দিকপাল

ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়িয়ে নতুন স্থল করিডর বানাচ্ছে তুরস্ক ও সৌদি আরব


স্বাধীন আহমেদ
স্বাধীন আহমেদ স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬ | ০৮:১৫ পি এম | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়িয়ে নতুন স্থল করিডর বানাচ্ছে তুরস্ক ও সৌদি আরব

আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে একটি কৌশলগত স্থল করিডর তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে যৌথভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তুরস্ক এবং সৌদি আরব। এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সিরিয়া ও জর্ডান হয়ে বাণিজ্যিক পণ্য সরাসরি ইউরোপের বাজারে পৌঁছাতে পারবে। সম্প্রতি ইসরায়েলি গণমাধ্যম ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর উদ্যোগের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে, যা নিয়ে তেল আবিবের নীতিনির্ধারক মহলে তীব্র অস্বস্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন করিডরটি চালু হলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক বাণিজ্যিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার বাণিজ্য সংযোগের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের হাইফা বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু নতুন এই বিকল্প স্থলপথটি চালু হলে বাণিজ্যের ভারসাম্য সরাসরি তুরস্ক ও সৌদি আরবের অনুকূলে চলে যাবে। এর ফলে ইসরায়েলি অবকাঠামোর ওপর বিভিন্ন দেশের নির্ভরশীলতা যেমন কমবে, তেমনি তেল আবিবের কৌশলগত গুরুত্বও হুমকিতে পড়বে। এ কারণেই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই উদ্যোগকে তাদের সমর্থিত ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ বা ‘আইএমইসি’ (IMEC) প্রকল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

আইএমইসি মূলত ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থিত একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, যা এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বিকল্প বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিত হয়েছিল। তবে তুরস্ক ও সৌদি আরবের প্রস্তাবিত এই স্থল করিডরটি আইএমইসির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছেন। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, সিরিয়া ও জর্ডানকে যুক্ত করা এই রুটটি যদি কার্যকরভাবে গড়ে ওঠে, তবে তা আইএমইসির গুরুত্ব এক ধাক্কায় অনেকটাই কমিয়ে দেবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে আঙ্কারা ও রিয়াদের প্রভাবকে আরও সুসংহত করবে।

মূলত, সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই নতুন বাণিজ্যপথটি পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়—উভয় দিক থেকেই একটি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য ইউরোপে পণ্য পাঠানো অনেক সহজতর হবে। একদিকে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে যখন বৈশ্বিক উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক তখনই এই স্থল করিডরের পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যে নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই করিডর নিয়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং তুরস্ক-সৌদি আরবের যৌথ তৎপরতা আগামী দিনের আঞ্চলিক রাজনীতির গতিপথকে বেশ জটিল করে তুলেছে।

জি-২০ সম্মেলনে ঘোষিত ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ (IMEC) প্রকল্প থেকে তুরস্ককে বাদ দেওয়ায় শুরু থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল আঙ্কারা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সে সময়ই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘তুরস্ককে বাদ দিয়ে কোনো করিডর হতে পারে না।’ অন্যদিকে, সৌদি আরব আইএমইসি প্রকল্পের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে একক কোনো রুটের ওপর নির্ভর করতে চাচ্ছে না। সিরিয়া ও জর্ডানের সঙ্গে কূটনৈতিক বরফ গলার সুযোগ নিয়ে তুরস্ক ও সৌদি আরবের এই নতুন অক্ষ মূলত পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত করার একটি সুদূরপ্রসারী প্রয়াস।

আপনার মতামত লিখুন

দিকপাল

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬


ইসরায়েলের উদ্বেগ বাড়িয়ে নতুন স্থল করিডর বানাচ্ছে তুরস্ক ও সৌদি আরব

প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬

featured Image

আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ করতে একটি কৌশলগত স্থল করিডর তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে যৌথভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তুরস্ক এবং সৌদি আরব। এই মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সিরিয়া ও জর্ডান হয়ে বাণিজ্যিক পণ্য সরাসরি ইউরোপের বাজারে পৌঁছাতে পারবে। সম্প্রতি ইসরায়েলি গণমাধ্যম ‘ইয়েদিওথ আহরোনোথ’-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর উদ্যোগের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে, যা নিয়ে তেল আবিবের নীতিনির্ধারক মহলে তীব্র অস্বস্তি ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন করিডরটি চালু হলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক বাণিজ্যিক মানচিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার বাণিজ্য সংযোগের ক্ষেত্রে ইসরায়েলের হাইফা বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু নতুন এই বিকল্প স্থলপথটি চালু হলে বাণিজ্যের ভারসাম্য সরাসরি তুরস্ক ও সৌদি আরবের অনুকূলে চলে যাবে। এর ফলে ইসরায়েলি অবকাঠামোর ওপর বিভিন্ন দেশের নির্ভরশীলতা যেমন কমবে, তেমনি তেল আবিবের কৌশলগত গুরুত্বও হুমকিতে পড়বে। এ কারণেই ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এই উদ্যোগকে তাদের সমর্থিত ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ বা ‘আইএমইসি’ (IMEC) প্রকল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।

আইএমইসি মূলত ইসরায়েল ও তার পশ্চিমা মিত্রদের সমর্থিত একটি উচ্চাভিলাষী প্রকল্প, যা এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে বিকল্প বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্য নিয়ে পরিকল্পিত হয়েছিল। তবে তুরস্ক ও সৌদি আরবের প্রস্তাবিত এই স্থল করিডরটি আইএমইসির সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হওয়ায় ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকরা কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছেন। তাঁরা আশঙ্কা করছেন, সিরিয়া ও জর্ডানকে যুক্ত করা এই রুটটি যদি কার্যকরভাবে গড়ে ওঠে, তবে তা আইএমইসির গুরুত্ব এক ধাক্কায় অনেকটাই কমিয়ে দেবে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে আঙ্কারা ও রিয়াদের প্রভাবকে আরও সুসংহত করবে।

মূলত, সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই নতুন বাণিজ্যপথটি পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয়—উভয় দিক থেকেই একটি সাশ্রয়ী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য ইউরোপে পণ্য পাঠানো অনেক সহজতর হবে। একদিকে লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি নিয়ে যখন বৈশ্বিক উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক তখনই এই স্থল করিডরের পরিকল্পনা মধ্যপ্রাচ্যের বাণিজ্যে নতুন মেরুকরণের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। সব মিলিয়ে, এই করিডর নিয়ে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ এবং তুরস্ক-সৌদি আরবের যৌথ তৎপরতা আগামী দিনের আঞ্চলিক রাজনীতির গতিপথকে বেশ জটিল করে তুলেছে।

জি-২০ সম্মেলনে ঘোষিত ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ (IMEC) প্রকল্প থেকে তুরস্ককে বাদ দেওয়ায় শুরু থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল আঙ্কারা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সে সময়ই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘তুরস্ককে বাদ দিয়ে কোনো করিডর হতে পারে না।’ অন্যদিকে, সৌদি আরব আইএমইসি প্রকল্পের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও ভূরাজনৈতিক সমীকরণ ও নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থে একক কোনো রুটের ওপর নির্ভর করতে চাচ্ছে না। সিরিয়া ও জর্ডানের সঙ্গে কূটনৈতিক বরফ গলার সুযোগ নিয়ে তুরস্ক ও সৌদি আরবের এই নতুন অক্ষ মূলত পশ্চিমাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে বৈশ্বিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রে পরিণত করার একটি সুদূরপ্রসারী প্রয়াস।


দিকপাল

প্রধান সম্পাদক: কাদির নোমান
সম্পাদক: আল জাবিরী
প্রকাশক: মু. আবদুর রহমান
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দিকপাল