দিকপাল

দুই দশক পর ভোটে যাচ্ছে ফিলিস্তিন


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬ | ০৩:০১ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

দুই দশক পর ভোটে যাচ্ছে ফিলিস্তিন

আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র চাপ এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রমাণের অংশ হিসেবে দীর্ঘ ২০ বছর পর ফিলিস্তিনে সাধারণ (আইনসভা) নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এক প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রি বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে তিনি আগামী ২৮ নভেম্বর এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক ঘোষণার তথ্য জানানো হয়েছে।

এই নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের সমস্ত ভূখণ্ড—অর্থাৎ অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে একযোগে এই আইনসভা বা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত এই ভোট সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা হবে গত দুই দশকের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এর আগে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সর্বশেষ ২০০৬ সালে আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ‘ফাতাহ’-কে স্তব্ধ করে দিয়ে আকস্মিক ও বিশাল জয় পেয়েছিল ইসলামপন্থি প্রতিরোধ আন্দোলন ‘হামাস’। ওই নির্বাচনি ফলাফলের জের ধরে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিভাজন তৈরি হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে ফাতাহ বাহিনীকে হটিয়ে গাজা উপত্যকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় হামাস। এরপর থেকে পশ্চিম তীরে ফাতাহ এবং গাজায় হামাসের পৃথক শাসন চলে আসছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা নূর ওদেহ জানিয়েছেন, এই আকস্মিক নির্বাচনি ঘোষণাটি মূলত ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এবং বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার দীর্ঘ আলোচনারই সরাসরি ফলাফল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) শাসনব্যবস্থায় সংস্কার, দুর্নীতি দূরীকরণ এবং গণতান্ত্রিক বৈধতা ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা, ফ্রান্স, সৌদি আরব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ মাহমুদ আব্বাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। তাছাড়া আগামী সপ্তাহে ব্রাসেলসে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দাতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চরম আর্থিক সংকটে থাকা ফিলিস্তিনি প্রশাসন এই নির্বাচনের ঘোষণার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বন্ধুভাবাপন্ন আরব দেশগুলোর কাছ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম করতে চাইছে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং গাজা উপত্যকার বর্তমান ধ্বংসাত্মক বাস্তবতায় আগামী নভেম্বরের মধ্যে হামাস ও ফাতাহ এক টেবিলে বসে পুরো ফিলিস্তিনে এই নির্বাচন কীভাবে এবং কতটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে গভীর সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত ভোট দেওয়ার অনুমতি দেবে কি না, সেটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর আগে ২০২১ সালেও মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের ভোটগ্রহণের অনুমতি না দেওয়ার অজুহাতে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছিলেন। তাছাড়া নতুন নির্বাচনি আইন অনুযায়ী সব প্রার্থীকে পিএলও-র (PLO) রাজনৈতিক কর্মসূচি মেনে চলা ও ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, যা হামাসের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনের ভাগ্য এখনও অনেকখানি অনিশ্চিত।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬


দুই দশক পর ভোটে যাচ্ছে ফিলিস্তিন

প্রকাশের তারিখ : ১০ জুলাই ২০২৬

featured Image

আন্তর্জাতিক মহলের তীব্র চাপ এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রমাণের অংশ হিসেবে দীর্ঘ ২০ বছর পর ফিলিস্তিনে সাধারণ (আইনসভা) নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। গত বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) এক প্রেসিডেন্সিয়াল ডিক্রি বা অধ্যাদেশের মাধ্যমে তিনি আগামী ২৮ নভেম্বর এই নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে এই ঐতিহাসিক ঘোষণার তথ্য জানানো হয়েছে।

এই নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ফিলিস্তিনের সমস্ত ভূখণ্ড—অর্থাৎ অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুজালেমে একযোগে এই আইনসভা বা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যদি শেষ পর্যন্ত এই ভোট সফলভাবে সম্পন্ন হয়, তবে তা হবে গত দুই দশকের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। এর আগে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সর্বশেষ ২০০৬ সালে আইনসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই নির্বাচনে মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ‘ফাতাহ’-কে স্তব্ধ করে দিয়ে আকস্মিক ও বিশাল জয় পেয়েছিল ইসলামপন্থি প্রতিরোধ আন্দোলন ‘হামাস’। ওই নির্বাচনি ফলাফলের জের ধরে ফাতাহ ও হামাসের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও বিভাজন তৈরি হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংঘাতের মধ্য দিয়ে ফাতাহ বাহিনীকে হটিয়ে গাজা উপত্যকার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় হামাস। এরপর থেকে পশ্চিম তীরে ফাতাহ এবং গাজায় হামাসের পৃথক শাসন চলে আসছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আল জাজিরার সংবাদদাতা নূর ওদেহ জানিয়েছেন, এই আকস্মিক নির্বাচনি ঘোষণাটি মূলত ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব এবং বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার দীর্ঘ আলোচনারই সরাসরি ফলাফল। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (PA) শাসনব্যবস্থায় সংস্কার, দুর্নীতি দূরীকরণ এবং গণতান্ত্রিক বৈধতা ফিরিয়ে আনার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা, ফ্রান্স, সৌদি আরব এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশ মাহমুদ আব্বাসের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছিল। তাছাড়া আগামী সপ্তাহে ব্রাসেলসে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দাতা সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। চরম আর্থিক সংকটে থাকা ফিলিস্তিনি প্রশাসন এই নির্বাচনের ঘোষণার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বন্ধুভাবাপন্ন আরব দেশগুলোর কাছ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাওয়ার পথ সুগম করতে চাইছে।

তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধাবস্থা এবং গাজা উপত্যকার বর্তমান ধ্বংসাত্মক বাস্তবতায় আগামী নভেম্বরের মধ্যে হামাস ও ফাতাহ এক টেবিলে বসে পুরো ফিলিস্তিনে এই নির্বাচন কীভাবে এবং কতটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে গভীর সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েল শেষ পর্যন্ত ভোট দেওয়ার অনুমতি দেবে কি না, সেটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর আগে ২০২১ সালেও মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিনে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিলেও পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলের ভোটগ্রহণের অনুমতি না দেওয়ার অজুহাতে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছিলেন। তাছাড়া নতুন নির্বাচনি আইন অনুযায়ী সব প্রার্থীকে পিএলও-র (PLO) রাজনৈতিক কর্মসূচি মেনে চলা ও ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, যা হামাসের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনের ভাগ্য এখনও অনেকখানি অনিশ্চিত।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল