দিকপাল

রাশিয়ায় মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের গণগ্রেফতার, নেপথ্যে কী?


আকাশ মোল্লা
আকাশ মোল্লা স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬ | ১১:৪২ এ এম | প্রিন্ট সংস্করণ

রাশিয়ায় মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের গণগ্রেফতার, নেপথ্যে কী?

রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সম্প্রতি এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত মে মাসে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আটজন প্রভাবশালী মুসলিম আলেম এবং ধর্মীয় প্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারিভাবে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাজে বাধা প্রদান কিংবা দুর্নীতির মতো সাধারণ অভিযোগ আনা হলেও, তদন্তকারী সংস্থাগুলোর নথিপত্রে তাদের নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা একে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ধর্মীয় নেতাদের টার্গেট করে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।


এই দমন-পীড়নের নেপথ্যে মূলত আবাসিক ভবনে যৌথ উপাসনা বা জামাতে নামাজ পড়াকে নিষিদ্ধ করার একটি বিতর্কিত আইনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ। রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস-এর প্রধান রাভিল গাইনুতদিন এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে পাঠানো চিঠিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, দেশটিতে পর্যাপ্ত মসজিদ নির্মাণের সুযোগ না থাকার ফলে মুসলিমরা বাধ্য হয়েই নিজ বাসভবনে নামাজ আদায় করেন। এমন একটি প্রয়োজনীয় ইবাদতকে অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আইন পাস হলে তা ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে। এই প্রতিবাদের পরই মূলত আলেমদের ওপর সরকারি চাপ ও ধরপাকড় তীব্রতর হয়েছে।


পরিস্থিতি কতটা সংবেদনশীল তার আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় ধর্মীয় নেতা দামির মুখেতদিনভের কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায়। তার দপ্তরে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘মঙ্গোল-তাতার যুগ’-এর একটি চিত্রকর্ম থাকা সত্ত্বেও উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো তাকে ‘রাশিয়া-বিরোধী’ তকমা দেয় এবং আদালত তাকে ভারী অংকের অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করে। শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদীদের চাপের মুখে তিনি সেই ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম সরিয়ে সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছবি স্থাপন করতে বাধ্য হন। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, রাশিয়ায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠীর প্রভাব দিন দিন বাড়ছে, যা খোদ আলেম সমাজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


রাশিয়ার সরকারি মুসলিম বোর্ড সরাসরি কোনো বড় প্রতিবাদে না নামলেও, তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে চরমপন্থার সাথে জড়িয়ে দেশে ধর্মীয় বিভেদ তৈরির সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র চলছে। বর্তমানে রাশিয়ায় প্রায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিমের বসবাস, যারা দীর্ঘকাল ধরে দেশটির উন্নয়নের অংশীদার। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ক্রেমলিন প্রশাসন যেভাবে ‘অর্থোডক্স রাশিয়া’ বা নির্দিষ্ট স্লাভিক ঐতিহ্যভিত্তিক একচেটিয়া জাতীয়তাবাদী ধারণা প্রচার করছে, তাতে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। আগে ধারণা করা হতো, সরকারের প্রতি পূর্ণ রাজনৈতিক আনুগত্য দেখালেই রাশিয়ায় ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব, কিন্তু এই সাম্প্রতিক ধরপাকড় প্রমাণ করছে যে, আনুগত্য সত্ত্বেও এখন আর আলেম বা ধর্মীয় প্রতিনিধিরা নিরাপদ নন। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক সংহতি আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


রাশিয়ায় মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের গণগ্রেফতার, নেপথ্যে কী?

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬

featured Image

রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ধর্মীয় স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সম্প্রতি এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত মে মাসে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে আটজন প্রভাবশালী মুসলিম আলেম এবং ধর্মীয় প্রতিনিধিকে গ্রেপ্তার করেছে, যা আন্তর্জাতিক মহলে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারিভাবে গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাজে বাধা প্রদান কিংবা দুর্নীতির মতো সাধারণ অভিযোগ আনা হলেও, তদন্তকারী সংস্থাগুলোর নথিপত্রে তাদের নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত করার অপচেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা একে রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন, যেখানে ধর্মীয় নেতাদের টার্গেট করে একটি নির্দিষ্ট বার্তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।


এই দমন-পীড়নের নেপথ্যে মূলত আবাসিক ভবনে যৌথ উপাসনা বা জামাতে নামাজ পড়াকে নিষিদ্ধ করার একটি বিতর্কিত আইনকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ। রাশিয়ার স্পিরিচুয়াল বোর্ড অব মুসলিমস-এর প্রধান রাভিল গাইনুতদিন এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে পাঠানো চিঠিতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করেছিলেন যে, দেশটিতে পর্যাপ্ত মসজিদ নির্মাণের সুযোগ না থাকার ফলে মুসলিমরা বাধ্য হয়েই নিজ বাসভবনে নামাজ আদায় করেন। এমন একটি প্রয়োজনীয় ইবাদতকে অপরাধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আইন পাস হলে তা ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর বড় ধরনের আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে। এই প্রতিবাদের পরই মূলত আলেমদের ওপর সরকারি চাপ ও ধরপাকড় তীব্রতর হয়েছে।


পরিস্থিতি কতটা সংবেদনশীল তার আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় ধর্মীয় নেতা দামির মুখেতদিনভের কার্যালয়ে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায়। তার দপ্তরে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘মঙ্গোল-তাতার যুগ’-এর একটি চিত্রকর্ম থাকা সত্ত্বেও উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো তাকে ‘রাশিয়া-বিরোধী’ তকমা দেয় এবং আদালত তাকে ভারী অংকের অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করে। শেষ পর্যন্ত জাতীয়তাবাদীদের চাপের মুখে তিনি সেই ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম সরিয়ে সেখানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ছবি স্থাপন করতে বাধ্য হন। এই ঘটনা থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, রাশিয়ায় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে উগ্র ডানপন্থি গোষ্ঠীর প্রভাব দিন দিন বাড়ছে, যা খোদ আলেম সমাজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।


রাশিয়ার সরকারি মুসলিম বোর্ড সরাসরি কোনো বড় প্রতিবাদে না নামলেও, তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে চরমপন্থার সাথে জড়িয়ে দেশে ধর্মীয় বিভেদ তৈরির সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র চলছে। বর্তমানে রাশিয়ায় প্রায় দুই কোটিরও বেশি মুসলিমের বসবাস, যারা দীর্ঘকাল ধরে দেশটির উন্নয়নের অংশীদার। তবে ইউক্রেন যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ক্রেমলিন প্রশাসন যেভাবে ‘অর্থোডক্স রাশিয়া’ বা নির্দিষ্ট স্লাভিক ঐতিহ্যভিত্তিক একচেটিয়া জাতীয়তাবাদী ধারণা প্রচার করছে, তাতে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। আগে ধারণা করা হতো, সরকারের প্রতি পূর্ণ রাজনৈতিক আনুগত্য দেখালেই রাশিয়ায় ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করা সম্ভব, কিন্তু এই সাম্প্রতিক ধরপাকড় প্রমাণ করছে যে, আনুগত্য সত্ত্বেও এখন আর আলেম বা ধর্মীয় প্রতিনিধিরা নিরাপদ নন। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রাশিয়ার অভ্যন্তরে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সামাজিক সংহতি আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল