বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, এখন ধীরে ধীরে অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পথে হাঁটছে এর মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপ ওয়েব ব্যবহারকারীদের ‘হোয়্যাটসঅ্যাপ প্লাস’ নামের একটি প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনের প্রস্তাব দেখানোর পর থেকে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে— দীর্ঘ দুই দশক ফ্রি সেবা দেওয়ার পর হঠাৎ কেন সাবস্ক্রিপশনের দিকে ঝুঁকছেন মার্ক জাকারবার্গ? প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে মেটার বিপুল বিনিয়োগ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় এআই দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়ার কারণে মেটা এখন এই খাতে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করছে, যার অংশ হিসেবে ‘স্কেল এআই’-এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্সান্ডার ওয়াংকে মেটার ‘সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাব’-এর নেতৃত্বে আনার জন্য ১ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের বিশাল চুক্তি করেছে কোম্পানিটি। একই সঙ্গে শুধু ২০২৬ সালের জন্যই মেটা তাদের মূলধনী ব্যয়ের (Capital Expenditure) পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে, যা মূলত ব্যয় হচ্ছে বিশাল এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে, কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ ও হার্ডওয়্যার কিনতে এবং নতুন এআই মডেল উন্নয়নে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর নির্ভর করে এত বড় ব্যয় বহন করা মেটার জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
মেটার সাবস্ক্রিপশন মডেল চালুর আরেকটি বড় কারণ হলো কোম্পানির একক আয়ের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর মেটার মোট আয়ের ৯৭.৬ শতাংশই এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে, যা প্রায় দুই দশক পরও মেটার জন্য একটি বড় উদ্বেগ। এখানেই মেটার সঙ্গে বড় তফাত গুগলের, কারণ গুগল বিজ্ঞাপননির্ভর প্রতিষ্ঠান হলেও বহু আগেই ক্লাউড, সফটওয়্যার ও সাবস্ক্রিপশন খাত থেকে উল্লেখযোগ্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। জাকারবার্গ এখন সাবস্ক্রিপশন চালুর মাধ্যমে আয়ের সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছেন। মেটার এই বিপুল এআই পরিকল্পনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতে রিলায়্যান্স ওয়ান-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গুজরাটের জামনগরে একটি বিশাল এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে এবং করপোরেট গ্রাহকদের জন্য এআইভিত্তিক সমাধান তৈরির উদ্যোগও সম্প্রসারণ করেছে মেটা। এর পাশাপাশি এআই-কেন্দ্রিক এই বিশাল পুনর্গঠনের কারণে কোম্পানির ভেতরেও বড় চাপ তৈরি হয়েছে, যার অংশ হিসেবে মেটা সম্প্রতি তাদের ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং নতুন এআই বিশেষজ্ঞদের উচ্চ বেতন ও প্রকৌশলীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের দ্রুত আর্থিক ফল দেখানোর চাপও বাড়ছে কোম্পানির ওপর।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এই সাবস্ক্রিপশন ব্যবসা থেকে মেটার বিপুল রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রুইস্ট সিকিউরিটিজের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মেটার সাবস্ক্রিপশন ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার আয় আসতে পারে এবং ডয়েচে ব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, শুধু আগামী বছরেই সাবস্ক্রিপশন খাত থেকে অতিরিক্ত ১৫.৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসতে পারে। মেটা ইতিমধ্যে সাধারণ এবং এআই-নির্ভর সুবিধার জন্য বেশ কয়েকটি প্যাকেজ চালু করেছে বা পরীক্ষামূলকভাবে চালাচ্ছে। এর মধ্যে ফেসবুক প্লাস, ইনস্টাগ্রাম প্লাস ও হোয়্যাটসঅ্যাপ প্লাসের জন্য মাসে ১২৮.৬৮ টাকা করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেখানে প্রোফাইল কাস্টমাইজেশন, স্টোরি রি-ওয়াচ ট্র্যাকিং, গোপনে স্টোরি দেখা, অতিরিক্ত চ্যাট পিন ও উন্নত অর্গানাইজেশনাল টুলের মতো সুবিধা পাওয়া যাবে। এছাড়া উন্নত এআই সুবিধা ও উচ্চতর রিজনিং সক্ষমতার জন্য ‘মেটা ওয়ান প্লাস’ প্যাকেজের মাসিক খরচ প্রায় ১,০০৮ টাকা এবং ‘মেটা ওয়ান প্রিমিয়াম’ প্যাকেজের জন্য মাসে প্রায় ২,৫২১ টাকা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, সাধারণ ব্যবহারকারীদের বড় অংশকে অর্থ খরচে উৎসাহিত করার মতো এই সাধারণ সুবিধাগুলো যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়, বরং এগুলো মূলত কনটেন্ট নির্মাতা, ইনফ্লুয়েন্সার ও ‘পাওয়ার ইউজার’দের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের আশ্বস্ত করে মেটা জানিয়েছে যে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ পুরোপুরি পেইড হয়ে যাচ্ছে না; মেটার বর্তমান ৩৫০ কোটি দৈনিক ব্যবহারকারীর জন্য মূল প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো বিনামূল্যেই ব্যবহার করা যাবে। কোম্পানিটি মূলত ধীরে ধীরে একটি ‘হাইব্রিড’ বা ফ্রিমিয়াম (Freemium) মডেলের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ফ্রি সংস্করণ ব্যবহার করবেন, আর অতিরিক্ত কাস্টমাইজেশন ও উন্নত এআই সেবা পেতে হলে অর্থ গুণতে হবে।

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ জুন ২০২৬
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ দীর্ঘদিন ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও, এখন ধীরে ধীরে অর্থের বিনিময়ে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার পথে হাঁটছে এর মূল প্রতিষ্ঠান মেটা। সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপ ওয়েব ব্যবহারকারীদের ‘হোয়্যাটসঅ্যাপ প্লাস’ নামের একটি প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশনের প্রস্তাব দেখানোর পর থেকে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে— দীর্ঘ দুই দশক ফ্রি সেবা দেওয়ার পর হঠাৎ কেন সাবস্ক্রিপশনের দিকে ঝুঁকছেন মার্ক জাকারবার্গ? প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই আকস্মিক পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) খাতে মেটার বিপুল বিনিয়োগ। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় এআই দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে পড়ার কারণে মেটা এখন এই খাতে ব্যাপক অর্থ ব্যয় করছে, যার অংশ হিসেবে ‘স্কেল এআই’-এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যালেক্সান্ডার ওয়াংকে মেটার ‘সুপারইন্টেলিজেন্স ল্যাব’-এর নেতৃত্বে আনার জন্য ১ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের বিশাল চুক্তি করেছে কোম্পানিটি। একই সঙ্গে শুধু ২০২৬ সালের জন্যই মেটা তাদের মূলধনী ব্যয়ের (Capital Expenditure) পূর্বাভাস বাড়িয়ে ১২৫ থেকে ১৪৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে, যা মূলত ব্যয় হচ্ছে বিশাল এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণে, কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে, উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ ও হার্ডওয়্যার কিনতে এবং নতুন এআই মডেল উন্নয়নে। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু বিজ্ঞাপনের আয়ের ওপর নির্ভর করে এত বড় ব্যয় বহন করা মেটার জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
মেটার সাবস্ক্রিপশন মডেল চালুর আরেকটি বড় কারণ হলো কোম্পানির একক আয়ের উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। গত বছর মেটার মোট আয়ের ৯৭.৬ শতাংশই এসেছে বিজ্ঞাপন থেকে, যা প্রায় দুই দশক পরও মেটার জন্য একটি বড় উদ্বেগ। এখানেই মেটার সঙ্গে বড় তফাত গুগলের, কারণ গুগল বিজ্ঞাপননির্ভর প্রতিষ্ঠান হলেও বহু আগেই ক্লাউড, সফটওয়্যার ও সাবস্ক্রিপশন খাত থেকে উল্লেখযোগ্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। জাকারবার্গ এখন সাবস্ক্রিপশন চালুর মাধ্যমে আয়ের সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছেন। মেটার এই বিপুল এআই পরিকল্পনা শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতে রিলায়্যান্স ওয়ান-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে গুজরাটের জামনগরে একটি বিশাল এআই ডেটা সেন্টার নির্মাণের কাজ চলছে এবং করপোরেট গ্রাহকদের জন্য এআইভিত্তিক সমাধান তৈরির উদ্যোগও সম্প্রসারণ করেছে মেটা। এর পাশাপাশি এআই-কেন্দ্রিক এই বিশাল পুনর্গঠনের কারণে কোম্পানির ভেতরেও বড় চাপ তৈরি হয়েছে, যার অংশ হিসেবে মেটা সম্প্রতি তাদের ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং নতুন এআই বিশেষজ্ঞদের উচ্চ বেতন ও প্রকৌশলীদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ নিয়ে অভ্যন্তরীণ সাংগঠনিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের দ্রুত আর্থিক ফল দেখানোর চাপও বাড়ছে কোম্পানির ওপর।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর মতে, এই সাবস্ক্রিপশন ব্যবসা থেকে মেটার বিপুল রাজস্ব আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। ট্রুইস্ট সিকিউরিটিজের হিসাব অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মেটার সাবস্ক্রিপশন ব্যবসা থেকে বছরে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার আয় আসতে পারে এবং ডয়েচে ব্যাংকের অনুমান অনুযায়ী, শুধু আগামী বছরেই সাবস্ক্রিপশন খাত থেকে অতিরিক্ত ১৫.৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আসতে পারে। মেটা ইতিমধ্যে সাধারণ এবং এআই-নির্ভর সুবিধার জন্য বেশ কয়েকটি প্যাকেজ চালু করেছে বা পরীক্ষামূলকভাবে চালাচ্ছে। এর মধ্যে ফেসবুক প্লাস, ইনস্টাগ্রাম প্লাস ও হোয়্যাটসঅ্যাপ প্লাসের জন্য মাসে ১২৮.৬৮ টাকা করে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, যেখানে প্রোফাইল কাস্টমাইজেশন, স্টোরি রি-ওয়াচ ট্র্যাকিং, গোপনে স্টোরি দেখা, অতিরিক্ত চ্যাট পিন ও উন্নত অর্গানাইজেশনাল টুলের মতো সুবিধা পাওয়া যাবে। এছাড়া উন্নত এআই সুবিধা ও উচ্চতর রিজনিং সক্ষমতার জন্য ‘মেটা ওয়ান প্লাস’ প্যাকেজের মাসিক খরচ প্রায় ১,০০৮ টাকা এবং ‘মেটা ওয়ান প্রিমিয়াম’ প্যাকেজের জন্য মাসে প্রায় ২,৫২১ টাকা চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, সাধারণ ব্যবহারকারীদের বড় অংশকে অর্থ খরচে উৎসাহিত করার মতো এই সাধারণ সুবিধাগুলো যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়, বরং এগুলো মূলত কনটেন্ট নির্মাতা, ইনফ্লুয়েন্সার ও ‘পাওয়ার ইউজার’দের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীদের আশ্বস্ত করে মেটা জানিয়েছে যে, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপ পুরোপুরি পেইড হয়ে যাচ্ছে না; মেটার বর্তমান ৩৫০ কোটি দৈনিক ব্যবহারকারীর জন্য মূল প্ল্যাটফর্মগুলো এখনো বিনামূল্যেই ব্যবহার করা যাবে। কোম্পানিটি মূলত ধীরে ধীরে একটি ‘হাইব্রিড’ বা ফ্রিমিয়াম (Freemium) মডেলের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সাধারণ ব্যবহারকারীরা ফ্রি সংস্করণ ব্যবহার করবেন, আর অতিরিক্ত কাস্টমাইজেশন ও উন্নত এআই সেবা পেতে হলে অর্থ গুণতে হবে।

আপনার মতামত লিখুন