দিকপাল

আবাদের খরচই উঠছে না, ধানের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ মে ২০২৬ | ০৮:২৯ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

আবাদের খরচই উঠছে না, ধানের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা

রাজশাহীসহ পুরো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের চোখ জুড়ানো বাম্পার ফলন হয়েছে। দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে সোনালী ধানের সমারোহ দেখে যে কারও মন জুড়িয়ে গেলেও, দুঃখের বিষয় হলো যাদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে এই ফসল ফলেছে, সেই কৃষকদের মুখে কোনো হাসি নেই। তীব্র রোদ আর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে কষ্টেশিষ্টে ফলানো ধানের প্রত্যাশিত ও ন্যায্য দাম না পেয়ে উত্তরাঞ্চলের লাখো চাষি এখন চরম ক্ষোভ আর হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। মাঠের ফসল ঘরে তোলার এই আনন্দঘন সময়ে এসে তাদের হিসাব মেলাতে হচ্ছে নিট লোকসানের। উৎপাদন ও আনুষঙ্গিক খরচ আকাশচুম্বী হওয়ায় এবার প্রতি বিঘা বোরো আবাদ করতেই কৃষকদের গুনতে হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। এর সাথে ধান কাটা, মাড়াই করা এবং তা সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে ঘরে তুলতে যোগ হচ্ছে আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার অতিরিক্ত খরচ। সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি একজন কৃষকের পকেট থেকে মোট বেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা।

স্থানীয় প্রান্তিক চাষি ও কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে গড়ে প্রতি বিঘাতে বোরো ধানের ফলন পাওয়া যাচ্ছে ২০ থেকে ২২ মণ। তবে বর্তমান বাজারে ধানের যে দর চলছে, তাতে প্রতি মণ ধান মাত্র ১ হাজার ১২০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এই নামমাত্র মূল্যে বাজারে ধান বিক্রি করে একজন কৃষক বিঘাপ্রতি সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার ৫০০ টাকা ঘরে তুলতে পারছেন। ফলে খুব সাধারণ হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, প্রতি বিঘা জমিতে বোরো চাষ করে কৃষকদের সরাসরি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পকেট থেকে লোকসান দিতে হচ্ছে। ধানের বিভিন্ন জাত ও মানভেদে এই লোকসানের পরিমাণ কোথাও কোথাও আরও অনেক বেশি দাঁড়িয়েছে। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কামারপাড়া এলাকার এক ভুক্তভোগী কৃষক জানান, তিনি এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে উফশী জাতের বোরো চাষ করেছিলেন। জমি তৈরি, উন্নত বীজ, রাসায়নিক সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের নিয়মিত মজুরি বাবদ তাঁর খরচ হয়েছিল ৭৮ হাজার টাকা। পরবর্তীতে ধান পাকার পর তা কেটে মাড়াই করার জন্য শ্রমিকদের সাথে বিঘাপ্রতি সাত হাজার টাকা করে চুক্তি করতে হয় এবং সেখানে আরও ২৫ হাজার টাকা নগদ দিতে হয়। সব মিলিয়ে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে তাঁর মোট খরচ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। অথচ স্থানীয় মোকামে বিআর-২৮ জাতের ধান ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে তিনি মোট পেয়েছেন মাত্র ৯১ gold হাজার ২৫০ টাকা। অর্থাৎ সাড়ে তিন বিঘা জমিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাঁর নিট লোকসান হয়েছে ১১ হাজার ৭৫০ টাকা।

উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের এই চরম দুর্গতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানির অঘোষিত সিন্ডিকেট। ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, উত্তরবঙ্গের বড় বড় ধানের মোকামগুলোতে এখন কয়েকটি নামী কোম্পানির নিযুক্ত এজেন্টরা নিজেদের মধ্যে একচেটিয়া বোঝাপড়া করে প্রতিদিন ধানের দাম নির্ধারণ করেন। ফলে বাজারে ধানের পর্যাপ্ত আমদানী থাকলেও কৃষকেরা বাধ্য হয়ে সেই সিন্ডিকেটের বেঁধে দেওয়া কম দামেই ধান বিক্রি করে শূন্য পকেটে বাড়ি ফিরছেন। নওগাঁর মান্দা উপজেলার এক প্রবীণ চাষি আক্ষেপ করে জানান, আগে এই অঞ্চলের প্রতিটি গ্রাম ও বাজারে অসংখ্য ধানের চাতাল সচল ছিল। সেই চাতাল মালিকেরা সরাসরি হাটবাজার থেকে সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতেন এবং চাল তৈরি করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করতেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের চালের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি বড় বড় জায়ান্ট কোম্পানির দখলে চলে গেছে। যার ফলে রাজশাহী, নওগাঁ ও বগুড়াসহ প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলের শত শত ক্ষুদ্র চাতাল লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে। বড় কোম্পানিগুলোর অসম প্রতিযোগিতার মুখে টিকতে না পেরে চাতাল মালিকেরা ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ায় এখন উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ কৃষক মূলত এই বড় বড় কোম্পানির এজেন্টদের কাছে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

এদিকে চাষিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো কৃষি উপকরণের দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি। রাজশাহীর বাগমারা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কৃষকেরা জানান, এবার বাজারে ডিজেলের দাম বেশি থাকায় সেচ বাবদ তাদের বিপুল টাকা খরচ করতে হয়েছে। পাশাপাশি চড়া দামে সার ও কীটনাশক কিনতে হয়েছে। অর্থাৎ ফসল উৎপাদনের প্রতিটি ধাপেই খরচ বাড়লেও বাজারে ধানের দাম গত বছরের তুলনায় বেশ কম। কেশরহাট এলাকার চাষিদের মতে, ধানের বাজারের ওপর প্রকৃত কৃষকের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা হাত নেই। যখনই মাঠ থেকে নতুন ধান ওঠে, তখনই একদল শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও মজুতদার সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেয়। তারা কম দামে কৃষকের বুকভাঙা কষ্টের ধান কিনে গুদামজাত করে রাখছে এবং মাত্র কয়েক মাস পরেই এই ধান চড়া দামে বাজারে ছেড়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেবে।

যদিও বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারিভাবে গত ১৫ মে থেকে রাজশাহীসহ পুরো উত্তরাঞ্চলের সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে সরাসরি ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হয়েছে। সরকারের খাদ্য বিভাগ প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা অর্থাৎ মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছে, যা বর্তমান খোলা বাজারের চেয়ে প্রায় তিনশত টাকা বেশি। কিন্তু এই সরকারি উদ্যোগও সাধারণ ও প্রকৃত কৃষকদের কোনো উপকারে আসছে না, কারণ খাদ্যগুদামগুলোতেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অপতৎপরতার কারণে সাধারণ চাষিরা সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারছেন না। অবশ্য আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কিনতে চান, কিন্তু সরকারি গুদামে ধান বিক্রির প্রক্রিয়াকে জটিল মনে করে অনেক সময় কৃষকেরা নিজ থেকে আসতে চান না। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. আব্দুল মজিদ জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের হাওড় অঞ্চলে বোরোর ক্ষতি হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আশাতীত ও বাম্পার ফলন হয়েছে। খরচ বৃদ্ধির তুলনায় কৃষকেরা কিছুটা কম দাম পেলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারের ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পুরোপুরি জোরদার হলে খুব দ্রুতই খোলা বাজারে ধানের দাম বাড়বে এবং কৃষকেরা তাদের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন। সব মিলিয়ে, দেশের অন্নদাতাদের বাঁচাতে এবং বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

