দিকপাল

ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার পথে সীমান্তে জেরা, বাড়ছে ভোগান্তি


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শনিবার, ৩০ মে ২০২৬ | ০৪:৪৬ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার পথে সীমান্তে জেরা, বাড়ছে ভোগান্তি

ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক ঘোষণা এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, যারা অবৈধ পথে ভারতে এসেছিলেন, তারা যদি এখন ‘স্বেচ্ছায়’ নিজ দেশে ফিরে যেতে চান, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা বা মামলা দায়ের করা হবে না। তবে এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে থেকেই এক বিশাল সংখ্যক মানুষ প্রতিদিন ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা এবং বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে এখন নিজ দেশে ফিরতে চাওয়া মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই ভিড়ের মধ্যে থাকা বাচ্চু মুন্সির গল্পটি এক দীর্ঘ ও জটিল জীবনের প্রতিচ্ছবি। তিনি জানান, যখন তার বয়স ছিল মাত্র বছর দশেক, তখন বাবা-মায়ের হাত ধরে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসেছিলেন। দেখতে দেখতে জীবনের প্রায় আটত্রিশটি বছর এই দেশেই কাটিয়ে দিয়েছেন। এখানেই ঘরসংসার বেঁধেছেন, বিয়ে করেছেন এবং তার সন্তানরাও এখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে এখানেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। কলকাতার দমদম বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করা বাচ্চু মুন্সি এখন তার পুরো পরিবার নিয়ে হাজির হয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে, যা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার একেবারে কাছাকাছি। তিনি জানান, তাদের আদি নিবাস ছিল খুলনা জেলায়।

হাকিমপুর সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন বাচ্চু মুন্সির মতো শত শত নারী, পুরুষ এবং শিশু সেখানে জড়ো হচ্ছেন। সীমান্ত পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এই মানুষদের অধিকাংশেরই দাবি, তারা কোনো না কোনো সময়ে যশোর, খুলনা বা সাতক্ষীরা থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসেছিলেন। কেউ হয়তো বছর দুয়েক আগে কাজের সন্ধানে এসেছেন, আবার কেউ পাঁচ-ছয় বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে এখানে বসবাস করছেন।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এই পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি জয়ী হয়ে নতুন সরকার গঠন করার পর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন যে রাজ্যে কোনো ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’কে আর থাকতে দেওয়া হবে না এবং তাদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই মূলত সীমান্ত এলাকাগুলোতে মানুষের ভিড় নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দা হাসানুর গাজির বিবরণ অনুযায়ী, শুরুর দিকে প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১২ জন করে মানুষ সীমান্তে আসছিলেন। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, এই সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রতিদিন শত শত মানুষ সীমান্তে এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সীমান্তে অপেক্ষমাণ অনেকেই অকপটে স্বীকার করছেন যে, তারা চোরাই পথে ভারতে ঢুকেছিলেন এবং এতদিন কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সেখানে বসবাস ও কাজকর্ম করে আসছিলেন।

উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানার অধীনে থাকা হাকিমপুর এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানটি বেশ সংবেদনশীল। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চেকপোস্ট পার হয়ে কিছুটা এগোলেই তারালি গ্রাম এবং তারপরেই বয়ে চলেছে সোনাই নদী, যার অপর পারেই বাংলাদেশের সীমান্ত। সেখানে সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আসা মানুষদের প্রথমে একটি পরিত্যক্ত ঘরে সাময়িকভাবে রাখা হচ্ছে। এরপর পুলিশ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এসে তাদের পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছেন। প্রত্যেকের নাম, আদি ঠিকানা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি ছবি ও আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক তথ্যও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং বাসিন্দাদের সূত্র থেকে জানা গেছে, এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সীমান্তরক্ষী বাহিনী নির্দিষ্ট একটি পয়েন্ট দিয়ে তাদের ওপারে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। হাকিমপুর চেকপোস্ট থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আমোদিয়া নামক একটি হাঁটা পথ দিয়ে তাদের পার করে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি কখনো দিনের আলোতে চলে, আবার কখনো গভীর রাত পর্যন্ত গড়ায়। তবে এই ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অনেক সময় কাগজপত্রের কাজ শেষ হতে দেরি হলে, অপেক্ষমাণ মানুষদের বাসে করে স্বরূপনগর থানার অধীনে তৈরি হওয়া একটি অস্থায়ী আটক শিবির বা হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সীমান্ত পেরিয়ে চলে যেতে চাওয়া এই মানুষদের অনেকের কাছেই ভারতের বিভিন্ন সরকারি পরিচয়পত্র রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফা শাওজি জানান, ফিরে যেতে আসা অনেকের কাছেই আধার কার্ড, প্যান কার্ড এমনকি ছবিসহ ভোটার আইডি কার্ডও রয়েছে। বাচ্চু মুন্সি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, অনেক চেষ্টা ও তদবির করে তিনি ভারতের ভোটার কার্ড ও অন্যান্য নথি তৈরি করেছিলেন এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ভোটও দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় যে নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া চালানো হয়, সেখানেই তাদের বিপত্তি ঘটে। এই সংশোধিত তালিকা থেকে বাচ্চু মুন্সির পুরো পরিবারের নাম বাদ পড়ে যায়।

