দিকপাল

ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েও কেন রাজি হননি আইনস্টাইন?


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : শনিবার, ৩০ মে ২০২৬ | ০২:১১ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েও কেন রাজি হননি আইনস্টাইন?

বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে ১৯৫২ সালে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা ইতিহাসের পাতায় একটি অত্যন্ত চমৎকার এবং ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়। তবে অত্যন্ত বিনয় ও দূরদর্শিতার সাথে তিনি এই সম্মানজনক প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মূলত, ইসরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট খাইম ভাইৎসম্যানের মৃত্যুর পর দেশটির তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আইনস্টাইনের নাম গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল।

প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান খাইম ভাইৎসম্যান ছিলেন একাধারে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একজন জৈব রসায়নবিদ এবং জায়নবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রূপকার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সংকটময় সময়ে রাসায়নিক গবেষণার মাধ্যমে তরল অ্যাসিটোন উৎপাদন করে তিনি ব্রিটিশ বাহিনীকে এক বড় ধরনের সুবিধা এনে দিয়েছিলেন, যা বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি তার রাজনৈতিক তৎপরতাও ছিল সমান প্রভাবশালী। ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সাথে তিনি দশকের পর দশক নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৯ সালে তিনি নবগঠিত রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৫২ সালে সাতাত্তর বছর বয়সে যখন এই মহান নেতার জীবনাবসান ঘটে, তখনই শূন্য পদটি পূরণের জন্য একজন সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্বের সন্ধান শুরু হয়।

সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবনের মাধ্যমে আইনস্টাইনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের পক্ষ থেকে প্রেরিত সেই চিঠিতে অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করে বলা হয়েছিল যে, ভূখণ্ডের দিক থেকে ইসরাইল আকারে ছোট হতে পারে, তবে এটি ইহুদি জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের প্রাচীন গৌরব এবং আধুনিক ঐতিহ্যের মূল ধারক। আর এই নবজাত রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা ও বিশ্বমঞ্চে এর অবস্থান সুদৃঢ় করতে আইনস্টাইনের মতো একজন প্রাজ্ঞ মানুষের অভিভাবকত্ব ও নেতৃত্ব অত্যন্ত প্রয়োজন।

তখনকার দিনে আইনস্টাইন আমেরিকার নিউ জার্সিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন এবং বিখ্যাত প্রিন্সটন ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের সাথে যুক্ত থেকে নিজের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রস্তাবের সাথে তাকে এই নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছিল যে, রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তার প্রিয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন হবে না; তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি নিজের অ্যাকাডেমিক কাজও চালিয়ে যেতে পারবেন। তবে শর্ত ছিল একটাই, তাকে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ছেড়ে ইসরাইলে গিয়ে সশরীরে বসবাস করতে হবে।

এই অভাবনীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ পেয়ে আইনস্টাইন চরমভাবে আবেগাপ্লুত ও কৃতজ্ঞ বোধ করেছিলেন, কিন্তু তিনি অত্যন্ত নম্রভাবে তা ফিরিয়ে দেন। প্রত্যুত্তরে লেখা চিঠিতে তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে নিজের অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে, ইসরাইল সরকারের এই মূল্যায়নে তিনি মনে-প্রাণে গভীরভাবে অভিভূত হয়েছেন, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এটি গ্রহণ করতে না পারায় তার মনের ভেতর এক ধরনের দুঃখ ও সংকোচবোধ কাজ করছে। নিজের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি লেখেন যে, সারা জীবন তিনি কেবল বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক সমস্যা ও মহাজাগতিক নিয়ম নিয়ে নিমগ্ন থেকেছেন। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা, জটিল রাজনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা কিংবা প্রশাসনিক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা তার কখনোই ছিল না। ফলে এত বড় এবং স্পর্শকাতর একটি পদের মর্যাদা রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই তিনি মনে করেন। তবে একই সাথে তিনি এটিও মনে করিয়ে দেন যে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার পর থেকে ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে আত্মার যোগসূত্রই ছিল তার জীবনের অন্যতম শক্তিশালী মানবিক বন্ধন। আর এই কারণেই এমন একটি আবেগঘন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া তার জন্য মানসিকভাবে বেশ কঠিন ছিল।

ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইনস্টাইনের এই অস্বীকৃতির পেছনে কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতার বিনয়ী স্বীকারোক্তিই ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করেছিল এক গভীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। আইনস্টাইন কখনোই নিজেকে প্রথাগত রাজনীতিক বা ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে দেখতে চাননি। অন্যদিকে, ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নও আইনস্টাইনের স্বাধীনচেতা ও আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কারণ আইনস্টাইন কোনো নির্দিষ্ট দলীয় বৃত্তে বন্দি থাকার মানুষ ছিলেন না।

প্রেসিডেন্ট পদটি প্রত্যাখ্যান করলেও ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জায়নবাদী ভাবধারার প্রতি আইনস্টাইনের সমর্থন ছিল দীর্ঘদিনের পুরনো। তিনি প্রয়াত খাইম ভাইৎসম্যানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সুহৃদ ছিলেন। তবে তিনি এমন এক উদার জায়নবাদে বিশ্বাস করতেন, যা ফিলিস্তিনের মাটিতে আরব ও ইহুদিদের সমান অধিকার এবং পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নিশ্চয়তা দেয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে লেখা একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে আইনস্টাইন তার এই মতাদর্শের কথা স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে, ইহুদিদের ওপর ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক অন্যায়ের অবসান এবং একটি নিরাপদ আশ্রয়ের তাগিদেই তিনি এই আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে করেন। এর পরের বছর যখন স্বাধীন ইসরাইল রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে, তখন তিনি মন থেকে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।

তবে রাষ্ট্র গঠনের পর সেখানে জেঁকে বসা চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করতেও তিনি দ্বিধা করেননি। ১৯৪৮ সালে মেনাখেম বেগিনের নেতৃত্বাধীন হারুত পার্টির উগ্র কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে যে বিখ্যাত খোলা চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে আইনস্টাইনসহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ইহুদি বুদ্ধিজীবী সরাসরি স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই চিঠিতে তারা দলটির উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন ও সহিংস কর্মকাণ্ডকে ফ্যাসিবাদী ও নাৎসি মানসিকতার সাথে তুলনা করে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছিলেন।

মূলত, নবগঠিত ইসরাইল রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং বিশ্বমঞ্চে এর ভাবমূর্তি রাতারাতি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যেই আইনস্টাইনকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যদিও ইসরাইলের রাষ্ট্রপতির পদটি ছিল মূলত আলংকারিক ও আনুষ্ঠানিক, তবুও আইনস্টাইনের মতো একজন বিশ্বনন্দিত মনীষী সেই পদে বসলে তা দেশটির জন্য এক বিরাট প্রতীকী ও নৈতিক জয় হিসেবে গণ্য হতো। শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইন ক্ষমতার মোহে পা না বাড়িয়ে নিজের চেনা জগতেই রয়ে গেলেন। তার এই অসম্মতির পর ১৯৫২ সালে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আইজ্যাক বেন-জেভি ইসরাইলের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আর মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই বিজ্ঞানী রাজনীতির পিচ্ছিল পথে না গিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানবকল্যাণ, গণিত এবং পদার্থবিদ্যার জটিল তত্ত্বের মাঝেই নিজের মেধা ও মননকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সুযোগ পেয়েও কেন রাজি হননি আইনস্টাইন?

প্রকাশের তারিখ : ৩০ মে ২০২৬

featured Image

বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনকে ১৯৫২ সালে ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট হওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, যা ইতিহাসের পাতায় একটি অত্যন্ত চমৎকার এবং ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে পরিগণিত হয়। তবে অত্যন্ত বিনয় ও দূরদর্শিতার সাথে তিনি এই সম্মানজনক প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। মূলত, ইসরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট খাইম ভাইৎসম্যানের মৃত্যুর পর দেশটির তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নতুন রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আইনস্টাইনের নাম গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং এর পেছনে গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত উদ্দেশ্য ছিল।

প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান খাইম ভাইৎসম্যান ছিলেন একাধারে আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একজন জৈব রসায়নবিদ এবং জায়নবাদী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান রূপকার। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সংকটময় সময়ে রাসায়নিক গবেষণার মাধ্যমে তরল অ্যাসিটোন উৎপাদন করে তিনি ব্রিটিশ বাহিনীকে এক বড় ধরনের সুবিধা এনে দিয়েছিলেন, যা বৈজ্ঞানিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর পাশাপাশি তার রাজনৈতিক তৎপরতাও ছিল সমান প্রভাবশালী। ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনের সাথে তিনি দশকের পর দশক নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৪৯ সালে তিনি নবগঠিত রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৫২ সালে সাতাত্তর বছর বয়সে যখন এই মহান নেতার জীবনাবসান ঘটে, তখনই শূন্য পদটি পূরণের জন্য একজন সর্বজনগ্রাহ্য ব্যক্তিত্বের সন্ধান শুরু হয়।

সেই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত আব্বা ইবনের মাধ্যমে আইনস্টাইনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাব পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নের পক্ষ থেকে প্রেরিত সেই চিঠিতে অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করে বলা হয়েছিল যে, ভূখণ্ডের দিক থেকে ইসরাইল আকারে ছোট হতে পারে, তবে এটি ইহুদি জনগোষ্ঠীর হাজার বছরের প্রাচীন গৌরব এবং আধুনিক ঐতিহ্যের মূল ধারক। আর এই নবজাত রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদা ও বিশ্বমঞ্চে এর অবস্থান সুদৃঢ় করতে আইনস্টাইনের মতো একজন প্রাজ্ঞ মানুষের অভিভাবকত্ব ও নেতৃত্ব অত্যন্ত প্রয়োজন।

তখনকার দিনে আইনস্টাইন আমেরিকার নিউ জার্সিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছিলেন এবং বিখ্যাত প্রিন্সটন ইনস্টিটিউট ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের সাথে যুক্ত থেকে নিজের তাত্ত্বিক পদার্থবিদ্যার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রস্তাবের সাথে তাকে এই নিশ্চয়তাও দেওয়া হয়েছিল যে, রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব গ্রহণ করলেও তার প্রিয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা বন্ধ করার কোনো প্রয়োজন হবে না; তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি নিজের অ্যাকাডেমিক কাজও চালিয়ে যেতে পারবেন। তবে শর্ত ছিল একটাই, তাকে স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ছেড়ে ইসরাইলে গিয়ে সশরীরে বসবাস করতে হবে।

এই অভাবনীয় এবং মর্যাদাপূর্ণ আমন্ত্রণ পেয়ে আইনস্টাইন চরমভাবে আবেগাপ্লুত ও কৃতজ্ঞ বোধ করেছিলেন, কিন্তু তিনি অত্যন্ত নম্রভাবে তা ফিরিয়ে দেন। প্রত্যুত্তরে লেখা চিঠিতে তিনি অত্যন্ত খোলামেলাভাবে নিজের অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। তিনি জানান যে, ইসরাইল সরকারের এই মূল্যায়নে তিনি মনে-প্রাণে গভীরভাবে অভিভূত হয়েছেন, কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এটি গ্রহণ করতে না পারায় তার মনের ভেতর এক ধরনের দুঃখ ও সংকোচবোধ কাজ করছে। নিজের সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি লেখেন যে, সারা জীবন তিনি কেবল বস্তুনিষ্ঠ বৈজ্ঞানিক সমস্যা ও মহাজাগতিক নিয়ম নিয়ে নিমগ্ন থেকেছেন। সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব বোঝা, জটিল রাজনৈতিক সম্পর্ক পরিচালনা কিংবা প্রশাসনিক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করার মতো প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা তার কখনোই ছিল না। ফলে এত বড় এবং স্পর্শকাতর একটি পদের মর্যাদা রক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয় বলেই তিনি মনে করেন। তবে একই সাথে তিনি এটিও মনে করিয়ে দেন যে, বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে নিজের অবস্থান স্পষ্ট হওয়ার পর থেকে ইহুদি সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে আত্মার যোগসূত্রই ছিল তার জীবনের অন্যতম শক্তিশালী মানবিক বন্ধন। আর এই কারণেই এমন একটি আবেগঘন প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া তার জন্য মানসিকভাবে বেশ কঠিন ছিল।

