দিকপাল

মরুভূমিতে চীনের ‘পারমাণবিক দুর্গ’, উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : শনিবার, ৩০ মে ২০২৬ | ০৩:৩৪ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

মরুভূমিতে চীনের ‘পারমাণবিক দুর্গ’, উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো আকস্মিক ও শক্তিশালী হামলা থেকে নিজেদের পারমাণবিক শক্তিকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে এক নজিরবিহীন ও চতুর কৌশল অবলম্বন করেছে চীন। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক জনমানবহীন ও প্রত্যন্ত মরুভূমি এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে এক সুবিশাল ও অত্যন্ত জটিল সামরিক অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে বেইজিংয়ের এই বিশাল গোপন তৎপরতার চাঞ্চল্যকর তথ্য ও চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং এই পুরো ব্যবস্থাটি এমন এক অভিনব কৌশলে সাজাচ্ছে যাতে ওয়াশিংটন যদি কখনো প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালায়, তাহলেও যেন চীনের মূল অস্ত্রভাণ্ডার কোনোভাবেই ধ্বংস না হয়। চীন যেন সেই বিধ্বংসী আঘাত সামলে উঠে পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, সেটিই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এমনিতেই চীনের বর্তমান পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রান্তে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ওপর সম্প্রতি কিছু কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে চীনের এই নতুন ও গোপন সামরিক প্রস্তুতির বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া ওইসব ছবি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পূর্ব সিনচিয়াং অঞ্চলের হামি পারমাণবিক সাইলো বা ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার এলাকাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এক সুবিশাল সামরিক যোগাযোগের জাল বিছানো হয়েছে। এই পুরো মহাপরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ও আলোচিত বিষয় হলো—মরুভূমির বুকে তৈরি করা তিনটি বিশালাকৃতির অষ্টভুজাকৃতির স্থাপনা।

এদের মধ্যে উত্তরের অষ্টভুজটি মূলত সেনা সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদি থাকার ব্যবস্থা, ভারী সামরিক যান চলাচল এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য ছদ্মবেশী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলের এক জটিল সংমিশ্রণ। এই এলাকার ঠিক পাশেই তৈরি করা হয়েছে মাটির নিচে অত্যন্ত সুরক্ষিত বাঙ্কার, আধুনিক অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার, যুদ্ধবিমানের ঘাঁটি এবং একটি বিশেষ রেলসংযোগ, যা সরাসরি মূল পারমাণবিক সাইলোর সাথে যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণের অষ্টভুজটিতে গড়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার ও বিশাল জ্বালানি সংরক্ষণাগার, যা যেকোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জ্বালানির জোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখবে। আর তৃতীয় অষ্টভুজটি বিখ্যাত লপ নুর পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্রের ঠিক দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্থানটি মূলত সামরিক মহড়ার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ সেখানে পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের আদলে তৈরি বেশ কিছু নকল বিমান সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যা দেখে সহজেই শত্রুপক্ষ বিভ্রান্ত হতে পারে।

শুধু তাই নয়, মরুভূমির রুক্ষ পাহাড়ি পাথর, উপত্যকা ও শুকনো খালের আড়ালে কংক্রিটের তৈরি আশিটিরও বেশি কৃত্রিম উৎক্ষেপণকেন্দ্র বা মোবাইল লঞ্চ প্যাড শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো মূলত সড়কপথে সহজে চলাচলকারী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যন্ত আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে। সামরিক খাতের সার্বিক কমান্ড এবং যোগাযোগের সুবিধার্থে পুরো মরুভূমি জুড়ে মাটির নিচে মাইলের পর মাইল ফাইবার অপটিক তার বিছানো হয়েছে। একই সাথে শক্তিশালী স্যাটেলাইট ডিশ ও আকাশের দিকে মুখ করে থাকা বিশাল টাওয়ারের মাধ্যমে একটি নিটোল ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষেত্র এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যা শত্রুর যেকোনো সাইবার বা রেডিও জ্যামিং ব্যবস্থাকে অনায়াসে নস্যাৎ করে দিতে পারে।

চীনের দীর্ঘদিনের আনুষ্ঠানিক ও ঘোষিত নীতি হলো—তারা কখনো কোনো দেশের ওপর প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালাবে না। তবে তাদের এই নতুন প্রতিরক্ষামূলক নীতি বলছে, আক্রান্ত হলে তারা যেন শতভাগ শক্তি ও নিখুঁত নিশানা নিয়ে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের মতে, বেইজিংয়ের এই সামরিক আধুনিকায়ন ও বিশাল কর্মযজ্ঞ মূলত ভবিষ্যৎ তাইওয়ান সংকটকে মাথায় রেখে করা হচ্ছে। কিছুদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব এক হুঁশিয়ারি বার্তায় বলেছিলেন যে, তাইওয়ান ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও পরিস্থিতিকে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ধারণা, তাইওয়ান ইস্যুতে বাইরের কোনো দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে আসে, তবে বেইজিং এই পারমাণবিক শক্তি ও মরুভূমির দুর্ভেদ্য দুর্গটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের থামিয়ে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের নিজস্ব তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীন বর্তমানে বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেই চীনের হাতে অন্তত এক হাজার সচল পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বা ওয়ারহেড থাকবে। এছাড়া চীন তাদের নিজস্ব অত্যাধুনিক উপগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্র নব্বই সেকেন্ডের মধ্যে তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। এর ফলে শত্রুর মূল আঘাতটি চীনের মাটিতে এসে পড়ার আগেই বেইজিং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যাবে।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার মতো পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো তাদের পারমাণবিক সুরক্ষার জন্য কেবল সাইলোর ভৌগোলিক দূরত্ব, মাটির গভীরতা ও কংক্রিটের মজবুত কাঠামোর ওপর ভরসা করে থাকে। কিন্তু চীন যেভাবে দুর্গম মরুভূমির বুকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং বিশাল যোগাযোগ নেটওয়ার্কের এক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, তা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর। এই বিশাল প্রজেক্ট দেখে ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক তথ্য প্রকল্পের প্রধান হ্যানস ক্রিস্টেনসেন গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, প্রকৃতির এত প্রতিকূল ও রুক্ষ পরিবেশে এত বড় এবং সুবিন্যস্ত সামরিক অবকাঠামো তিনি এর আগে পৃথিবীর কোথাও দেখেননি। এটি নিঃসন্দেহে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে চীনের এক অসাধারণ ও যুগান্তকারী প্রচেষ্টা। 

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


মরুভূমিতে চীনের ‘পারমাণবিক দুর্গ’, উদ্বেগে যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬

featured Image

যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য যেকোনো আকস্মিক ও শক্তিশালী হামলা থেকে নিজেদের পারমাণবিক শক্তিকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে এক নজিরবিহীন ও চতুর কৌশল অবলম্বন করেছে চীন। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এক জনমানবহীন ও প্রত্যন্ত মরুভূমি এলাকায় গড়ে তোলা হচ্ছে এক সুবিশাল ও অত্যন্ত জটিল সামরিক অবকাঠামো। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে বেইজিংয়ের এই বিশাল গোপন তৎপরতার চাঞ্চল্যকর তথ্য ও চিত্র প্রকাশ পেয়েছে।

বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং এই পুরো ব্যবস্থাটি এমন এক অভিনব কৌশলে সাজাচ্ছে যাতে ওয়াশিংটন যদি কখনো প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালায়, তাহলেও যেন চীনের মূল অস্ত্রভাণ্ডার কোনোভাবেই ধ্বংস না হয়। চীন যেন সেই বিধ্বংসী আঘাত সামলে উঠে পূর্ণ শক্তিতে পাল্টা জবাব দেওয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে, সেটিই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এমনিতেই চীনের বর্তমান পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো প্রান্তে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। এর ওপর সম্প্রতি কিছু কৃত্রিম উপগ্রহের ছবিতে চীনের এই নতুন ও গোপন সামরিক প্রস্তুতির বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে ধরা পড়েছে।

কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পাওয়া ওইসব ছবি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পূর্ব সিনচিয়াং অঞ্চলের হামি পারমাণবিক সাইলো বা ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণাগার এলাকাকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এক সুবিশাল সামরিক যোগাযোগের জাল বিছানো হয়েছে। এই পুরো মহাপরিকল্পনার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যময় ও আলোচিত বিষয় হলো—মরুভূমির বুকে তৈরি করা তিনটি বিশালাকৃতির অষ্টভুজাকৃতির স্থাপনা।

এদের মধ্যে উত্তরের অষ্টভুজটি মূলত সেনা সদস্যদের দীর্ঘমেয়াদি থাকার ব্যবস্থা, ভারী সামরিক যান চলাচল এবং প্রতিপক্ষকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য ছদ্মবেশী ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থলের এক জটিল সংমিশ্রণ। এই এলাকার ঠিক পাশেই তৈরি করা হয়েছে মাটির নিচে অত্যন্ত সুরক্ষিত বাঙ্কার, আধুনিক অস্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার, যুদ্ধবিমানের ঘাঁটি এবং একটি বিশেষ রেলসংযোগ, যা সরাসরি মূল পারমাণবিক সাইলোর সাথে যুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে, দক্ষিণের অষ্টভুজটিতে গড়ে তোলা হয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার ও বিশাল জ্বালানি সংরক্ষণাগার, যা যেকোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে জ্বালানির জোগান নিরবচ্ছিন্ন রাখবে। আর তৃতীয় অষ্টভুজটি বিখ্যাত লপ নুর পারমাণবিক পরীক্ষাকেন্দ্রের ঠিক দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। ধারণা করা হচ্ছে, এই স্থানটি মূলত সামরিক মহড়ার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ সেখানে পশ্চিমা যুদ্ধবিমানের আদলে তৈরি বেশ কিছু নকল বিমান সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যা দেখে সহজেই শত্রুপক্ষ বিভ্রান্ত হতে পারে।

শুধু তাই নয়, মরুভূমির রুক্ষ পাহাড়ি পাথর, উপত্যকা ও শুকনো খালের আড়ালে কংক্রিটের তৈরি আশিটিরও বেশি কৃত্রিম উৎক্ষেপণকেন্দ্র বা মোবাইল লঞ্চ প্যাড শনাক্ত করা হয়েছে। এগুলো মূলত সড়কপথে সহজে চলাচলকারী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যন্ত আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছে। সামরিক খাতের সার্বিক কমান্ড এবং যোগাযোগের সুবিধার্থে পুরো মরুভূমি জুড়ে মাটির নিচে মাইলের পর মাইল ফাইবার অপটিক তার বিছানো হয়েছে। একই সাথে শক্তিশালী স্যাটেলাইট ডিশ ও আকাশের দিকে মুখ করে থাকা বিশাল টাওয়ারের মাধ্যমে একটি নিটোল ইলেকট্রনিক যুদ্ধক্ষেত্র এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে, যা শত্রুর যেকোনো সাইবার বা রেডিও জ্যামিং ব্যবস্থাকে অনায়াসে নস্যাৎ করে দিতে পারে।

চীনের দীর্ঘদিনের আনুষ্ঠানিক ও ঘোষিত নীতি হলো—তারা কখনো কোনো দেশের ওপর প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালাবে না। তবে তাদের এই নতুন প্রতিরক্ষামূলক নীতি বলছে, আক্রান্ত হলে তারা যেন শতভাগ শক্তি ও নিখুঁত নিশানা নিয়ে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশের মতে, বেইজিংয়ের এই সামরিক আধুনিকায়ন ও বিশাল কর্মযজ্ঞ মূলত ভবিষ্যৎ তাইওয়ান সংকটকে মাথায় রেখে করা হচ্ছে। কিছুদিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের উদ্দেশ্যে চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব এক হুঁশিয়ারি বার্তায় বলেছিলেন যে, তাইওয়ান ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে সামান্য ভুল বোঝাবুঝিও পরিস্থিতিকে এক অত্যন্ত বিপজ্জনক জায়গায় নিয়ে যেতে পারে। পশ্চিমা কূটনীতিকদের ধারণা, তাইওয়ান ইস্যুতে বাইরের কোনো দেশ, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে আসে, তবে বেইজিং এই পারমাণবিক শক্তি ও মরুভূমির দুর্ভেদ্য দুর্গটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তাদের থামিয়ে দেবে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের নিজস্ব তথ্য ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চীন বর্তমানে বিশ্বের যেকোনো দেশের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে তাদের পারমাণবিক সক্ষমতার বিস্তার ঘটাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যেই চীনের হাতে অন্তত এক হাজার সচল পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র বা ওয়ারহেড থাকবে। এছাড়া চীন তাদের নিজস্ব অত্যাধুনিক উপগ্রহ ব্যবস্থার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের মাত্র নব্বই সেকেন্ডের মধ্যে তা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। এর ফলে শত্রুর মূল আঘাতটি চীনের মাটিতে এসে পড়ার আগেই বেইজিং পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়ে যাবে।

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার মতো পরমাণু শক্তিধর দেশগুলো তাদের পারমাণবিক সুরক্ষার জন্য কেবল সাইলোর ভৌগোলিক দূরত্ব, মাটির গভীরতা ও কংক্রিটের মজবুত কাঠামোর ওপর ভরসা করে থাকে। কিন্তু চীন যেভাবে দুর্গম মরুভূমির বুকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং বিশাল যোগাযোগ নেটওয়ার্কের এক মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে, তা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন ও বিস্ময়কর। এই বিশাল প্রজেক্ট দেখে ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টসের পারমাণবিক তথ্য প্রকল্পের প্রধান হ্যানস ক্রিস্টেনসেন গভীর বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, প্রকৃতির এত প্রতিকূল ও রুক্ষ পরিবেশে এত বড় এবং সুবিন্যস্ত সামরিক অবকাঠামো তিনি এর আগে পৃথিবীর কোথাও দেখেননি। এটি নিঃসন্দেহে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে চীনের এক অসাধারণ ও যুগান্তকারী প্রচেষ্টা। 


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল