দিকপাল

কঙ্গো-উগান্ডায় ইবোলার ভয়াবহ থাবা, মাসেই মৃত্যু ২০০ ছাড়াল


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬ | ১১:৩৯ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

কঙ্গো-উগান্ডায় ইবোলার ভয়াবহ থাবা, মাসেই মৃত্যু ২০০ ছাড়াল

কঙ্গো এবং উগান্ডা সীমান্ত অঞ্চলে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে আফ্রিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, রোগটি শনাক্ত হওয়ার প্রথম এক মাসের মধ্যেই দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি কতটা নাজুক তা অনুধাবন করা যায় সংক্রমণের পরিসংখ্যান থেকে; প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৮৯৪ জন আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, যা বিগত বছরগুলোতে উগান্ডায় হওয়া একই ধরণের প্রাদুর্ভাবের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রাদুর্ভাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার অনেক আগেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। গত এক সপ্তাহেই সংক্রমণের হার ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

পূর্ব কঙ্গোর ৩২টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে এবং প্রাদুর্ভাবের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইতুরি প্রদেশ, যেখানে মোট আক্রান্তের ৯০ শতাংশের বেশি শনাক্ত হয়েছে। এই সংক্রমণের নেপথ্যে রয়েছে ‘বান্দিবুগিও’ নামের এক বিরল ইবোলা ভাইরাস। উদ্বেগের বিষয় হলো, এর আগে কঙ্গোতে যেসব প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল তার জন্য দায়ী ‘জায়ের’ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা থাকলেও, বর্তমান এই বান্দিবুগিও ভাইরাসের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। যদিও চিকিৎসকরা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিভিত্তিক একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তবুও পর্যাপ্ত টিকার অভাব এবং চিকিৎসা সংকটে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও এই রোগের সংক্রমণ পৌঁছেছে এবং সেখানেও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম এবং সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। নিয়ম অনুযায়ী, ৮৯৪ জনের নিশ্চিত সংক্রমণের বিপরীতে প্রায় ১৭ হাজার থেকে ৩৫ হাজার মানুষের সংস্পর্শে আসার তালিকা থাকার কথা থাকলেও, স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন পর্যন্ত মাত্র চার হাজার মানুষের খোঁজ পেয়েছেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ১৫ শতাংশের কম অংশকে এই নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা সংক্রমণ রোধে বড় ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইতুরি প্রদেশের দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে প্রায় দশ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যারা নিয়মিত স্থান পরিবর্তন করায় তাদের খুঁজে বের করা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এছাড়া এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলের তীব্র ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ৯০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তার মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ অর্থ পাওয়া গেছে। একই ধরণের ঘাটতি রয়েছে দক্ষ জনবলের ক্ষেত্রেও; যেখানে অন্তত পাঁচশ ৪০ জন বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ৮৪ জন। খনি শ্রমিকদের নিয়মিত যাতায়াত, ঘন বন ও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার কারণে পুরো অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য এখন চরম হুমকির মুখে। আফ্রিকা সিডিসির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি দ্রুত প্রতিশ্রুত অর্থ ও সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানানো হয়েছে, কারণ এই সংকট সমাধানে বিলম্ব হলে তা কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


কঙ্গো-উগান্ডায় ইবোলার ভয়াবহ থাবা, মাসেই মৃত্যু ২০০ ছাড়াল

প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬

featured Image

কঙ্গো এবং উগান্ডা সীমান্ত অঞ্চলে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত করেছে আফ্রিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র। সংস্থাটির দেওয়া তথ্যমতে, রোগটি শনাক্ত হওয়ার প্রথম এক মাসের মধ্যেই দুই শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি কতটা নাজুক তা অনুধাবন করা যায় সংক্রমণের পরিসংখ্যান থেকে; প্রাদুর্ভাব শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৮৯৪ জন আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে, যা বিগত বছরগুলোতে উগান্ডায় হওয়া একই ধরণের প্রাদুর্ভাবের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, প্রাদুর্ভাব আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার অনেক আগেই ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ায় প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি হতে পারে। গত এক সপ্তাহেই সংক্রমণের হার ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়া পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

পূর্ব কঙ্গোর ৩২টি স্বাস্থ্য অঞ্চলে এই ভাইরাসের বিস্তার ঘটেছে এবং প্রাদুর্ভাবের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইতুরি প্রদেশ, যেখানে মোট আক্রান্তের ৯০ শতাংশের বেশি শনাক্ত হয়েছে। এই সংক্রমণের নেপথ্যে রয়েছে ‘বান্দিবুগিও’ নামের এক বিরল ইবোলা ভাইরাস। উদ্বেগের বিষয় হলো, এর আগে কঙ্গোতে যেসব প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল তার জন্য দায়ী ‘জায়ের’ ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা থাকলেও, বর্তমান এই বান্দিবুগিও ভাইরাসের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা পদ্ধতি নেই। যদিও চিকিৎসকরা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে মনোক্লোনাল অ্যান্টিবডিভিত্তিক একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, তবুও পর্যাপ্ত টিকার অভাব এবং চিকিৎসা সংকটে সাধারণ মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। ইতোমধ্যে প্রতিবেশী দেশ উগান্ডাতেও এই রোগের সংক্রমণ পৌঁছেছে এবং সেখানেও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা। প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকিতে থাকা এলাকাগুলো ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত দুর্গম এবং সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। নিয়ম অনুযায়ী, ৮৯৪ জনের নিশ্চিত সংক্রমণের বিপরীতে প্রায় ১৭ হাজার থেকে ৩৫ হাজার মানুষের সংস্পর্শে আসার তালিকা থাকার কথা থাকলেও, স্বাস্থ্যকর্মীরা এখন পর্যন্ত মাত্র চার হাজার মানুষের খোঁজ পেয়েছেন এবং তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ, ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ১৫ শতাংশের কম অংশকে এই নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে, যা সংক্রমণ রোধে বড় ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ইতুরি প্রদেশের দীর্ঘদিনের সংঘাত ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে প্রায় দশ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যারা নিয়মিত স্থান পরিবর্তন করায় তাদের খুঁজে বের করা স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এছাড়া এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলের তীব্র ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো থেকে ৯০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত তার মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ অর্থ পাওয়া গেছে। একই ধরণের ঘাটতি রয়েছে দক্ষ জনবলের ক্ষেত্রেও; যেখানে অন্তত পাঁচশ ৪০ জন বিশেষজ্ঞ ও স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন, সেখানে বর্তমানে কাজ করছেন মাত্র ৮৪ জন। খনি শ্রমিকদের নিয়মিত যাতায়াত, ঘন বন ও দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার কারণে পুরো অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য এখন চরম হুমকির মুখে। আফ্রিকা সিডিসির পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রতি দ্রুত প্রতিশ্রুত অর্থ ও সহায়তা প্রদানের আহ্বান জানানো হয়েছে, কারণ এই সংকট সমাধানে বিলম্ব হলে তা কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সামগ্রিক অঞ্চলের জন্য বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল