ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে বহুল আলোচিত নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক বছরের জটিল ও কঠোর দরকষাকষির পর জোটের ২৭টি সদস্য দেশের জন্য এই অভিন্ন নীতিমালা চালু করা হলো। আগের অকার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছিল, যা ঠেকাতে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে নতুন এই চুক্তির সফল বাস্তবায়নের জন্য সব সদস্য রাষ্ট্রকে নিজ নিজ দেশের আইন সংশোধন, প্রয়োজনীয় জনবলকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সীমান্ত অবকাঠামো শক্তিশালী করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে কমিশন স্বীকার করেছে যে, অধিকাংশ সদস্য দেশই এখনো এই বিশাল পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ইউরোপীয় অভিবাসন বিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার এই উদ্যোগকে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করলেও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এটি কেবল এক দীর্ঘ যাত্রার শুরু মাত্র।
নতুন নিয়মের আওতায় ইউরোপে প্রবেশের আগেই সীমান্তে প্রত্যেক বিদেশি নাগরিককে একটি অভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এর অংশ হিসেবে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে কঠোর যাচাই-বাছাই বা স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা হবে। ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা ও উপকূলরক্ষী সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হ্যান্স লেইটেনস জানিয়েছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কার্যপদ্ধতিকে একক নিয়মের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।
এখন থেকে যাদের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে অথবা যারা ইইউ ঘোষিত নিরাপদ দেশের তালিকাভুক্ত রাষ্ট্র থেকে আসবেন, তাদের আবেদনের প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে, যা আগে ছয় মাস সময় নিত। এই প্রক্রিয়াকালীন সময়ে আবেদনকারীদের সীমান্তেই অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে এবং আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে আপিলের সুযোগ থাকবে মাত্র একটি। এ ছাড়া ছয় বছর বা তার বেশি বয়সি শিশুদের তথ্য নিবন্ধনের জন্য একটি নতুন বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ স্থাপনের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এই চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো, যাদের আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হবে তাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। ইউরোপজুড়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দাবি অনুযায়ী, প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের সিরিয়া বা বাংলাদেশের মতো নিরাপদ বিবেচিত দেশগুলোতে দ্রুত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। গত মার্চ মাস পর্যন্ত ইউরোপে প্রায় আট লাখ দুই হাজার আশ্রয় আবেদন ঝুলে ছিল। এসব প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো এখন তৃতীয় কোনো দেশে 'ফেরত কেন্দ্র' বা রিটার্ন হাব স্থাপনের বিষয়ে গোপনে আলোচনা চালাচ্ছে।
আশ্রয়প্রার্থীদের দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে নতুন চুক্তিতে একটি বিশেষ সংহতি প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা হয়েছে। আগের নিয়মে অভিবাসীরা যে দেশে প্রথম পা রাখত, সেখানেই তাদের আশ্রয়ের আবেদন করতে হতো। ফলে গ্রিস বা ইতালির মতো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সীমান্ত দেশগুলো তীব্র চাপের মুখে পড়ত। নতুন এই প্রক্রিয়ার অধীনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো হয় সীমান্ত অঞ্চলের দেশগুলো থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীর দায়িত্ব নেবে, অথবা তার পরিবর্তে নির্ধারিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেবে। তবে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির মতো কট্টরপন্থি দেশগুলো এই নিয়ম নিয়ে এখনো তাদের সীমান্তে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এই নতুন নিয়ম নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আসা মানুষদের ভোগান্তি ও মানবিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলবে। অতি দ্রুত মূল্যায়নের ফলে অনেকের ন্যায্য আশ্রয়ের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, এর মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ এবং ন্যায্য শুনানির অধিকার পাওয়ার যোগ্য মানুষগুলোর মুখের ওপর কার্যত দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে নিয়মগুলোর অস্পষ্টতা সুরক্ষাপ্রত্যাশী মানুষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুন ২০২৬
ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে বহুল আলোচিত নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক বছরের জটিল ও কঠোর দরকষাকষির পর জোটের ২৭টি সদস্য দেশের জন্য এই অভিন্ন নীতিমালা চালু করা হলো। আগের অকার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে ইউরোপজুড়ে ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়ছিল, যা ঠেকাতে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের পক্ষ থেকে নতুন এই চুক্তির সফল বাস্তবায়নের জন্য সব সদস্য রাষ্ট্রকে নিজ নিজ দেশের আইন সংশোধন, প্রয়োজনীয় জনবলকে বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সীমান্ত অবকাঠামো শক্তিশালী করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে কমিশন স্বীকার করেছে যে, অধিকাংশ সদস্য দেশই এখনো এই বিশাল পরিবর্তনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ইউরোপীয় অভিবাসন বিষয়ক কমিশনার ম্যাগনাস ব্রুনার এই উদ্যোগকে একটি মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করলেও সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এটি কেবল এক দীর্ঘ যাত্রার শুরু মাত্র।
নতুন নিয়মের আওতায় ইউরোপে প্রবেশের আগেই সীমান্তে প্রত্যেক বিদেশি নাগরিককে একটি অভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। এর অংশ হিসেবে সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে কঠোর যাচাই-বাছাই বা স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা হবে। ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তা ও উপকূলরক্ষী সংস্থার নির্বাহী পরিচালক হ্যান্স লেইটেনস জানিয়েছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কার্যপদ্ধতিকে একক নিয়মের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে।
এখন থেকে যাদের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হবে অথবা যারা ইইউ ঘোষিত নিরাপদ দেশের তালিকাভুক্ত রাষ্ট্র থেকে আসবেন, তাদের আবেদনের প্রক্রিয়া সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা হবে, যা আগে ছয় মাস সময় নিত। এই প্রক্রিয়াকালীন সময়ে আবেদনকারীদের সীমান্তেই অবস্থানের নির্দেশ দেওয়া হতে পারে এবং আবেদন প্রত্যাখ্যান হলে আপিলের সুযোগ থাকবে মাত্র একটি। এ ছাড়া ছয় বছর বা তার বেশি বয়সি শিশুদের তথ্য নিবন্ধনের জন্য একটি নতুন বায়োমেট্রিক ডাটাবেজ স্থাপনের কাজও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এই চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো, যাদের আশ্রয়ের আবেদন নাকচ হবে তাদের দ্রুত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। ইউরোপজুড়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর দাবি অনুযায়ী, প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের সিরিয়া বা বাংলাদেশের মতো নিরাপদ বিবেচিত দেশগুলোতে দ্রুত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে। গত মার্চ মাস পর্যন্ত ইউরোপে প্রায় আট লাখ দুই হাজার আশ্রয় আবেদন ঝুলে ছিল। এসব প্রত্যাখ্যাত ব্যক্তিদের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো এখন তৃতীয় কোনো দেশে 'ফেরত কেন্দ্র' বা রিটার্ন হাব স্থাপনের বিষয়ে গোপনে আলোচনা চালাচ্ছে।
আশ্রয়প্রার্থীদের দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে নতুন চুক্তিতে একটি বিশেষ সংহতি প্রক্রিয়া প্রবর্তন করা হয়েছে। আগের নিয়মে অভিবাসীরা যে দেশে প্রথম পা রাখত, সেখানেই তাদের আশ্রয়ের আবেদন করতে হতো। ফলে গ্রিস বা ইতালির মতো ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সীমান্ত দেশগুলো তীব্র চাপের মুখে পড়ত। নতুন এই প্রক্রিয়ার অধীনে সদস্য রাষ্ট্রগুলো হয় সীমান্ত অঞ্চলের দেশগুলো থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীর দায়িত্ব নেবে, অথবা তার পরিবর্তে নির্ধারিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেবে। তবে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরির মতো কট্টরপন্থি দেশগুলো এই নিয়ম নিয়ে এখনো তাদের সীমান্তে কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই চুক্তি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, এই নতুন নিয়ম নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে আসা মানুষদের ভোগান্তি ও মানবিক সংকট আরও বাড়িয়ে তুলবে। অতি দ্রুত মূল্যায়নের ফলে অনেকের ন্যায্য আশ্রয়ের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, এর মাধ্যমে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ এবং ন্যায্য শুনানির অধিকার পাওয়ার যোগ্য মানুষগুলোর মুখের ওপর কার্যত দরজা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। সেই সঙ্গে নিয়মগুলোর অস্পষ্টতা সুরক্ষাপ্রত্যাশী মানুষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর জন্য চরম অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস

আপনার মতামত লিখুন