সীমান্তে দাঁড়ানো নাজমা নামের এক নারী, যিনি নিজের বাড়ি যশোরে বলে দাবি করেন, তিনি বলেন যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই তাদের ওপর চাপ বাড়ছিল। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে অবৈধভাবে থাকলে জেলে যেতে হবে। তাই কোনো রকম আইনি ঝামেলা বা জেল খাটার চেয়ে সুযোগ বুঝে নিজ দেশে ফিরে যাওয়াকেই তারা শ্রেয় মনে করছেন। একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান রাইসা পারভিন ও শেখ মাসুদ রানা। রাইসা তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, কারণ তার বাবা-মা আগেই ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ওপারে চলে গেছেন। অন্যদিকে শেখ মাসুদ রানা জানান, সরকারি কড়াকড়ির কারণে এখন স্থানীয় বাড়িওয়ালারাও আর তাদের বাড়িতে ভাড়া রাখতে চাইছেন না এবং পুলিশও প্রতিনিয়ত এলাকা ছাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। আখতারুল মোড়ল নামে আরেকজন আক্ষেপ করে বলেন, আগেরবার যখন তালিকা সংশোধন হয়েছিল, তখনই চলে যাওয়া উচিত ছিল, তাহলে এই হয়রানি পোহাতে হতো না। তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, শাহিন আলম মোল্লার মতো অনেকেই এখন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, তারা আর কখনো অবৈধ পথে সীমান্ত পার হবেন না। ভবিষ্যতে যদি কখনো ভারতে আসতেও হয়, তবে তা বৈধ উপায়ে পাসপোর্ট এবং ভিসা নিয়েই করবেন।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ভারত থেকে বাংলাদেশে ফেরার পথে সীমান্তে জেরা, বাড়ছে ভোগান্তি

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬

featured Image

ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সাম্প্রতিক ঘোষণা এক নতুন মোড় এনে দিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, যারা অবৈধ পথে ভারতে এসেছিলেন, তারা যদি এখন ‘স্বেচ্ছায়’ নিজ দেশে ফিরে যেতে চান, তবে তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা বা মামলা দায়ের করা হবে না। তবে এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগে থেকেই এক বিশাল সংখ্যক মানুষ প্রতিদিন ভারতের সীমান্ত এলাকাগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা এবং বাংলাদেশের সাতক্ষীরা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকাগুলোতে এখন নিজ দেশে ফিরতে চাওয়া মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

এই ভিড়ের মধ্যে থাকা বাচ্চু মুন্সির গল্পটি এক দীর্ঘ ও জটিল জীবনের প্রতিচ্ছবি। তিনি জানান, যখন তার বয়স ছিল মাত্র বছর দশেক, তখন বাবা-মায়ের হাত ধরে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসেছিলেন। দেখতে দেখতে জীবনের প্রায় আটত্রিশটি বছর এই দেশেই কাটিয়ে দিয়েছেন। এখানেই ঘরসংসার বেঁধেছেন, বিয়ে করেছেন এবং তার সন্তানরাও এখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে এখানেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। কলকাতার দমদম বিমানবন্দর সংলগ্ন এলাকায় দীর্ঘদিন বসবাস করা বাচ্চু মুন্সি এখন তার পুরো পরিবার নিয়ে হাজির হয়েছেন উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে, যা বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার একেবারে কাছাকাছি। তিনি জানান, তাদের আদি নিবাস ছিল খুলনা জেলায়।

হাকিমপুর সীমান্তে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন বাচ্চু মুন্সির মতো শত শত নারী, পুরুষ এবং শিশু সেখানে জড়ো হচ্ছেন। সীমান্ত পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা এই মানুষদের অধিকাংশেরই দাবি, তারা কোনো না কোনো সময়ে যশোর, খুলনা বা সাতক্ষীরা থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে এসেছিলেন। কেউ হয়তো বছর দুয়েক আগে কাজের সন্ধানে এসেছেন, আবার কেউ পাঁচ-ছয় বছর কিংবা তারও বেশি সময় ধরে এখানে বসবাস করছেন।

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন এই পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলেছে। বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি জয়ী হয়ে নতুন সরকার গঠন করার পর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেন যে রাজ্যে কোনো ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’কে আর থাকতে দেওয়া হবে না এবং তাদের দ্রুত ফেরত পাঠানো হবে। এই ঘোষণার পর থেকেই মূলত সীমান্ত এলাকাগুলোতে মানুষের ভিড় নাটকীয়ভাবে বাড়তে শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দা হাসানুর গাজির বিবরণ অনুযায়ী, শুরুর দিকে প্রতিদিন মাত্র ১০ থেকে ১২ জন করে মানুষ সীমান্তে আসছিলেন। কিন্তু দিন যত গড়িয়েছে, এই সংখ্যা ততই বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রতিদিন শত শত মানুষ সীমান্তে এসে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। সীমান্তে অপেক্ষমাণ অনেকেই অকপটে স্বীকার করছেন যে, তারা চোরাই পথে ভারতে ঢুকেছিলেন এবং এতদিন কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সেখানে বসবাস ও কাজকর্ম করে আসছিলেন।

উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানার অধীনে থাকা হাকিমপুর এলাকার ভৌগোলিক অবস্থানটি বেশ সংবেদনশীল। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর চেকপোস্ট পার হয়ে কিছুটা এগোলেই তারালি গ্রাম এবং তারপরেই বয়ে চলেছে সোনাই নদী, যার অপর পারেই বাংলাদেশের সীমান্ত। সেখানে সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার জন্য আসা মানুষদের প্রথমে একটি পরিত্যক্ত ঘরে সাময়িকভাবে রাখা হচ্ছে। এরপর পুলিশ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এসে তাদের পরিচয়পত্র ও অন্যান্য কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছেন। প্রত্যেকের নাম, আদি ঠিকানা এবং ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি ছবি ও আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক তথ্যও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং বাসিন্দাদের সূত্র থেকে জানা গেছে, এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর সীমান্তরক্ষী বাহিনী নির্দিষ্ট একটি পয়েন্ট দিয়ে তাদের ওপারে পাঠানোর ব্যবস্থা করছে। হাকিমপুর চেকপোস্ট থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আমোদিয়া নামক একটি হাঁটা পথ দিয়ে তাদের পার করে দেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়াটি কখনো দিনের আলোতে চলে, আবার কখনো গভীর রাত পর্যন্ত গড়ায়। তবে এই ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়াটি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন বা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অনেক সময় কাগজপত্রের কাজ শেষ হতে দেরি হলে, অপেক্ষমাণ মানুষদের বাসে করে স্বরূপনগর থানার অধীনে তৈরি হওয়া একটি অস্থায়ী আটক শিবির বা হোল্ডিং সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, সীমান্ত পেরিয়ে চলে যেতে চাওয়া এই মানুষদের অনেকের কাছেই ভারতের বিভিন্ন সরকারি পরিচয়পত্র রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাফা শাওজি জানান, ফিরে যেতে আসা অনেকের কাছেই আধার কার্ড, প্যান কার্ড এমনকি ছবিসহ ভোটার আইডি কার্ডও রয়েছে। বাচ্চু মুন্সি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, অনেক চেষ্টা ও তদবির করে তিনি ভারতের ভোটার কার্ড ও অন্যান্য নথি তৈরি করেছিলেন এবং ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে তিনি ভোটও দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় যে নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া চালানো হয়, সেখানেই তাদের বিপত্তি ঘটে। এই সংশোধিত তালিকা থেকে বাচ্চু মুন্সির পুরো পরিবারের নাম বাদ পড়ে যায়।

সীমান্তে দাঁড়ানো নাজমা নামের এক নারী, যিনি নিজের বাড়ি যশোরে বলে দাবি করেন, তিনি বলেন যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই তাদের ওপর চাপ বাড়ছিল। পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে অবৈধভাবে থাকলে জেলে যেতে হবে। তাই কোনো রকম আইনি ঝামেলা বা জেল খাটার চেয়ে সুযোগ বুঝে নিজ দেশে ফিরে যাওয়াকেই তারা শ্রেয় মনে করছেন। একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানান রাইসা পারভিন ও শেখ মাসুদ রানা। রাইসা তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন, কারণ তার বাবা-মা আগেই ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ওপারে চলে গেছেন। অন্যদিকে শেখ মাসুদ রানা জানান, সরকারি কড়াকড়ির কারণে এখন স্থানীয় বাড়িওয়ালারাও আর তাদের বাড়িতে ভাড়া রাখতে চাইছেন না এবং পুলিশও প্রতিনিয়ত এলাকা ছাড়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। আখতারুল মোড়ল নামে আরেকজন আক্ষেপ করে বলেন, আগেরবার যখন তালিকা সংশোধন হয়েছিল, তখনই চলে যাওয়া উচিত ছিল, তাহলে এই হয়রানি পোহাতে হতো না। তবে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, শাহিন আলম মোল্লার মতো অনেকেই এখন দৃঢ় প্রতিজ্ঞ যে, তারা আর কখনো অবৈধ পথে সীমান্ত পার হবেন না। ভবিষ্যতে যদি কখনো ভারতে আসতেও হয়, তবে তা বৈধ উপায়ে পাসপোর্ট এবং ভিসা নিয়েই করবেন।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল