দিকপাল

সুইজারল্যান্ডে জনসংখ্যা সীমিতকরণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬ | ০৬:০৩ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

সুইজারল্যান্ডে জনসংখ্যা সীমিতকরণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ এক কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যে প্রস্তাবটি গণভোটে উঠেছিল, তা দেশটির ভোটাররা প্রত্যাখান করেছেন। সাম্প্রতিক এই ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোটার এই বিধিনিষেধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যেখানে ৪৫ শতাংশ ভোটার এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন। দেশটির মোট ভোটারের প্রায় ৬০ শতাংশ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা জনমতের এক শক্তিশালী প্রতিফলন। অভিবাসনবিরোধী প্রচারণায় নেতৃত্ব দেওয়া রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টির পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি আনা হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন ও পরিবেশের ওপর চাপ অনেকাংশে কমে আসবে। তবে এই যুক্তিতে সাধারণ ভোটারদের বড় অংশ সাড়া দেননি।


পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই বিভাজনমূলক ভোটের ফলাফল যদি ভিন্ন হতো, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের মুক্ত চলাচল চুক্তিটি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ত। দেশটির সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রস্তাবের শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছিল। সুইজারল্যান্ডের উৎপাদিত পণ্যের অর্ধেকের বেশি ইইউভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি হয়। ইউরোপের এই বিশাল বাজারে নিজেদের পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে হলে মুক্ত চলাচলের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সুইজারল্যান্ডের জন্য অপরিহার্য। প্রস্তাবটি পাস হলে এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি বাতিল করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিত, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর হতে পারত।


ভোটে ‘না’ জয়ী হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে সুইজারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী বিট জানস একে স্থায়িত্ব, উন্মুক্ততা এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ, যা দ্রুত বেড়ে বর্তমানে ৯১ লাখে পৌঁছেছে। বর্তমান জনসংখ্যার ২৭ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। ভোটারদের একটি বড় অংশ হোটেল, হাসপাতাল ও কেয়ার হোমের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে শ্রমিকের তীব্র সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। সুইজারল্যান্ডের হোটেলকর্মীদের অর্ধেকই অভিবাসী এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বিদেশি শ্রমিকদের ওপর দেশটিকে ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। এছাড়া ২০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি হওয়ায়, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সেবার জন্য তরুণ করদাতা ও দক্ষ কর্মীর অভাব পূরণ করা স্থানীয়ভাবে সম্ভব নয়।


ফলাফলের পর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেইন এই সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপের মধ্যকার বন্ধন অত্যন্ত গভীর এবং এই রায় সেই শক্তিশালী অংশীদারিত্বকেই নিশ্চিত করে। তবে এই পরাজয়ের পরও দেশটির পিপলস পার্টি জানিয়েছে যে, তারা তাদের অবস্থানে অনড়। দলটির প্রেসিডেন্ট মার্সেল ডেটলিং মন্তব্য করেছেন যে, উচ্চ বাড়িভাড়া, অতিরিক্ত উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান খরচের মতো সমস্যাগুলো ভোটাররা অনুভব করছেন এবং এই ভোটের মাধ্যমে কোনো সমস্যারই স্থায়ী সমাধান হয়নি।


ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহর ও গ্রামীণ এলাকার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন ছিল। রাজধানী বার্নসহ অভিবাসীবহুল বড় শহরগুলোতে প্রস্তাবটি বিপুল ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, বার্নে এই হার ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ। পর্যটন এলাকাগুলোতেও ভোটাররা অভিবাসনের স্বপক্ষেই ভোট দিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর প্রধান অর্থনীতিবিদ রুডলফ মিনশ সতর্ক করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একা হয়ে পড়া সুইজারল্যান্ডের স্বার্থের পরিপন্থী। সব মিলিয়ে, এই গণভোটের রায় প্রমাণ করেছে যে, অধিকাংশ সুইস নাগরিক তাদের দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্বস্ততাকে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


সুইজারল্যান্ডে জনসংখ্যা সীমিতকরণ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান

প্রকাশের তারিখ : ১৫ জুন ২০২৬

featured Image

সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ এক কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার যে প্রস্তাবটি গণভোটে উঠেছিল, তা দেশটির ভোটাররা প্রত্যাখান করেছেন। সাম্প্রতিক এই ভোটের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় ৫৫ শতাংশ ভোটার এই বিধিনিষেধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যেখানে ৪৫ শতাংশ ভোটার এর পক্ষে মত দিয়েছিলেন। দেশটির মোট ভোটারের প্রায় ৬০ শতাংশ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন, যা জনমতের এক শক্তিশালী প্রতিফলন। অভিবাসনবিরোধী প্রচারণায় নেতৃত্ব দেওয়া রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টির পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবটি আনা হয়েছিল। তাদের দাবি ছিল, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে পরিবহন ব্যবস্থা, আবাসন ও পরিবেশের ওপর চাপ অনেকাংশে কমে আসবে। তবে এই যুক্তিতে সাধারণ ভোটারদের বড় অংশ সাড়া দেননি।


পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই বিভাজনমূলক ভোটের ফলাফল যদি ভিন্ন হতো, তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের মুক্ত চলাচল চুক্তিটি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ত। দেশটির সরকার, ব্যবসায়ী সমাজ এবং বড় রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রস্তাবের শুরু থেকেই বিরোধিতা করে আসছিল। সুইজারল্যান্ডের উৎপাদিত পণ্যের অর্ধেকের বেশি ইইউভুক্ত দেশগুলোতে রপ্তানি হয়। ইউরোপের এই বিশাল বাজারে নিজেদের পণ্যের অবাধ প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে হলে মুক্ত চলাচলের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সুইজারল্যান্ডের জন্য অপরিহার্য। প্রস্তাবটি পাস হলে এই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিটি বাতিল করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিত, যা দেশটির অর্থনীতির জন্য বিপর্যয়কর হতে পারত।


ভোটে ‘না’ জয়ী হওয়াকে স্বাগত জানিয়ে সুইজারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী বিট জানস একে স্থায়িত্ব, উন্মুক্ততা এবং নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক হিসেবে অভিহিত করেছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ছিল ৭৩ লাখ, যা দ্রুত বেড়ে বর্তমানে ৯১ লাখে পৌঁছেছে। বর্তমান জনসংখ্যার ২৭ শতাংশই বিদেশি নাগরিক। ভোটারদের একটি বড় অংশ হোটেল, হাসপাতাল ও কেয়ার হোমের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে শ্রমিকের তীব্র সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। সুইজারল্যান্ডের হোটেলকর্মীদের অর্ধেকই অভিবাসী এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতেও বিদেশি শ্রমিকদের ওপর দেশটিকে ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। এছাড়া ২০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি হওয়ায়, প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সেবার জন্য তরুণ করদাতা ও দক্ষ কর্মীর অভাব পূরণ করা স্থানীয়ভাবে সম্ভব নয়।


ফলাফলের পর ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডের লেইন এই সিদ্ধান্তের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেছেন, সুইজারল্যান্ড ও ইউরোপের মধ্যকার বন্ধন অত্যন্ত গভীর এবং এই রায় সেই শক্তিশালী অংশীদারিত্বকেই নিশ্চিত করে। তবে এই পরাজয়ের পরও দেশটির পিপলস পার্টি জানিয়েছে যে, তারা তাদের অবস্থানে অনড়। দলটির প্রেসিডেন্ট মার্সেল ডেটলিং মন্তব্য করেছেন যে, উচ্চ বাড়িভাড়া, অতিরিক্ত উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবার ক্রমবর্ধমান খরচের মতো সমস্যাগুলো ভোটাররা অনুভব করছেন এবং এই ভোটের মাধ্যমে কোনো সমস্যারই স্থায়ী সমাধান হয়নি।


ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শহর ও গ্রামীণ এলাকার মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন ছিল। রাজধানী বার্নসহ অভিবাসীবহুল বড় শহরগুলোতে প্রস্তাবটি বিপুল ব্যবধানে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, বার্নে এই হার ছিল প্রায় ৮৪ শতাংশ। পর্যটন এলাকাগুলোতেও ভোটাররা অভিবাসনের স্বপক্ষেই ভোট দিয়েছেন। সুইজারল্যান্ডের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর প্রধান অর্থনীতিবিদ রুডলফ মিনশ সতর্ক করেছিলেন যে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একা হয়ে পড়া সুইজারল্যান্ডের স্বার্থের পরিপন্থী। সব মিলিয়ে, এই গণভোটের রায় প্রমাণ করেছে যে, অধিকাংশ সুইস নাগরিক তাদের দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বিশ্বস্ততাকে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

সূত্র: বিবিসি।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল