন, ব্র্যাডলি কোভিংটন, রবার্ট রব্ব উইলসন, ডেল মিলার, জ্যারেড অ্যামনস, ব্রেডন ফিঙ্কাস, ক্লিনটন সিজে ডোরান, জন ফোর্সবার্গ, নরম্যান বার্লো এবং ডিলন মিলার।


স্মরণকালের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ছাব্বিশে মে, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল সোয়া সাতটার দিকে। লংভিউ এলাকায় অবস্থিত ‘নিপ্পন ডাইনাওয়েভ প্যাকেজিং কোম্পানি’র কারখানায় আকস্মিকভাবে এই বিপর্যয় নেমে আসে। কাগজ তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ‘হোয়াইট লিকার’ নামের অত্যন্ত ক্ষারীয় এবং মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকারক রাসায়নিক ভর্তি একটি বিশালাকার ট্যাংক হঠাৎ বিকট শব্দে ফেটে যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ গ্যালন ফুটন্ত ও বিষাক্ত রাসায়নিক পুরো কারখানা চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে এবং চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।


দুর্ঘটনার পর পর দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনে এক জনের মৃত্যু এবং রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে দগ্ধসহ নয়জন গুরুতর আহত হওয়ার খবর জানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয় এবং নয়জন কর্মী কারখানার ভেতরেই নিখোঁজ থাকেন। লংভিউ ফায়ার ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, সকালের শিফট পরিবর্তনের সময় অনেক কর্মী যখন একটি ব্রেক রুমে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখনই এই আকস্মিক বিস্ফোরণটি ঘটে। ফলে শ্রমিকদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।


ট্যাংক ফেটে যাওয়ার পর পুরো কারখানা চত্বর বিষাক্ত রাসায়নিকে প্লাবিত হওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ও রাসায়নিকের মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাবের কারণে উদ্ধারকারীদের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কারখানার সব এলাকায় তল্লাশি চালানো বা ভেতরে ঢোকা সম্ভব ছিল না। এছাড়া উপচে পড়া এই বিষাক্ত রাসায়নিক যাতে স্থানীয় জনপদের খাবার পানির প্রধান উৎসে মিশে না যায়, সেজন্য তা দ্রুত অন্যদিকে প্রবাহিত করতে উদ্ধারকারীদের ব্যাপক বেগ পেতে হয়। উদ্ধারকৃত মরদেহগুলো ল্যাবে পাঠানোর আগে রাসায়নিকমুক্ত বা জীবাণুমুক্ত করতে উদ্ধারকারী দলগুলোকে কয়েকদিন ধরে অত্যন্ত সতর্ক ও জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়েছে।


গত শনিবার অর্থাৎ ত্রিশে মে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে লংভিউ ফায়ার ডিপার্টমেন্টের চিফ ব্র্যাড হ্যানিগ শেষ নিখোঁজ কর্মীদের মরদেহ উদ্ধারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেন যে, এই উদ্ধার প্রক্রিয়া হয়তো স্বজনহারা শোকার্ত পরিবারগুলোর মনের ক্ষত পুরোপুরি মুছতে পারবে না, তবে প্রিয়জনদের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ দিয়ে তাদের দীর্ঘ নিরাময় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার অন্তত একটি মানসিক সান্ত্বনা দেবে।

এই ভয়াবহ ঘটনাটিকে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক শিল্প বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছেন, ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিকের কিছু অংশ কলম্বিয়া নদী এবং কাছাকাছি কিছু নালায় গিয়ে পতিত হলেও তা ভাগ্যবশত স্থানীয় জনপদের মূল খাবার পানির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি এবং বাতাসেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিষাক্ত দূষণ ছড়ায়নি। উল্লেখ্য, জুস এবং দুধের কার্টন তৈরির জন্য ব্লিচড পেপারবোর্ড প্রস্তুতকারী এই বিখ্যাত নিপ্পন ডাইনাওয়েভ কারখানায় এর আগেও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নীতিমালা লঙ্ঘন এবং ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের মতো বেশ কিছু নেতিবাচক রেকর্ড রয়েছে, যা এই দুর্ঘটনার পর নতুন করে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির বিষয়টিকে সামনে এনেছে।


  

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ওয়াশিংটনে রাসায়নিক ট্যাংক বিস্ফোরণ, নিহত বেড়ে ১১

প্রকাশের তারিখ : ০১ জুন ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের একটি কাগজ তৈরির কারখানায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ রাসায়নিক ট্যাংক বিস্ফোরণের ঘটনাটি আরও মর্মান্তিক রূপ নিয়েছে। ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ থাকা নয়জন শ্রমিকের নিথর মরদেহ অবশেষে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে এই ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এগারো জনে। ঘটনার বেশ কয়েকদিন পার হওয়ার পর গত ত্রিশে মে উদ্ধারকারীরা কারখানার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে সবকটি মরদেহ উদ্ধার ও শনাক্ত করতে সক্ষম হন। কাউলিটজ কাউন্টির করোনার অফিস ইতিমধ্যে নিহত এগারো জন শ্রমিকের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করেছে, যাদের বয়স ছাব্বিশ থেকে আটান্ন বছরের মধ্যে। নিহত ব্যক্তিরা হলেন— গিলবার্ট বার্নাল, টাইলার কোভিংটন, ব্র্যাডলি কোভিংটন, রবার্ট রব্ব উইলসন, ডেল মিলার, জ্যারেড অ্যামনস, ব্রেডন ফিঙ্কাস, ক্লিনটন সিজে ডোরান, জন ফোর্সবার্গ, নরম্যান বার্লো এবং ডিলন মিলার।