ইতিহাসবিদ এবং গবেষকদের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইনস্টাইনের এই অস্বীকৃতির পেছনে কেবল প্রশাসনিক অদক্ষতার বিনয়ী স্বীকারোক্তিই ছিল না, বরং এর পেছনে কাজ করেছিল এক গভীর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। আইনস্টাইন কখনোই নিজেকে প্রথাগত রাজনীতিক বা ক্ষমতার অংশীদার হিসেবে দেখতে চাননি। অন্যদিকে, ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নও আইনস্টাইনের স্বাধীনচেতা ও আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কারণ আইনস্টাইন কোনো নির্দিষ্ট দলীয় বৃত্তে বন্দি থাকার মানুষ ছিলেন না।

প্রেসিডেন্ট পদটি প্রত্যাখ্যান করলেও ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং জায়নবাদী ভাবধারার প্রতি আইনস্টাইনের সমর্থন ছিল দীর্ঘদিনের পুরনো। তিনি প্রয়াত খাইম ভাইৎসম্যানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সুহৃদ ছিলেন। তবে তিনি এমন এক উদার জায়নবাদে বিশ্বাস করতেন, যা ফিলিস্তিনের মাটিতে আরব ও ইহুদিদের সমান অধিকার এবং পারস্পরিক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নিশ্চয়তা দেয়। ১৯৪৭ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে লেখা একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে আইনস্টাইন তার এই মতাদর্শের কথা স্পষ্ট করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে, ইহুদিদের ওপর ঘটে যাওয়া ঐতিহাসিক অন্যায়ের অবসান এবং একটি নিরাপদ আশ্রয়ের তাগিদেই তিনি এই আন্দোলনকে যৌক্তিক মনে করেন। এর পরের বছর যখন স্বাধীন ইসরাইল রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করে, তখন তিনি মন থেকে আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন।

তবে রাষ্ট্র গঠনের পর সেখানে জেঁকে বসা চরমপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করতেও তিনি দ্বিধা করেননি। ১৯৪৮ সালে মেনাখেম বেগিনের নেতৃত্বাধীন হারুত পার্টির উগ্র কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ জানিয়ে নিউইয়র্ক টাইমসে যে বিখ্যাত খোলা চিঠিটি প্রকাশিত হয়েছিল, তাতে আইনস্টাইনসহ আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ইহুদি বুদ্ধিজীবী সরাসরি স্বাক্ষর করেছিলেন। সেই চিঠিতে তারা দলটির উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শন ও সহিংস কর্মকাণ্ডকে ফ্যাসিবাদী ও নাৎসি মানসিকতার সাথে তুলনা করে বিশ্ববাসীকে সতর্ক করেছিলেন।

মূলত, নবগঠিত ইসরাইল রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং বিশ্বমঞ্চে এর ভাবমূর্তি রাতারাতি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যেই আইনস্টাইনকে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যদিও ইসরাইলের রাষ্ট্রপতির পদটি ছিল মূলত আলংকারিক ও আনুষ্ঠানিক, তবুও আইনস্টাইনের মতো একজন বিশ্বনন্দিত মনীষী সেই পদে বসলে তা দেশটির জন্য এক বিরাট প্রতীকী ও নৈতিক জয় হিসেবে গণ্য হতো। শেষ পর্যন্ত আইনস্টাইন ক্ষমতার মোহে পা না বাড়িয়ে নিজের চেনা জগতেই রয়ে গেলেন। তার এই অসম্মতির পর ১৯৫২ সালে বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আইজ্যাক বেন-জেভি ইসরাইলের দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। আর মানব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই বিজ্ঞানী রাজনীতির পিচ্ছিল পথে না গিয়ে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানবকল্যাণ, গণিত এবং পদার্থবিদ্যার জটিল তত্ত্বের মাঝেই নিজের মেধা ও মননকে নিয়োজিত রেখেছিলেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল