দিকপাল

সহকর্মী ও পরিবার তাঁর জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও, রাষ্ট্র বা সমাজ কেউ তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি। অবশেষে গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে চিরতরে থেমে গেল সেই নির্ভীক কণ্ঠ।

সম্পাদকের কলম: সত্য প্রকাশের শেষ মূল্য কি শুধুই মৃত্যু?


অভিলাষ মাহমুদ
অভিলাষ মাহমুদ সাব-এডিটর
প্রকাশ : বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | ০১:৪৮ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পাদকের কলম: সত্য প্রকাশের শেষ মূল্য কি শুধুই মৃত্যু?
ছবি: সংগৃহীত

হাজারো ভেজালের ভিড়ে তিনি ছিলেন এক খাঁটি সাংবাদিক। যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দেশকে ভালো রাখা, মাদক, চোরাচালান আর অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে লড়াই করা। বলছিলাম নেত্রকোনার অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের কথা। সত্যের শেকড়ে পৌঁছাতে তিনি কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের অভিনয় করে সীমান্ত এলাকায় ঘুরতেন। 

 'রূপসী বাংলা' আর ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পেজে তাঁর একের পর এক চোখখোলা প্রতিবেদন অপরাধীদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তালিকা ধরে অপরাধীদের নাম প্রকাশ করায় তাঁর ওপর বারবার হামলার চেষ্টা হয়েছে। সহকর্মী ও পরিবার তাঁর জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও, রাষ্ট্র বা সমাজ কেউ তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি। অবশেষে গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে চিরতরে থেমে গেল সেই নির্ভীক কণ্ঠ। যে মানুষটা জীবন বাজি রেখে অপরাধের গভীর পর্যন্ত পৌঁছেছেন, তিনি আর ফিরে আসেননি। হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা আগেও তাঁর পেজে পোস্ট ছিল, তার পরেই সব চিরতরে চুপ। 

আলিফ ফকিরের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর সমাজব্যবস্থার নগ্ন রূপকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। যে দেশে অপরাধ দমনের কাজ বাদ দিয়ে একজন সাংবাদিককে ছদ্মবেশে ঘুরে তথ্য জোগাড় করতে হয়, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা স্পষ্ট। যে অপরাধচক্রের নাম তিনি প্রতিবেদনে উন্মোচন করেছিলেন, তাদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা না করতে পারা স্থানীয় প্রশাসনের চরম গাফিলতি।  

এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো—সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী থেকে শুরু করে দেশে সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়ার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছে, আলিফের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটবে কি না। একটি গুলিতে শুধু একজন সাংবাদিকের জীবন শেষ হয়নি, থমকে গেছে একটি পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। শোকে ভেঙে পড়া তাঁর স্ত্রী-সন্তানের পাশে কি কেউ দাঁড়াবে, নাকি শুধু কিছু সস্তা সমবেদনা আর কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হবে? 

এই দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়—আলিফের মৃত্যু সেই ভীতিপ্রদ বার্তাটিই আবার দিয়ে গেল। আমরা অবিলম্বে আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। একইসাথে তাঁর নিঃস্ব পরিবারের পূর্ণ আর্থিক পুনর্বাসন এবং যেসব অবৈধ বালু-পাথর ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে তিনি লড়ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। সত্য প্রকাশের পরিণতি যেন মৃত্যু না হয়—রাষ্ট্রকে তা প্রমাণ করতেই হবে।

বিষয় : সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির ময়মনসিং নেত্রকোনা

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬


সম্পাদকের কলম: সত্য প্রকাশের শেষ মূল্য কি শুধুই মৃত্যু?

প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

হাজারো ভেজালের ভিড়ে তিনি ছিলেন এক খাঁটি সাংবাদিক। যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দেশকে ভালো রাখা, মাদক, চোরাচালান আর অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে লড়াই করা। বলছিলাম নেত্রকোনার অনুসন্ধানী সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের কথা। সত্যের শেকড়ে পৌঁছাতে তিনি কখনো মুচি, কখনো ফেরিওয়ালা, আবার কখনো মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষের অভিনয় করে সীমান্ত এলাকায় ঘুরতেন। 

 'রূপসী বাংলা' আর ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পেজে তাঁর একের পর এক চোখখোলা প্রতিবেদন অপরাধীদের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। তালিকা ধরে অপরাধীদের নাম প্রকাশ করায় তাঁর ওপর বারবার হামলার চেষ্টা হয়েছে। সহকর্মী ও পরিবার তাঁর জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে জানলেও, রাষ্ট্র বা সমাজ কেউ তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেনি। অবশেষে গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে চিরতরে থেমে গেল সেই নির্ভীক কণ্ঠ। যে মানুষটা জীবন বাজি রেখে অপরাধের গভীর পর্যন্ত পৌঁছেছেন, তিনি আর ফিরে আসেননি। হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টা আগেও তাঁর পেজে পোস্ট ছিল, তার পরেই সব চিরতরে চুপ। 

আলিফ ফকিরের এই নির্মম হত্যাকাণ্ড আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি আর সমাজব্যবস্থার নগ্ন রূপকে আবারও সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। যে দেশে অপরাধ দমনের কাজ বাদ দিয়ে একজন সাংবাদিককে ছদ্মবেশে ঘুরে তথ্য জোগাড় করতে হয়, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা স্পষ্ট। যে অপরাধচক্রের নাম তিনি প্রতিবেদনে উন্মোচন করেছিলেন, তাদের হাত থেকে তাঁকে রক্ষা না করতে পারা স্থানীয় প্রশাসনের চরম গাফিলতি।  

এর চেয়েও বড় শঙ্কার বিষয় হলো—সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী থেকে শুরু করে দেশে সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়ার যে রেওয়াজ তৈরি হয়েছে, আলিফের ক্ষেত্রেও তেমনটি ঘটবে কি না। একটি গুলিতে শুধু একজন সাংবাদিকের জীবন শেষ হয়নি, থমকে গেছে একটি পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। শোকে ভেঙে পড়া তাঁর স্ত্রী-সন্তানের পাশে কি কেউ দাঁড়াবে, নাকি শুধু কিছু সস্তা সমবেদনা আর কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হবে? 

এই দেশে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়—আলিফের মৃত্যু সেই ভীতিপ্রদ বার্তাটিই আবার দিয়ে গেল। আমরা অবিলম্বে আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ও অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। একইসাথে তাঁর নিঃস্ব পরিবারের পূর্ণ আর্থিক পুনর্বাসন এবং যেসব অবৈধ বালু-পাথর ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে তিনি লড়ছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি। সত্য প্রকাশের পরিণতি যেন মৃত্যু না হয়—রাষ্ট্রকে তা প্রমাণ করতেই হবে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল