দিকপাল

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা, কঠিন বাস্তবতার মুখে নেতানিয়াহু


শামিমা লিয়া
শামিমা লিয়া আন্তর্জাতিক ডেস্ক এডিটর
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬ | ০৮:০৪ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা, কঠিন বাস্তবতার মুখে নেতানিয়াহু

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সংকট তৈরি করেছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা তার দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা ক্ষমতার তিনটি প্রধান ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে, যা তাকে নিজ দেশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়েছে।

নেতানিয়াহু এতদিন নিজেকে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা এবং মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিলেন। কিন্তু এই চুক্তির ফলে তিনি তার প্রধান মিত্রের কাছ থেকেই কার্যত বিচ্ছিন্ন এবং অবজ্ঞার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে বৈরুতে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমালোচনা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলাকে বিচারবুদ্ধিহীন বলে অভিহিত করায় ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামনেই সাধারণ নির্বাচন, এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এই ঘটনা তার ‘নিরাপত্তার রক্ষক’ হিসেবে পরিচিত ভাবমূর্তিকে চরম বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা সিমা শাইনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে লেবাননের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভার ইরানের হাতে চলে গেছে, যা প্রকারান্তরে হিজবুল্লাহকে সেখানে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা মহল বিষয়টিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তব্যে বর্তমান পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ দ্বিমুখী সংকটের রূপক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নেতানিয়াহুর সামনে এখন দুটি পথই খোলা—প্রথমত, দীর্ঘদিনের প্রধান মিত্র আমেরিকার সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো, অথবা ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নতি স্বীকার করা।

নেতানিয়াহুর নিজের ক্ষমতাসীন জোটের ভেতরেও এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা এই চুক্তির বাধ্যবাধকতা মানতে নারাজ। তার মতে, এই সমঝোতা ইসরায়েলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ। জোট সরকারের ভেতরে ও বাইরে থেকে আসা এমন চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অস্বাভাবিক নীরবতা পালন করছেন। অথচ সাধারণত যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতেও নিজের কৃতিত্ব দাবি করতে অভ্যস্ত এই নেতা বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ধরনের মৌনতা অবলম্বন করছেন, তা তার রাজনৈতিক দিশেহারা অবস্থারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইরানে বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন হলে হয়তো নেতানিয়াহু তার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটি সুযোগ পেতেন। কিন্তু বর্তমান নিরাপত্তা সংকটের যে মারপ্যাঁচ তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি কোনো শত্রু নয়, বরং নিজের পরম মিত্র আমেরিকার সঙ্গেই এক ভয়াবহ সংঘাত অথবা আত্মসমর্পণের কঠিন ও সংকীর্ণ গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬


ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা, কঠিন বাস্তবতার মুখে নেতানিয়াহু

প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬

featured Image

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চুক্তিটি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সংকট তৈরি করেছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা তার দশকের পর দশক ধরে গড়ে তোলা ক্ষমতার তিনটি প্রধান ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিয়েছে, যা তাকে নিজ দেশ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়েছে।

নেতানিয়াহু এতদিন নিজেকে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরামর্শদাতা এবং মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলে অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে উপস্থাপন করে আসছিলেন। কিন্তু এই চুক্তির ফলে তিনি তার প্রধান মিত্রের কাছ থেকেই কার্যত বিচ্ছিন্ন এবং অবজ্ঞার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে বৈরুতে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি সমালোচনা ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই হামলাকে বিচারবুদ্ধিহীন বলে অভিহিত করায় ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্বের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সামনেই সাধারণ নির্বাচন, এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে এই ঘটনা তার ‘নিরাপত্তার রক্ষক’ হিসেবে পরিচিত ভাবমূর্তিকে চরম বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক কর্মকর্তা সিমা শাইনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে লেবাননের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ভার ইরানের হাতে চলে গেছে, যা প্রকারান্তরে হিজবুল্লাহকে সেখানে দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা মহল বিষয়টিকে তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ পার্লামেন্টে দেওয়া এক বক্তব্যে বর্তমান পরিস্থিতিকে এক ভয়াবহ দ্বিমুখী সংকটের রূপক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, নেতানিয়াহুর সামনে এখন দুটি পথই খোলা—প্রথমত, দীর্ঘদিনের প্রধান মিত্র আমেরিকার সাথে সরাসরি সংঘাতে জড়ানো, অথবা ইসরায়েলের জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে নতি স্বীকার করা।

নেতানিয়াহুর নিজের ক্ষমতাসীন জোটের ভেতরেও এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, তারা এই চুক্তির বাধ্যবাধকতা মানতে নারাজ। তার মতে, এই সমঝোতা ইসরায়েলের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ। জোট সরকারের ভেতরে ও বাইরে থেকে আসা এমন চাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অস্বাভাবিক নীরবতা পালন করছেন। অথচ সাধারণত যেকোনো জটিল পরিস্থিতিতেও নিজের কৃতিত্ব দাবি করতে অভ্যস্ত এই নেতা বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ধরনের মৌনতা অবলম্বন করছেন, তা তার রাজনৈতিক দিশেহারা অবস্থারই প্রতিফলন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, ইরানে বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন হলে হয়তো নেতানিয়াহু তার নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার একটি সুযোগ পেতেন। কিন্তু বর্তমান নিরাপত্তা সংকটের যে মারপ্যাঁচ তৈরি হয়েছে, তাতে তিনি কোনো শত্রু নয়, বরং নিজের পরম মিত্র আমেরিকার সঙ্গেই এক ভয়াবহ সংঘাত অথবা আত্মসমর্পণের কঠিন ও সংকীর্ণ গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল