বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের প্রচলিত লটারিভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা বাতিল করে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পুনরায় পরীক্ষাভিত্তিক মেধা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে এবার কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো একক ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানান। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক কমিটি বর্তমান জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-জুন করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান, নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ বা সংশ্লিষ্ট এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও দূরত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়ন করা হবে। মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে পূর্বের মতো একক কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি এবার থাকছে না। প্রতিটি এলাকার পরিস্থিতি ও অবকাঠামো অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বাধীনভাবে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ফলে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই ধরনের পরীক্ষা বা পদ্ধতি থাকবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাগত ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ঘরের কাছের স্কুলে পড়ার অগ্রাধিকার দিতেই এই নতুন পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। তবে পরীক্ষার ধরন, নম্বর বণ্টন বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং ভর্তি নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।
মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অতিরিক্ত মানসিক ও পাঠ্যক্রমের চাপ কমানো এবং দীর্ঘদিনের লার্নিং গ্যাপ বা শেখার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত সরকারি পরামর্শক কমিটি পাবলিক পরীক্ষা মাত্র পাঁচটি মূল বিষয়ে সীমিত রাখার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য সার্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক কমিটির প্রস্তাবনা অনুযায়ী:
কেন্দ্রীয় লিখিত পরীক্ষা: কেবল বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়কে কেন্দ্রীয় পাবলিক পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
মূল্যায়নের বিকল্প পদ্ধতি: ডিজিটাল প্রযুক্তি, ধর্মশিক্ষা, শরীরচর্চা এবং চারুকলার মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্রীয় লিখিত পরীক্ষার বাইরে রেখে বিকল্প পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হবে।
বর্তমান জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষকে একটি ‘ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা পরিবর্তনের দূরদর্শী প্রস্তাব দিয়েছে পরামর্শক কমিটি। নতুন শিক্ষাবর্ষ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে জুন পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির মতে, জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশে তীব্র বর্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়, তাই এই দুই মাস দীর্ঘ ছুটি রাখার পরিকল্পনা করা যৌক্তিক।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কনসালটেশন কমিটির আহ্বায়ক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ এই সংস্কার প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে দেশের শিক্ষা খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন: "মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সংবেদনশীল সময়। তাই এ স্তরে বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষা খাত দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাশিত মনোযোগ পায়নি। জিডিপির (GDP) ২ শতাংশের কম বাজেট বরাদ্দই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।"
মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির এই নতুন সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে যেমন ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তন ও পরীক্ষা পুনর্বহাল নিয়ে নীতিগত পর্যায়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা শুরু হয়েছে।

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুন ২০২৬
বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের প্রচলিত লটারিভিত্তিক ভর্তি ব্যবস্থা বাতিল করে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে পুনরায় পরীক্ষাভিত্তিক মেধা মূল্যায়ন পদ্ধতিতে ফিরে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে এবার কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো একক ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে না। বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সরকারের এই নীতিগত সিদ্ধান্তের কথা জানান। একই সঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শক কমিটি বর্তমান জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তন করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-জুন করার মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পেশ করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান, নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে ‘ক্যাচমেন্ট এরিয়া’ বা সংশ্লিষ্ট এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও দূরত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনা করে পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়ন করা হবে। মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে পূর্বের মতো একক কেন্দ্রীয় ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি এবার থাকছে না। প্রতিটি এলাকার পরিস্থিতি ও অবকাঠামো অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বাধীনভাবে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করবে। ফলে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একই ধরনের পরীক্ষা বা পদ্ধতি থাকবে না। শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাগত ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ঘরের কাছের স্কুলে পড়ার অগ্রাধিকার দিতেই এই নতুন পদ্ধতি চালু করা হচ্ছে। তবে পরীক্ষার ধরন, নম্বর বণ্টন বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাঠামো এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং ভর্তি নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।
মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অতিরিক্ত মানসিক ও পাঠ্যক্রমের চাপ কমানো এবং দীর্ঘদিনের লার্নিং গ্যাপ বা শেখার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত সরকারি পরামর্শক কমিটি পাবলিক পরীক্ষা মাত্র পাঁচটি মূল বিষয়ে সীমিত রাখার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সবার জন্য সার্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। পরামর্শক কমিটির প্রস্তাবনা অনুযায়ী:
কেন্দ্রীয় লিখিত পরীক্ষা: কেবল বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞান বিষয়কে কেন্দ্রীয় পাবলিক পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
মূল্যায়নের বিকল্প পদ্ধতি: ডিজিটাল প্রযুক্তি, ধর্মশিক্ষা, শরীরচর্চা এবং চারুকলার মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্রীয় লিখিত পরীক্ষার বাইরে রেখে বিকল্প পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা হবে।
বর্তমান জানুয়ারি-ডিসেম্বর শিক্ষাবর্ষকে একটি ‘ঔপনিবেশিক ঐতিহ্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তা পরিবর্তনের দূরদর্শী প্রস্তাব দিয়েছে পরামর্শক কমিটি। নতুন শিক্ষাবর্ষ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে জুন পর্যন্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। কমিটির মতে, জুলাই ও আগস্ট মাসে বাংলাদেশে তীব্র বর্ষা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হয়, তাই এই দুই মাস দীর্ঘ ছুটি রাখার পরিকল্পনা করা যৌক্তিক।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কনসালটেশন কমিটির আহ্বায়ক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ এই সংস্কার প্রস্তাবনা প্রসঙ্গে দেশের শিক্ষা খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন: "মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল পাঠ্যজ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের সংবেদনশীল সময়। তাই এ স্তরে বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষার মানোন্নয়ন অপরিহার্য। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষা খাত দীর্ঘ সময় ধরে প্রত্যাশিত মনোযোগ পায়নি। জিডিপির (GDP) ২ শতাংশের কম বাজেট বরাদ্দই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ।"
মাধ্যমিক স্তরে ভর্তির এই নতুন সিদ্ধান্তের খবর প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে যেমন ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে, তেমনি শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তন ও পরীক্ষা পুনর্বহাল নিয়ে নীতিগত পর্যায়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা শুরু হয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন