ঢাকার বড় বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এবং হাসপাতালের বারান্দায় রোগীর উপচে পড়া ভিড় দূর করতে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আজ রবিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকার ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে হাসপাতালের বারান্দায় মেঝেতে শুয়ে থাকতে হয়। ঢাকার ভেতরের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে যদি সব ধরনের আধুনিক চিকিৎসার সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে মানুষ নিজ জেলাতেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবেন এবং ঢাকার ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
বাজেটকে কেবল অর্থ ও সংখ্যার খেলা না ভাবার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিগত ১৫ বছরের দুঃশাসনে দেশের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে এবার বাজেট বরাদ্দ গত বছরের ৩৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ—অর্থাৎ ৬৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এই বাজেটকে তিনি ‘জীবন ও জমি রক্ষার বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এটি ঢাকার হাসপাতালের বারান্দায় ঘুমানো ক্যানসার রোগী, হার্ট অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা মানুষ এবং ছানি পড়া লাখো প্রবীণ মানুষের দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার মানবিক দলিল। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য একটি সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।
বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং অসংক্রামক ব্যাধিকে চিহ্নিত করেন এম এ মুহিত। তিনি জানান, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ ভাগই ঘটছে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন বা কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধির কারণে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, চিকিৎসার মোট খরচের ৭৯ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে, যা থাইল্যান্ডে মাত্র ১০ শতাংশ। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এখন অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ না করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, রেফারাল নেটওয়ার্ক তৈরি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে জোর দিচ্ছে।
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধী পক্ষ কেবল ক্ষমতার অংশীদারিত্বের সংস্কার নিয়ে কথা বলে, কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের মূল সংস্কার নিয়ে তারা নীরব। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের দেওয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সরকার চিকিৎসা পদ্ধতি এবং কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। বক্তব্যের শেষাংশে তিনি তাঁর নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের নদীভাঙন কবলিত মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন এবং চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য জাতীয়ভাবে একটি ‘চর উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলার জোর দাবি জানান।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো বিকেন্দ্রীকরণের অভাব, যার ফলে সামান্য জটিল রোগের চিকিৎসার জন্যও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগীদের রাজধানীমুখী হতে হয়। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের বারান্দায় বা মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার দৃশ্য দীর্ঘদিনের চেনা চিত্র। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা এবং জেলা হাসপাতালগুলোকে পূর্ণাঙ্গ করার এই পরিকল্পনাকে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত রূপান্তর হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

রোববার, ২৮ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ জুন ২০২৬
ঢাকার বড় বড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে এবং হাসপাতালের বারান্দায় রোগীর উপচে পড়া ভিড় দূর করতে দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালকে পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন করে গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আজ রবিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঢাকার ৫০০ শয্যার একটি হাসপাতালে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার রোগীকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে হাসপাতালের বারান্দায় মেঝেতে শুয়ে থাকতে হয়। ঢাকার ভেতরের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামো বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে যদি সব ধরনের আধুনিক চিকিৎসার সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, তবে মানুষ নিজ জেলাতেই কাঙ্ক্ষিত সেবা পাবেন এবং ঢাকার ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসবে।
বাজেটকে কেবল অর্থ ও সংখ্যার খেলা না ভাবার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিগত ১৫ বছরের দুঃশাসনে দেশের ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজাতে এবার বাজেট বরাদ্দ গত বছরের ৩৫ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় দ্বিগুণ—অর্থাৎ ৬৯ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে। এই বাজেটকে তিনি ‘জীবন ও জমি রক্ষার বাজেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এটি ঢাকার হাসপাতালের বারান্দায় ঘুমানো ক্যানসার রোগী, হার্ট অপারেশনের অপেক্ষায় থাকা মানুষ এবং ছানি পড়া লাখো প্রবীণ মানুষের দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার মানবিক দলিল। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য একটি সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।
বক্তব্যে দেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিকিৎসার উচ্চ ব্যয় এবং অসংক্রামক ব্যাধিকে চিহ্নিত করেন এম এ মুহিত। তিনি জানান, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ ভাগই ঘটছে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন বা কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধির কারণে। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, চিকিৎসার মোট খরচের ৭৯ শতাংশই রোগীকে নিজের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে, যা থাইল্যান্ডে মাত্র ১০ শতাংশ। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার এখন অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ না করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, রেফারাল নেটওয়ার্ক তৈরি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করতে জোর দিচ্ছে।
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিরোধী পক্ষ কেবল ক্ষমতার অংশীদারিত্বের সংস্কার নিয়ে কথা বলে, কিন্তু স্বাস্থ্য খাতের মূল সংস্কার নিয়ে তারা নীরব। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের দেওয়া রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সরকার চিকিৎসা পদ্ধতি এবং কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে। বক্তব্যের শেষাংশে তিনি তাঁর নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনের নদীভাঙন কবলিত মানুষের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন এবং চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য জাতীয়ভাবে একটি ‘চর উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ গড়ে তোলার জোর দাবি জানান।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো বিকেন্দ্রীকরণের অভাব, যার ফলে সামান্য জটিল রোগের চিকিৎসার জন্যও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগীদের রাজধানীমুখী হতে হয়। সরকারি হাসপাতালে শয্যা সংকটের কারণে রোগীদের বারান্দায় বা মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নেওয়ার দৃশ্য দীর্ঘদিনের চেনা চিত্র। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা এবং জেলা হাসপাতালগুলোকে পূর্ণাঙ্গ করার এই পরিকল্পনাকে দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত রূপান্তর হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

আপনার মতামত লিখুন