দিকপাল

পানের চাষে বদলে গেছে নওগাঁর তিন গ্রামের ভাগ্য


নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৩:১০ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

পানের চাষে বদলে গেছে নওগাঁর তিন গ্রামের ভাগ্য

একসময় যেখানে কৃষকদের স্বপ্ন সীমাবদ্ধ ছিল কেবল প্রথাগত মৌসুমি ফসলের আয়-ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে, সেখানে আজ পানের বরজ এনে দিয়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। নওগাঁ সদর উপজেলার কির্ত্তিপুর ইউনিয়নের তিনটি গ্রাম—জালম, মাগুড়া ও জাগেশ্বর এখন শুধু তিনটি সাধারণ গ্রামের নাম নয়; এগুলো এখন গ্রামীণ অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন, কৃষকের আত্মবিশ্বাস এবং স্বাবলম্বিতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। স্থানীয়ভাবে এই জনপদ এখন 'পানের গ্রাম' নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

নওগাঁ সদর উপজেলা থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তিন গ্রামে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি—যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই কেবল সারি সারি পানের বরজ। স্থানীয় চাষিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকার উঁচু ও বন্যামুক্ত বেলে-দোআঁশ মাটি এবং অনুকূল আবহাওয়া পান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নিয়ন্ত্রিত সেচব্যবস্থা, আগাছামুক্ত জমি, সঠিক পানি নিষ্কাশন ও নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি কৃষি বিভাগের আধুনিক পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে কৃষকরা এখানে সাফল্যের মুখ দেখছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় ১৫ বছরে ধীরে ধীরে এই এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে পান চাষের বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে এই তিন গ্রামের প্রায় ৩০০ জন কৃষক ৭০০টিরও বেশি বরজে নিয়মিত পান উৎপাদন করছেন। এখানকার বরজগুলোতে বাংলা, মিঠা, সাচি, কর্পূরী, গ্যাচ, নাতিয়াবাসুত, উজানী ও মাঘিসহ বিভিন্ন জাতের পান উৎপাদিত হচ্ছে, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মাগুড়া গ্রামের কৃষক অরূপ কুমার মণ্ডল ও বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল জানান, প্রথাগত ধান চাষের তুলনায় পান চাষে লাভের পরিমাণ অনেক বেশি এবং সারা বছরই এর ফলন পাওয়া যায়। ফলে এটি এখন এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

জালম গ্রামের অভিজ্ঞ পানচাষি বিধান চন্দ্র বিগত ১৫ বছর ধরে পান চাষের সাথে যুক্ত। বর্তমানে তাঁর ৫ বিঘা জমিতে পানের বরজ রয়েছে। খরচ ও লাভের হিসাব দিতে গিয়ে তিনি জানান, প্রতি বিঘা জমিতে বাঁশের কাঠামো নির্মাণ, সেচব্যবস্থা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ প্রাথমিক ব্যয় হয় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। একটি বরজ সাধারণত ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত ভালো উৎপাদন দেয় এবং প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার বরজ থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই পোয়া বা চার হাজারের বেশি পাতা পাওয়া যায়। বর্তমানে বাজারে বড় আকারের পান প্রতি পোয়া ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা, মাঝারি পান ১,Check৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা এবং ছোট আকারের পান ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আরেক সফল চাষি সুনীল চন্দ্র প্রামাণিক জানান, রোগবালাইমুক্ত থাকলে প্রতি বিঘা জমি থেকে এক মৌসুমে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার পান বিক্রি করা সম্ভব। উৎপাদিত এসব পান জয়পুরহাট, দিনাজপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা সরাসরি গ্রামে এসে কিনে নিয়ে যান।

সাফল্যের এই যাত্রাপথে কৃষকদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয় বর্ষা মৌসুমের 'দলাপচা' রোগ। তবে স্থানীয় কির্ত্তিপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধ ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করলে এই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এখানকার সাফল্য দেখে আশেপাশের এলাকার কৃষকরাও এখন বাণিজ্যিকভাবে পান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৪৩ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করতে এবং কৃষকদের অধিক মুনাফা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান অব্যাহত রয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬


পানের চাষে বদলে গেছে নওগাঁর তিন গ্রামের ভাগ্য

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৬

featured Image

একসময় যেখানে কৃষকদের স্বপ্ন সীমাবদ্ধ ছিল কেবল প্রথাগত মৌসুমি ফসলের আয়-ব্যয়ের হিসাবের মধ্যে, সেখানে আজ পানের বরজ এনে দিয়েছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। নওগাঁ সদর উপজেলার কির্ত্তিপুর ইউনিয়নের তিনটি গ্রাম—জালম, মাগুড়া ও জাগেশ্বর এখন শুধু তিনটি সাধারণ গ্রামের নাম নয়; এগুলো এখন গ্রামীণ অর্থনীতির ইতিবাচক পরিবর্তন, কৃষকের আত্মবিশ্বাস এবং স্বাবলম্বিতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। স্থানীয়ভাবে এই জনপদ এখন 'পানের গ্রাম' নামে পরিচিতি লাভ করেছে।

নওগাঁ সদর উপজেলা থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তিন গ্রামে প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস। বাড়ির আঙিনা থেকে শুরু করে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি—যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই কেবল সারি সারি পানের বরজ। স্থানীয় চাষিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই এলাকার উঁচু ও বন্যামুক্ত বেলে-দোআঁশ মাটি এবং অনুকূল আবহাওয়া পান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। নিয়ন্ত্রিত সেচব্যবস্থা, আগাছামুক্ত জমি, সঠিক পানি নিষ্কাশন ও নিয়মিত পরিচর্যার পাশাপাশি কৃষি বিভাগের আধুনিক পরামর্শকে কাজে লাগিয়ে কৃষকরা এখানে সাফল্যের মুখ দেখছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় ১৫ বছরে ধীরে ধীরে এই এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে পান চাষের বিস্তার ঘটেছে। বর্তমানে এই তিন গ্রামের প্রায় ৩০০ জন কৃষক ৭০০টিরও বেশি বরজে নিয়মিত পান উৎপাদন করছেন। এখানকার বরজগুলোতে বাংলা, মিঠা, সাচি, কর্পূরী, গ্যাচ, নাতিয়াবাসুত, উজানী ও মাঘিসহ বিভিন্ন জাতের পান উৎপাদিত হচ্ছে, যা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। মাগুড়া গ্রামের কৃষক অরূপ কুমার মণ্ডল ও বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল জানান, প্রথাগত ধান চাষের তুলনায় পান চাষে লাভের পরিমাণ অনেক বেশি এবং সারা বছরই এর ফলন পাওয়া যায়। ফলে এটি এখন এই অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

জালম গ্রামের অভিজ্ঞ পানচাষি বিধান চন্দ্র বিগত ১৫ বছর ধরে পান চাষের সাথে যুক্ত। বর্তমানে তাঁর ৫ বিঘা জমিতে পানের বরজ রয়েছে। খরচ ও লাভের হিসাব দিতে গিয়ে তিনি জানান, প্রতি বিঘা জমিতে বাঁশের কাঠামো নির্মাণ, সেচব্যবস্থা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ প্রাথমিক ব্যয় হয় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। একটি বরজ সাধারণত ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত ভালো উৎপাদন দেয় এবং প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার বরজ থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় দুই পোয়া বা চার হাজারের বেশি পাতা পাওয়া যায়। বর্তমানে বাজারে বড় আকারের পান প্রতি পোয়া ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা, মাঝারি পান ১,Check৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা এবং ছোট আকারের পান ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আরেক সফল চাষি সুনীল চন্দ্র প্রামাণিক জানান, রোগবালাইমুক্ত থাকলে প্রতি বিঘা জমি থেকে এক মৌসুমে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার পান বিক্রি করা সম্ভব। উৎপাদিত এসব পান জয়পুরহাট, দিনাজপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা সরাসরি গ্রামে এসে কিনে নিয়ে যান।

সাফল্যের এই যাত্রাপথে কৃষকদের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেয় বর্ষা মৌসুমের 'দলাপচা' রোগ। তবে স্থানীয় কির্ত্তিপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান জানান, কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধ ও ছত্রাকনাশক প্রয়োগ করলে এই রোগ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এখানকার সাফল্য দেখে আশেপাশের এলাকার কৃষকরাও এখন বাণিজ্যিকভাবে পান চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় মোট ৪৩ হেক্টর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করতে এবং কৃষকদের অধিক মুনাফা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা ও মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ প্রদান অব্যাহত রয়েছে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল