মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ওপর ইসরাইলপন্থি লবিং গ্রুপ হিসেবে আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাকের নিরঙ্কুশ প্রভাব ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সেই শক্ত ভিত্তিকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। আসন্ন প্রাথমিক বাছাই নির্বাচনকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অনেক প্রার্থী এখন প্রকাশ্যেই এই প্রভাবশালী লবিং গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিউ ইয়র্কের দশম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডারের মতো নেতারা সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন যে, তারা ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে কোনো বিশেষ লবিং গোষ্ঠীর নির্দেশ মেনে চলবেন না। ল্যান্ডার তার নির্বাচনী প্রচারণায় আইপ্যাকের কর্মকাণ্ডকে ওয়াল স্ট্রিট কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো অর্থের প্রভাবের সাথে তুলনা করেছেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে, একই দলের অন্য প্রার্থীরা সরাসরি আইপ্যাকের তহবিল গ্রহণ থেকে বিরত থাকছেন এবং ইসরাইল সরকারের নীতির যৌক্তিক সমালোচনা করার আহ্বান জানাচ্ছেন। লবিং গোষ্ঠীটি সাধারণত তাদের পছন্দের প্রার্থীদের জয়ী করতে এবং বিরুদ্ধমত পোষণকারীদের হারাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। তাদের নিজস্ব সুপার প্যাকের মাধ্যমে সংগৃহীত এই অর্থ নির্বাচনী মাঠে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন নির্বাচনে দেখা গেছে, আইপ্যাকের এই বিপুল বিনিয়োগ সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনতে পারছে না, যা দলটির অভ্যন্তরে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইপ্যাক কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা কেবল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতর থাকা ইসরাইলপন্থি অংশটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে এবং দলের ভেতরে থাকা অতি বামপন্থি গোষ্ঠীর ক্ষতিকর প্রভাব রুখতে কাজ করছে। কিন্তু এই যুক্তির বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের একটি বিশাল অংশ ইসরাইলে নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা প্রদান এবং গাজায় চলমান পরিস্থিতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছেন। ওবামা আমলের শেষদিকে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে যখন ইসরাইলের সাথে মতপার্থক্য দেখা দেয়, তখন থেকেই ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশের সাথে আইপ্যাকের দূরত্বের শুরু। নেতানিয়াহু সরকারের কট্টর নীতি এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো ডেমোক্র্যাটিক পার্টির উদারপন্থি নেতাদের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইপ্যাক আগে যেমন দ্বিপক্ষীয় ঐকমত্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখত, এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে তরুণ প্রগতিশীল আইনপ্রণেতাদের উত্থান এবং ২০২২ ও ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করার কৌশলটি অনেক ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়েছে। এমনকি আইপ্যাকের পছন্দের প্রার্থীরা অনেক সময় সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। শিকাগো অঞ্চলের প্রার্থী ড্যানিয়েল বিসের জয় এর একটি বড় উদাহরণ। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় আইপ্যাকের বিরোধিতাকেই ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন এবং জনমত জরিপেও দেখা যায়, তার এলাকার অর্ধেকেরও বেশি ভোটার ওই লবিং গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে পছন্দ করেন না।
বর্তমানে এই ইস্যুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদল নেতা মনে করেন, ইহুদিবাদ এবং অর্থের প্রভাব নিয়ে কথা বলাটা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও গণতন্ত্রের স্বার্থে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার প্রগতিশীল এবং মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটদের এই জোটবদ্ধ অবস্থান নেতানিয়াহু সরকারের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। এমনকি ট্রাম্পের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে দ্বিধা করছেন না। সব মিলিয়ে, আইপ্যাকের এই আপসহীন অবস্থান মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্দরে ইসরাইল নীতি নিয়ে যে গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। প্রগতিশীলদের মতে, এই লবিং গোষ্ঠীটি এখন আগুন নিয়ে খেলছে, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভিত্তিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ জুন ২০২৬