স্মরণকালের এই ভয়াবহ দুর্ঘটনাটি ঘটে গত ছাব্বিশে মে, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল সোয়া সাতটার দিকে। লংভিউ এলাকায় অবস্থিত ‘নিপ্পন ডাইনাওয়েভ প্যাকেজিং কোম্পানি’র কারখানায় আকস্মিকভাবে এই বিপর্যয় নেমে আসে। কাগজ তৈরির প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত ‘হোয়াইট লিকার’ নামের অত্যন্ত ক্ষারীয় এবং মানবদেহের জন্য চরম ক্ষতিকারক রাসায়নিক ভর্তি একটি বিশালাকার ট্যাংক হঠাৎ বিকট শব্দে ফেটে যায়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, মুহূর্তের মধ্যে লাখ লাখ গ্যালন ফুটন্ত ও বিষাক্ত রাসায়নিক পুরো কারখানা চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে এবং চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়।


দুর্ঘটনার পর পর দেওয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনে এক জনের মৃত্যু এবং রাসায়নিকের সংস্পর্শে এসে দগ্ধসহ নয়জন গুরুতর আহত হওয়ার খবর জানানো হয়েছিল। পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও একজনের মৃত্যু হয় এবং নয়জন কর্মী কারখানার ভেতরেই নিখোঁজ থাকেন। লংভিউ ফায়ার ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, সকালের শিফট পরিবর্তনের সময় অনেক কর্মী যখন একটি ব্রেক রুমে অবস্থান করছিলেন, ঠিক তখনই এই আকস্মিক বিস্ফোরণটি ঘটে। ফলে শ্রমিকদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না।


ট্যাংক ফেটে যাওয়ার পর পুরো কারখানা চত্বর বিষাক্ত রাসায়নিকে প্লাবিত হওয়ায় পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ও রাসায়নিকের মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রভাবের কারণে উদ্ধারকারীদের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে কারখানার সব এলাকায় তল্লাশি চালানো বা ভেতরে ঢোকা সম্ভব ছিল না। এছাড়া উপচে পড়া এই বিষাক্ত রাসায়নিক যাতে স্থানীয় জনপদের খাবার পানির প্রধান উৎসে মিশে না যায়, সেজন্য তা দ্রুত অন্যদিকে প্রবাহিত করতে উদ্ধারকারীদের ব্যাপক বেগ পেতে হয়। উদ্ধারকৃত মরদেহগুলো ল্যাবে পাঠানোর আগে রাসায়নিকমুক্ত বা জীবাণুমুক্ত করতে উদ্ধারকারী দলগুলোকে কয়েকদিন ধরে অত্যন্ত সতর্ক ও জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়েছে।


গত শনিবার অর্থাৎ ত্রিশে মে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে লংভিউ ফায়ার ডিপার্টমেন্টের চিফ ব্র্যাড হ্যানিগ শেষ নিখোঁজ কর্মীদের মরদেহ উদ্ধারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি অত্যন্ত দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেন যে, এই উদ্ধার প্রক্রিয়া হয়তো স্বজনহারা শোকার্ত পরিবারগুলোর মনের ক্ষত পুরোপুরি মুছতে পারবে না, তবে প্রিয়জনদের শেষ বিদায় জানানোর সুযোগ দিয়ে তাদের দীর্ঘ নিরাময় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ার অন্তত একটি মানসিক সান্ত্বনা দেবে।

এই ভয়াবহ ঘটনাটিকে ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক শিল্প বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছেন, ছড়িয়ে পড়া রাসায়নিকের কিছু অংশ কলম্বিয়া নদী এবং কাছাকাছি কিছু নালায় গিয়ে পতিত হলেও তা ভাগ্যবশত স্থানীয় জনপদের মূল খাবার পানির ওপর কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলেনি এবং বাতাসেও দীর্ঘমেয়াদি কোনো বিষাক্ত দূষণ ছড়ায়নি। উল্লেখ্য, জুস এবং দুধের কার্টন তৈরির জন্য ব্লিচড পেপারবোর্ড প্রস্তুতকারী এই বিখ্যাত নিপ্পন ডাইনাওয়েভ কারখানায় এর আগেও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নীতিমালা লঙ্ঘন এবং ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ডের মতো বেশ কিছু নেতিবাচক রেকর্ড রয়েছে, যা এই দুর্ঘটনার পর নতুন করে কর্তৃপক্ষের গাফিলতির বিষয়টিকে সামনে এনেছে।


  


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল