ত্যাগের এক অনন্য মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে বিশ্বজুড়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত বুধবারই এই আনন্দঘন উৎসবটি উদযাপিত হয়েছে। অন্যদিকে, ভৌগোলিক অবস্থান এবং চাঁদ দেখার সময়ের পার্থক্যের কারণে বাংলাদেশে আজ বৃহস্পতিবার উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদ পালিত হচ্ছে। ঈদের সকাল থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মসজিদে ও ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করছেন এবং একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করছেন।
তবে এবারের ঈদের আনন্দের মাঝেও বিশ্বজুড়ে এক ধরনের বিষাদের ছায়া বিস্তার করেছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি। দীর্ঘদিনের ইসরাইলি হামলায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সেখানে ঈদের কোনো চিরাচরিত আমেজ নেই। ঘরবাড়ি হারানো লাখো ফিলিস্তিনি পরিবার বর্তমানে অস্থায়ী তাঁবু এবং অত্যন্ত ঘিঞ্জি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই চরম সংকটের মধ্যেও তারা অত্যন্ত সীমিত পরিসরে, সামান্য কিছু মাংস জোগাড় করে কিংবা পুরোনো উৎসবের পোশাকেই কোনোমতে ঈদের দিনটি পার করছেন। তাদের এই ঈদ উদযাপন মূলত উৎসবের চেয়েও টিকে থাকার এবং চরম ধৈর্যের এক প্রতীকী প্রকাশে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ পবিত্র হজ পালনও এবার অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৭ লাখেরও বেশি মানুষ হজের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কায় সমবেত হয়েছেন, যা বিগত ২০২৫ সালের তুলনায় সংখ্যায় কিছুটা বেশি। হজের মূল আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার বিপুলসংখ্যক হজযাত্রী ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে দিনভর ইবাদত বন্দেগি, জিকির ও কান্নাকাটি করে কাটান। এই আরাফাতের ময়দানটি মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানেই ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পর, সূর্যাস্তের পর হজযাত্রীরা আরাফাত ও মিনার মাঝামাঝি অবস্থিত মুজদালিফা নামক ময়দানের দিকে রওনা হন এবং সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করেন। এই মুজদালিফায় অবস্থানকালীন সময়েই তারা পরবর্তী ধর্মীয় আচারের জন্য, অর্থাৎ শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে ছোট ছোট নুড়ি পাথর সংগ্রহ করেন। এরপর মিনায় গিয়ে শয়তানের উদ্দেশ্যে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর, হজযাত্রীরা পুনরায় কাবা শরিফ প্রদক্ষিণ করার জন্য মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে ফিরে আসেন এবং হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
ঐতিহাসিকভাবে, মহান আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও অবিচল আনুগত্যের এক অনন্য নিদর্শনস্বরূপ নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে উৎসর্গ করার এক কঠিনতম পরীক্ষা দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় সেই কঠিন পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন এবং পুত্রের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। মানব ইতিহাসের সেই মহান ও ত্যাগের ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর মুসলিম উম্মাহ এই ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ পালন করে থাকে।
এই পবিত্র দিনটিতে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সাধারণত উট, দুম্বা, ভেড়া, ছাগল বা গরু কোরবানি বা উৎসর্গ করে থাকেন। কোরবানির পর সেই পশুর মাংসকে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। এরপর সেই মাংস নিজেদের পরিবারের জন্য রাখার পাশাপাশি পরম উৎসাহে প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং সমাজের দুস্থ ও অভাবী মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়, যা সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সমতা এবং ত্যাগের এক অনন্য বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
ত্যাগের এক অনন্য মহিমায় উজ্জীবিত হয়ে বিশ্বজুড়ে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করছেন মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ। ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গত বুধবারই এই আনন্দঘন উৎসবটি উদযাপিত হয়েছে। অন্যদিকে, ভৌগোলিক অবস্থান এবং চাঁদ দেখার সময়ের পার্থক্যের কারণে বাংলাদেশে আজ বৃহস্পতিবার উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদ পালিত হচ্ছে। ঈদের সকাল থেকেই ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মসজিদে ও ঈদগাহ ময়দানে সমবেত হয়ে ঈদের নামাজ আদায় করছেন এবং একে অপরের সাথে কুশল বিনিময় করছেন।
তবে এবারের ঈদের আনন্দের মাঝেও বিশ্বজুড়ে এক ধরনের বিষাদের ছায়া বিস্তার করেছে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি। দীর্ঘদিনের ইসরাইলি হামলায় সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া গাজার চিত্র একেবারেই ভিন্ন। সেখানে ঈদের কোনো চিরাচরিত আমেজ নেই। ঘরবাড়ি হারানো লাখো ফিলিস্তিনি পরিবার বর্তমানে অস্থায়ী তাঁবু এবং অত্যন্ত ঘিঞ্জি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এই চরম সংকটের মধ্যেও তারা অত্যন্ত সীমিত পরিসরে, সামান্য কিছু মাংস জোগাড় করে কিংবা পুরোনো উৎসবের পোশাকেই কোনোমতে ঈদের দিনটি পার করছেন। তাদের এই ঈদ উদযাপন মূলত উৎসবের চেয়েও টিকে থাকার এবং চরম ধৈর্যের এক প্রতীকী প্রকাশে পরিণত হয়েছে।
এদিকে ইসলামের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ পবিত্র হজ পালনও এবার অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৭ লাখেরও বেশি মানুষ হজের উদ্দেশ্যে পবিত্র মক্কায় সমবেত হয়েছেন, যা বিগত ২০২৫ সালের তুলনায় সংখ্যায় কিছুটা বেশি। হজের মূল আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে গত মঙ্গলবার বিপুলসংখ্যক হজযাত্রী ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে সমবেত হয়ে দিনভর ইবাদত বন্দেগি, জিকির ও কান্নাকাটি করে কাটান। এই আরাফাতের ময়দানটি মুসলিম উম্মাহর জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এখানেই ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনের শেষ ঐতিহাসিক ভাষণটি দিয়েছিলেন।
আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের পর, সূর্যাস্তের পর হজযাত্রীরা আরাফাত ও মিনার মাঝামাঝি অবস্থিত মুজদালিফা নামক ময়দানের দিকে রওনা হন এবং সেখানে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করেন। এই মুজদালিফায় অবস্থানকালীন সময়েই তারা পরবর্তী ধর্মীয় আচারের জন্য, অর্থাৎ শয়তানকে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের উদ্দেশ্যে ছোট ছোট নুড়ি পাথর সংগ্রহ করেন। এরপর মিনায় গিয়ে শয়তানের উদ্দেশ্যে প্রতীকী পাথর নিক্ষেপের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার পর, হজযাত্রীরা পুনরায় কাবা শরিফ প্রদক্ষিণ করার জন্য মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে ফিরে আসেন এবং হজের বাকি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
ঐতিহাসিকভাবে, মহান আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা ও অবিচল আনুগত্যের এক অনন্য নিদর্শনস্বরূপ নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে উৎসর্গ করার এক কঠিনতম পরীক্ষা দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। মহান আল্লাহর ইচ্ছায় সেই কঠিন পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন এবং পুত্রের পরিবর্তে একটি দুম্বা কোরবানি হয়। মানব ইতিহাসের সেই মহান ও ত্যাগের ঘটনাকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর মুসলিম উম্মাহ এই ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ পালন করে থাকে।
এই পবিত্র দিনটিতে সামর্থ্যবান মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সাধারণত উট, দুম্বা, ভেড়া, ছাগল বা গরু কোরবানি বা উৎসর্গ করে থাকেন। কোরবানির পর সেই পশুর মাংসকে ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। এরপর সেই মাংস নিজেদের পরিবারের জন্য রাখার পাশাপাশি পরম উৎসাহে প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন এবং সমাজের দুস্থ ও অভাবী মানুষের মাঝে বিতরণ করা হয়, যা সমাজে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সমতা এবং ত্যাগের এক অনন্য বার্তা ছড়িয়ে দেয়।

আপনার মতামত লিখুন