মার্কিন রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ওপর ইসরাইলপন্থি লবিং গ্রুপ হিসেবে আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি বা আইপ্যাকের নিরঙ্কুশ প্রভাব ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সেই শক্ত ভিত্তিকে প্রবলভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। আসন্ন প্রাথমিক বাছাই নির্বাচনকে সামনে রেখে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অনেক প্রার্থী এখন প্রকাশ্যেই এই প্রভাবশালী লবিং গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নিউ ইয়র্কের দশম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টের প্রার্থী ব্র্যাড ল্যান্ডারের মতো নেতারা সরাসরি ঘোষণা দিয়েছেন যে, তারা ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে কোনো বিশেষ লবিং গোষ্ঠীর নির্দেশ মেনে চলবেন না। ল্যান্ডার তার নির্বাচনী প্রচারণায় আইপ্যাকের কর্মকাণ্ডকে ওয়াল স্ট্রিট কিংবা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো অর্থের প্রভাবের সাথে তুলনা করেছেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর বলে তিনি মনে করেন। অন্যদিকে, একই দলের অন্য প্রার্থীরা সরাসরি আইপ্যাকের তহবিল গ্রহণ থেকে বিরত থাকছেন এবং ইসরাইল সরকারের নীতির যৌক্তিক সমালোচনা করার আহ্বান জানাচ্ছেন। লবিং গোষ্ঠীটি সাধারণত তাদের পছন্দের প্রার্থীদের জয়ী করতে এবং বিরুদ্ধমত পোষণকারীদের হারাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। তাদের নিজস্ব সুপার প্যাকের মাধ্যমে সংগৃহীত এই অর্থ নির্বাচনী মাঠে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন নির্বাচনে দেখা গেছে, আইপ্যাকের এই বিপুল বিনিয়োগ সবসময় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনতে পারছে না, যা দলটির অভ্যন্তরে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আইপ্যাক কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা কেবল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতর থাকা ইসরাইলপন্থি অংশটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে এবং দলের ভেতরে থাকা অতি বামপন্থি গোষ্ঠীর ক্ষতিকর প্রভাব রুখতে কাজ করছে। কিন্তু এই যুক্তির বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের একটি বিশাল অংশ ইসরাইলে নিঃশর্ত সামরিক সহায়তা প্রদান এবং গাজায় চলমান পরিস্থিতির ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছেন। ওবামা আমলের শেষদিকে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে যখন ইসরাইলের সাথে মতপার্থক্য দেখা দেয়, তখন থেকেই ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশের সাথে আইপ্যাকের দূরত্বের শুরু। নেতানিয়াহু সরকারের কট্টর নীতি এবং পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনের মতো বিতর্কিত বিষয়গুলো ডেমোক্র্যাটিক পার্টির উদারপন্থি নেতাদের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আইপ্যাক আগে যেমন দ্বিপক্ষীয় ঐকমত্যের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখত, এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে তরুণ প্রগতিশীল আইনপ্রণেতাদের উত্থান এবং ২০২২ ও ২০২৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাদের বিশাল অংকের অর্থ ব্যয় করার কৌশলটি অনেক ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়েছে। এমনকি আইপ্যাকের পছন্দের প্রার্থীরা অনেক সময় সাধারণ ভোটারদের মন জয় করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। শিকাগো অঞ্চলের প্রার্থী ড্যানিয়েল বিসের জয় এর একটি বড় উদাহরণ। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় আইপ্যাকের বিরোধিতাকেই ইস্যু হিসেবে তুলে ধরেন এবং জনমত জরিপেও দেখা যায়, তার এলাকার অর্ধেকেরও বেশি ভোটার ওই লবিং গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে পছন্দ করেন না।
বর্তমানে এই ইস্যুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। একদল নেতা মনে করেন, ইহুদিবাদ এবং অর্থের প্রভাব নিয়ে কথা বলাটা অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও গণতন্ত্রের স্বার্থে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আবার প্রগতিশীল এবং মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটদের এই জোটবদ্ধ অবস্থান নেতানিয়াহু সরকারের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে। এমনকি ট্রাম্পের মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনা করতে দ্বিধা করছেন না। সব মিলিয়ে, আইপ্যাকের এই আপসহীন অবস্থান মার্কিন ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্দরে ইসরাইল নীতি নিয়ে যে গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে, তা অদূর ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। প্রগতিশীলদের মতে, এই লবিং গোষ্ঠীটি এখন আগুন নিয়ে খেলছে, যা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভিত্তিকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।
সূত্র: দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিন

আপনার মতামত লিখুন