রোববার, ২৪ মে ২০২৬


আবাদের খরচই উঠছে না, ধানের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা

প্রকাশের তারিখ : ২৩ মে ২০২৬

featured Image

রাজশাহীসহ পুরো উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের চোখ জুড়ানো বাম্পার ফলন হয়েছে। দিগন্তজোড়া মাঠজুড়ে সোনালী ধানের সমারোহ দেখে যে কারও মন জুড়িয়ে গেলেও, দুঃখের বিষয় হলো যাদের হাড়ভাঙা খাটুনিতে এই ফসল ফলেছে, সেই কৃষকদের মুখে কোনো হাসি নেই। তীব্র রোদ আর হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে কষ্টেশিষ্টে ফলানো ধানের প্রত্যাশিত ও ন্যায্য দাম না পেয়ে উত্তরাঞ্চলের লাখো চাষি এখন চরম ক্ষোভ আর হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন। মাঠের ফসল ঘরে তোলার এই আনন্দঘন সময়ে এসে তাদের হিসাব মেলাতে হচ্ছে নিট লোকসানের। উৎপাদন ও আনুষঙ্গিক খরচ আকাশচুম্বী হওয়ায় এবার প্রতি বিঘা বোরো আবাদ করতেই কৃষকদের গুনতে হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা। এর সাথে ধান কাটা, মাড়াই করা এবং তা সম্পূর্ণ প্রস্তুত করে ঘরে তুলতে যোগ হচ্ছে আরও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার অতিরিক্ত খরচ। সব মিলিয়ে বিঘাপ্রতি একজন কৃষকের পকেট থেকে মোট বেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকা।

স্থানীয় প্রান্তিক চাষি ও কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে গড়ে প্রতি বিঘাতে বোরো ধানের ফলন পাওয়া যাচ্ছে ২০ থেকে ২২ মণ। তবে বর্তমান বাজারে ধানের যে দর চলছে, তাতে প্রতি মণ ধান মাত্র ১ হাজার ১২০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এই নামমাত্র মূল্যে বাজারে ধান বিক্রি করে একজন কৃষক বিঘাপ্রতি সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার ৫০০ টাকা ঘরে তুলতে পারছেন। ফলে খুব সাধারণ হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, প্রতি বিঘা জমিতে বোরো চাষ করে কৃষকদের সরাসরি দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা পকেট থেকে লোকসান দিতে হচ্ছে। ধানের বিভিন্ন জাত ও মানভেদে এই লোকসানের পরিমাণ কোথাও কোথাও আরও অনেক বেশি দাঁড়িয়েছে। রাজশাহীর মোহনপুর উপজেলার কামারপাড়া এলাকার এক ভুক্তভোগী কৃষক জানান, তিনি এবার সাড়ে তিন বিঘা জমিতে উফশী জাতের বোরো চাষ করেছিলেন। জমি তৈরি, উন্নত বীজ, রাসায়নিক সার, সেচ, কীটনাশক ও শ্রমিকের নিয়মিত মজুরি বাবদ তাঁর খরচ হয়েছিল ৭৮ হাজার টাকা। পরবর্তীতে ধান পাকার পর তা কেটে মাড়াই করার জন্য শ্রমিকদের সাথে বিঘাপ্রতি সাত হাজার টাকা করে চুক্তি করতে হয় এবং সেখানে আরও ২৫ হাজার টাকা নগদ দিতে হয়। সব মিলিয়ে সাড়ে তিন বিঘা জমিতে তাঁর মোট খরচ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩ হাজার টাকা। অথচ স্থানীয় মোকামে বিআর-২৮ জাতের ধান ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করে তিনি মোট পেয়েছেন মাত্র ৯১ gold হাজার ২৫০ টাকা। অর্থাৎ সাড়ে তিন বিঘা জমিতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তাঁর নিট লোকসান হয়েছে ১১ হাজার ৭৫০ টাকা।

উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের এই চরম দুর্গতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে বড় বড় কর্পোরেট কোম্পানির অঘোষিত সিন্ডিকেট। ভুক্তভোগী কৃষকদের অভিযোগ, উত্তরবঙ্গের বড় বড় ধানের মোকামগুলোতে এখন কয়েকটি নামী কোম্পানির নিযুক্ত এজেন্টরা নিজেদের মধ্যে একচেটিয়া বোঝাপড়া করে প্রতিদিন ধানের দাম নির্ধারণ করেন। ফলে বাজারে ধানের পর্যাপ্ত আমদানী থাকলেও কৃষকেরা বাধ্য হয়ে সেই সিন্ডিকেটের বেঁধে দেওয়া কম দামেই ধান বিক্রি করে শূন্য পকেটে বাড়ি ফিরছেন। নওগাঁর মান্দা উপজেলার এক প্রবীণ চাষি আক্ষেপ করে জানান, আগে এই অঞ্চলের প্রতিটি গ্রাম ও বাজারে অসংখ্য ধানের চাতাল সচল ছিল। সেই চাতাল মালিকেরা সরাসরি হাটবাজার থেকে সাধারণ কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনতেন এবং চাল তৈরি করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করতেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে দেশের চালের বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ কয়েকটি বড় বড় জায়ান্ট কোম্পানির দখলে চলে গেছে। যার ফলে রাজশাহী, নওগাঁ ও বগুড়াসহ প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলের শত শত ক্ষুদ্র চাতাল লোকসানের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে। বড় কোম্পানিগুলোর অসম প্রতিযোগিতার মুখে টিকতে না পেরে চাতাল মালিকেরা ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ায় এখন উত্তরাঞ্চলের লাখ লাখ কৃষক মূলত এই বড় বড় কোম্পানির এজেন্টদের কাছে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

এদিকে চাষিদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ হলো কৃষি উপকরণের দামের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতি। রাজশাহীর বাগমারা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার কৃষকেরা জানান, এবার বাজারে ডিজেলের দাম বেশি থাকায় সেচ বাবদ তাদের বিপুল টাকা খরচ করতে হয়েছে। পাশাপাশি চড়া দামে সার ও কীটনাশক কিনতে হয়েছে। অর্থাৎ ফসল উৎপাদনের প্রতিটি ধাপেই খরচ বাড়লেও বাজারে ধানের দাম গত বছরের তুলনায় বেশ কম। কেশরহাট এলাকার চাষিদের মতে, ধানের বাজারের ওপর প্রকৃত কৃষকের কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা হাত নেই। যখনই মাঠ থেকে নতুন ধান ওঠে, তখনই একদল শক্তিশালী মধ্যস্বত্বভোগী ও মজুতদার সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়ে দেয়। তারা কম দামে কৃষকের বুকভাঙা কষ্টের ধান কিনে গুদামজাত করে রাখছে এবং মাত্র কয়েক মাস পরেই এই ধান চড়া দামে বাজারে ছেড়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেবে।

যদিও বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারিভাবে গত ১৫ মে থেকে রাজশাহীসহ পুরো উত্তরাঞ্চলের সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে সরাসরি ধান ও চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু করা হয়েছে। সরকারের খাদ্য বিভাগ প্রতি কেজি ধান ৩৬ টাকা অর্থাৎ মণপ্রতি ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে কেনার ঘোষণা দিয়েছে, যা বর্তমান খোলা বাজারের চেয়ে প্রায় তিনশত টাকা বেশি। কিন্তু এই সরকারি উদ্যোগও সাধারণ ও প্রকৃত কৃষকদের কোনো উপকারে আসছে না, কারণ খাদ্যগুদামগুলোতেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অপতৎপরতার কারণে সাধারণ চাষিরা সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারছেন না। অবশ্য আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন যে, তারা সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকেই ধান কিনতে চান, কিন্তু সরকারি গুদামে ধান বিক্রির প্রক্রিয়াকে জটিল মনে করে অনেক সময় কৃষকেরা নিজ থেকে আসতে চান না। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. আব্দুল মজিদ জানান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের হাওড় অঞ্চলে বোরোর ক্ষতি হলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে আশাতীত ও বাম্পার ফলন হয়েছে। খরচ বৃদ্ধির তুলনায় কৃষকেরা কিছুটা কম দাম পেলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারের ধান সংগ্রহ কার্যক্রম পুরোপুরি জোরদার হলে খুব দ্রুতই খোলা বাজারে ধানের দাম বাড়বে এবং কৃষকেরা তাদের লোকসান কাটিয়ে উঠতে পারবেন। সব মিলিয়ে, দেশের অন্নদাতাদের বাঁচাতে এবং বাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করতে দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল