দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম উত্তেজনা আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। চিরবৈরী দুই দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং চলমান যুদ্ধের একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজতে উভয় পক্ষ একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে উপনীত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির খবর নিশ্চিত করেছে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রশাসনের বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানিয়েছে যে, প্রস্তুতকৃত এই শান্তি আলোচনার রূপরেখা বা খসড়া চুক্তিটি বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর ওপর চূড়ান্ত স্বাক্ষর করেন, তবে বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা স্থবির ও নিষ্ক্রিয় কূটনীতির পর এটি হবে বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম একটি বড় ধরনের অগ্রগতি। অবশ্য এই চুক্তির ভেতরে থাকা সব ধরনের শর্ত ও বিস্তারিত তথ্য এখনও পুরোপুরি জনসাধারণের সামনে পরিষ্কার করা হয়নি। এছাড়া ৬০ দিনের এই বর্ধিত সময়টুকুকে কেবল আলোচনার চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে গণ্য করা হবে কি-না, তা নিয়েও এখনও কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে, কারণ উভয় দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতিটি আগে থেকেই কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই উন্মুক্ত অবস্থায় কার্যকর ছিল।
উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত সমুদ্রসীমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের নৌবাহিনীর মধ্যে বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত ও মারাত্মক সংঘর্ষের পরপরই এই সমঝোতা স্মারকটি আলোর মুখ দেখল। এমনকি এই চুক্তি নিয়ে আলোচনার খবরের ঠিক আগের দিন বৃহস্পতিবারও উভয় পক্ষ একে অপরের সামরিক অবস্থানের ওপর সীমিত আকারে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস প্রথম এই প্রাথমিক চুক্তির খবরটি প্রকাশ করে এবং পরবর্তী সময়ে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে আল-জাজিরার কাছে এই খবরের সত্যতা স্বীকার করে। অ্যাক্সিওসের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ ‘অবাধ ও নিরাপদ’ রাখা এবং এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের দীর্ঘদিনের কঠোর নৌ-অবরোধ তুলে নেবে।
ঐতিহাসিকভাবেই ইরান এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সমুদ্রপথের ওপর নিজেদের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। তেহরানের মতে, হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে হওয়ায় এটি যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা উচিত। তবে হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের শুল্ক আদায় বা ইরানের যেকোনো ধরনের একক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ওমানকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, ওমান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা করে, তবে ওয়াশিংটন ওমানের ওপরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করবে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য তিনি এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানান এবং স্পষ্ট করে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া কঠোর শর্তগুলো পূরণ না হলে কোনো ধরনের চুক্তি সই হতে পারে না। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, এই চুক্তির ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তিনি আরও জানান, ট্রাম্প ইরানের সামনে তিনটি প্রধান শর্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুত সম্পূর্ণ ত্যাগ করা এবং দেশের সব ধরনের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার দাবিকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়েছে ইরানি গণমাধ্যমগুলো। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা তাসনিম এই আলোচনার সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন দাবিটি সরাসরি অস্বীকার করেছে। সেই ইরানি সূত্রটি জানিয়েছে, যদি চুক্তির খসড়া পাঠ্যটি সত্যিই চূড়ান্ত রূপ পেয়ে থাকে, তবে ইরান সরকার নিজেই তা পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারী এবং দেশের সাধারণ জনগণকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করবে। তার আগে পশ্চিমা বা মার্কিন সূত্রের যেকোনো ধরনের দাবি বা প্রচারণাকে বৈধ বা সত্য বলে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সমুদ্রপথ সংক্রান্ত এই জটিল দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পাশাপাশি খসড়া সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকারের বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে। তবে তেহরান ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বহুবার এই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এমনকি যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় নিহত হওয়া ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অনেক আগেই গণবিধ্বংসী ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি পবিত্র ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বৃহস্পতিবার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তার দেশ কখনোই কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করছে না। ইরানের আইএসএনএ নিউজ এজেন্সি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইরান নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো ধরনের অবমাননাকর কূটনীতিতে বিশ্বাস করে না।
এই প্রাথমিক চুক্তিটি সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালির চলমান তীব্র সংকটের সমাধান করতে পারলেও, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া হাজারো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের কাছে থাকা ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যতের মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে আগামী দিনে আরও দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে। ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অনুযায়ী, নিজেদের দেশের ভেতরে বেসামরিক কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের পক্ষে এখনও অনড় অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে আসছেন যে, দেশটির পুরো পারমাণবিক গবেষণার কাঠামোই পুরোপুরি ভেঙে দিতে হবে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সীমিত করার দাবি জানালেও, তেহরান তাদের নিজস্ব জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা বা আপস করতে পরিষ্কারভাবে নাকচ করে দিয়েছে।
এই শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অদৃশ্য জটিলতা হলো লেবাননে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ। সেখানে ইসরাইলি বাহিনী তাদের সামরিক হামলা ও বোমাবর্ষণের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে গত কয়েক সপ্তাহে অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর জবাবে ইরান-ঘনিষ্ঠ লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইসরাইলি বাহিনীর বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত এপ্রিল মাসে হওয়া পূর্ববর্তী একটি যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয়বারের মতো বৈরুতের প্রাণকেন্দ্রে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করেছে ইসরাইল। ইরান এর আগে পরিষ্কার জানিয়েছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হলে তাতে অবশ্যই লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে পৃথকভাবে, লেবানন সরকার বর্তমানে যুদ্ধ অবসানের জন্য ইসরাইলের সাথে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন আগে বলেছিল যে, লেবানন এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক অংশ ছিল না, তবে তারা বর্তমানে চলমান লেবানন-ইসরাইল দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে পূর্ণ সমর্থন ও আতিথেয়তা প্রদান করছে।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ মে ২০২৬
দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম উত্তেজনা আর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। চিরবৈরী দুই দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও ৬০ দিন বাড়ানোর লক্ষ্যে এবং চলমান যুদ্ধের একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজতে উভয় পক্ষ একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারকে উপনীত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির খবর নিশ্চিত করেছে।
বৃহস্পতিবার মার্কিন প্রশাসনের বেশ কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল-জাজিরাকে জানিয়েছে যে, প্রস্তুতকৃত এই শান্তি আলোচনার রূপরেখা বা খসড়া চুক্তিটি বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর ওপর চূড়ান্ত স্বাক্ষর করেন, তবে বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা স্থবির ও নিষ্ক্রিয় কূটনীতির পর এটি হবে বৈশ্বিক রাজনীতির অন্যতম একটি বড় ধরনের অগ্রগতি। অবশ্য এই চুক্তির ভেতরে থাকা সব ধরনের শর্ত ও বিস্তারিত তথ্য এখনও পুরোপুরি জনসাধারণের সামনে পরিষ্কার করা হয়নি। এছাড়া ৬০ দিনের এই বর্ধিত সময়টুকুকে কেবল আলোচনার চূড়ান্ত সময়সীমা হিসেবে গণ্য করা হবে কি-না, তা নিয়েও এখনও কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে, কারণ উভয় দেশের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতিটি আগে থেকেই কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই উন্মুক্ত অবস্থায় কার্যকর ছিল।
উপসাগরীয় অঞ্চলের কৌশলগত সমুদ্রসীমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের নৌবাহিনীর মধ্যে বেশ কিছু বিক্ষিপ্ত ও মারাত্মক সংঘর্ষের পরপরই এই সমঝোতা স্মারকটি আলোর মুখ দেখল। এমনকি এই চুক্তি নিয়ে আলোচনার খবরের ঠিক আগের দিন বৃহস্পতিবারও উভয় পক্ষ একে অপরের সামরিক অবস্থানের ওপর সীমিত আকারে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছিল। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস প্রথম এই প্রাথমিক চুক্তির খবরটি প্রকাশ করে এবং পরবর্তী সময়ে হোয়াইট হাউস আনুষ্ঠানিকভাবে আল-জাজিরার কাছে এই খবরের সত্যতা স্বীকার করে। অ্যাক্সিওসের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সম্পূর্ণ ‘অবাধ ও নিরাপদ’ রাখা এবং এর বিনিময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রধান প্রধান সমুদ্রবন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের দীর্ঘদিনের কঠোর নৌ-অবরোধ তুলে নেবে।
ঐতিহাসিকভাবেই ইরান এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সমুদ্রপথের ওপর নিজেদের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। তেহরানের মতে, হরমুজ প্রণালির ভৌগোলিক অবস্থান ইরান ও ওমানের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমার মধ্য দিয়ে হওয়ায় এটি যৌথ ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করা উচিত। তবে হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরনের শুল্ক আদায় বা ইরানের যেকোনো ধরনের একক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি শুরু থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। এর আগে মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ওমানকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে, ওমান যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে ইরানকে কোনো ধরনের সহায়তা করে, তবে ওয়াশিংটন ওমানের ওপরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করবে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য তিনি এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানান এবং স্পষ্ট করে বলেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া কঠোর শর্তগুলো পূরণ না হলে কোনো ধরনের চুক্তি সই হতে পারে না। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি বলেন, এই চুক্তির ভবিষ্যৎ সম্পূর্ণভাবে প্রেসিডেন্টের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তিনি আরও জানান, ট্রাম্প ইরানের সামনে তিনটি প্রধান শর্ত স্পষ্ট করে দিয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করা ইউরেনিয়ামের বর্তমান মজুত সম্পূর্ণ ত্যাগ করা এবং দেশের সব ধরনের পারমাণবিক কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা।
অবশ্য মার্কিন কর্মকর্তাদের এই চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার দাবিকে সম্পূর্ণভাবে উড়িয়ে দিয়েছে ইরানি গণমাধ্যমগুলো। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদসংস্থা তাসনিম এই আলোচনার সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন দাবিটি সরাসরি অস্বীকার করেছে। সেই ইরানি সূত্রটি জানিয়েছে, যদি চুক্তির খসড়া পাঠ্যটি সত্যিই চূড়ান্ত রূপ পেয়ে থাকে, তবে ইরান সরকার নিজেই তা পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারী এবং দেশের সাধারণ জনগণকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করবে। তার আগে পশ্চিমা বা মার্কিন সূত্রের যেকোনো ধরনের দাবি বা প্রচারণাকে বৈধ বা সত্য বলে মেনে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সমুদ্রপথ সংক্রান্ত এই জটিল দ্বিপাক্ষিক চুক্তির পাশাপাশি খসড়া সমঝোতা স্মারকে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকারের বিষয়টিও যুক্ত রয়েছে। তবে তেহরান ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে বহুবার এই প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। এমনকি যুদ্ধের প্রথম দিনে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় নিহত হওয়া ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি অনেক আগেই গণবিধ্বংসী ও পারমাণবিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি পবিত্র ধর্মীয় ফতোয়া জারি করে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। ইরানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও বৃহস্পতিবার অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তার দেশ কখনোই কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জনের চেষ্টা করছে না। ইরানের আইএসএনএ নিউজ এজেন্সি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ইরান নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে কোনো ধরনের অবমাননাকর কূটনীতিতে বিশ্বাস করে না।
এই প্রাথমিক চুক্তিটি সাময়িকভাবে হরমুজ প্রণালির চলমান তীব্র সংকটের সমাধান করতে পারলেও, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেওয়া হাজারো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের কাছে থাকা ইউরেনিয়াম মজুতের ভবিষ্যতের মতো অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে আগামী দিনে আরও দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে। ইরান আন্তর্জাতিক পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অনুযায়ী, নিজেদের দেশের ভেতরে বেসামরিক কাজে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকারের পক্ষে এখনও অনড় অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোর দিয়ে আসছেন যে, দেশটির পুরো পারমাণবিক গবেষণার কাঠামোই পুরোপুরি ভেঙে দিতে হবে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদন সীমিত করার দাবি জানালেও, তেহরান তাদের নিজস্ব জাতীয় প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা বা আপস করতে পরিষ্কারভাবে নাকচ করে দিয়েছে।
এই শান্তি প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অদৃশ্য জটিলতা হলো লেবাননে চলমান ভয়াবহ যুদ্ধ। সেখানে ইসরাইলি বাহিনী তাদের সামরিক হামলা ও বোমাবর্ষণের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার ফলে গত কয়েক সপ্তাহে অসংখ্য নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এর জবাবে ইরান-ঘনিষ্ঠ লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহও ইসরাইলি বাহিনীর বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। গত এপ্রিল মাসে হওয়া পূর্ববর্তী একটি যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয়বারের মতো বৈরুতের প্রাণকেন্দ্রে ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করেছে ইসরাইল। ইরান এর আগে পরিষ্কার জানিয়েছিল যে, মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো ধরনের স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হলে তাতে অবশ্যই লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবে পৃথকভাবে, লেবানন সরকার বর্তমানে যুদ্ধ অবসানের জন্য ইসরাইলের সাথে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই বিষয়ে মার্কিন প্রশাসন আগে বলেছিল যে, লেবানন এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির আনুষ্ঠানিক অংশ ছিল না, তবে তারা বর্তমানে চলমান লেবানন-ইসরাইল দ্বিপাক্ষিক আলোচনাকে পূর্ণ সমর্থন ও আতিথেয়তা প্রদান করছে।

আপনার মতামত লিখুন